
আমাদের দেশে প্রত্যেক বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি বিজ্ঞান দিবস পালন করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে প্রত্যেক বছর বিজ্ঞান দিবস পালনের একটা থিমও দেওয়া হয়। এই বছর বহু প্রতীক্ষার পর প্রায় শেষমুহুর্তে সরকার বিজ্ঞান দিবসের যে থিম দিয়েছেন তা হল ‘Women in Science : Catalysing Vikshit Bharat’ যার অর্থ হল ‘বিকশিত ভারতের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে বিজ্ঞানে নারীদের আসা’ । অর্থাৎ প্রকারান্তরে মেনেই নেওয়া হল বিজ্ঞানে নারীদের অংশগ্রহণ তেমন সর্বব্যাপী নয় আর নারীরা বিকশিত ভারতের অগ্রগতিতে ‘ক্যাটালিস্ট’ বা অনুঘটকের পরোক্ষ ভুমিকাই নেবেন, বিক্রিয়কের মতো সরাসরি অংশগ্রহণ করবেন না।

কিন্তু এহ বাহ্য। তোতাকাহিনির ভঙ্গিতে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে ‘সরকার, মেয়েগুলিকে দেখিয়াছেন কি? ঘটা করিয়া ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ উদ্যোগের একদশক পার হইবার পরও উহারা কি নিয়মিত ইস্কুলে যায়?’ বিজ্ঞানে তো পরে আসবে, আগে দেখা যাক মেয়েরা আদৌ পড়াশোনায় টিকে থাকছে তো? নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রকের হিসেব থেকে জানা যাচ্ছে গত পাঁচ বছরে দেশে ৬৫.৭ লক্ষ শিশু ইস্কুল ছেড়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় ৩০ লক্ষ হল কন্যাশিশু। আর এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হল গুজরাটে। শুধু ২০২৫-’২৬ শিক্ষাবর্ষেই গুজরাটে মোট স্কুলছুট ছাত্রসংখ্যার মধ্যে ১.১ লক্ষ হল মেয়ে। এছাড়া অসম, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্রে, পশ্চিমবঙ্গেও সংখ্যাটা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। সবচেয়ে অবাক করা তথ্য হল, মাত্র একটা শিক্ষাবর্ষে এই মোট (ছেলে-মেয়ে মিলে) স্কুলছুটের সংখ্যা ভয়াবহভাবে বেড়ে গেছে। গুজরাটে এই বৃদ্ধি ৩৪১% (৫৪,৫৪১ থেকে বেড়ে ২.৪ লক্ষ)। বিভিন্ন পর্যায়ে আলাদা ভাবে হিসেব করে দেখা গেছে প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিকের তুলনায় এই ইস্কুল ছেড়ে দেওয়ার হার অনেক বেশি মাধ্যমিক পর্যায়ে (নবম-দশম)। অর্থাৎ শিক্ষার যে পর্যায় থেকে বিজ্ঞান পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, সেইখানে এসে অসংখ্য কন্যা (এবং পুত্রও) পড়াশোনা থেকেই বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে। বিকশিত ভারত তাহলে কাদের বিকাশের কথা তুলে ধরতে চায় ?
অনিবার্য প্রশ্ন হল, কেন মেয়েরা এই বয়সে এসে এত বেশি মাত্রায় ইস্কুল ছাড়ছে ? উত্তরটা পাওয়া যাবে একটা ঘটনা থেকে। এই বছর মধ্যমিক পরীক্ষার প্রথম দিন পশ্চিমবঙ্গের একটি ইস্কুলের শিক্ষিকারা একটি ছাত্রীকে অনুপস্থিত লক্ষ্য করেন; তার বাড়ি গিয়ে দেখা যায় সে মাঠে কাজ করছে। তাঁরা সেই অবস্থা থেকে তাকে উদ্ধার করে কিছু্টা দেরিতে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে দেন এবং মেয়েটি পরীক্ষা দেয়। মেয়েটির অভিভাবকরা জানতেনই না যে সেদিন পরীক্ষা শুরু; মেয়েটিও কি সত্যি ভুলে গেছিল, নাকি ভয়ে বা সঙ্কোচে বলতে পারেনি পরীক্ষার কথা। আসলে এই বয়সে এসে মেয়েরা ঠিক মতো ‘বড়ো’ হয়ে যায়, ইস্কুলে তাদের খাওয়া (মিড-ডে মিল) বন্ধ হয়ে যায়, সংসারের কাজে তাদের অশগ্রহণ প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। নিম্নবিত্ত পরিবারে খুব কম বাবা-মা এই আশা রাখেন যে, মেয়ে পড়াশোনা শিখে উপার্জন করবে; বরং নানা প্রলোভন প্ররোচনা থেকে মেয়েকে সামলে-আগলে রাখাই তাঁদের কাছে বেশি বড়ো সমস্যা। তাই হয় ঘরে কিম্বা মাঠে কাজ করানো (মানে কিছুটা চোখে চোখে রাখা), বড়োজোর হাতের কাজ শেখানো, নাহলে বিয়ে দিয়ে দেওয়া, এই দুই প্রান্তিক সমাধানের মধ্যে হারিয়ে যায় পড়ার বই, ইস্কুলের জামা-জুতো-সাইকেল।

তাছাড়াও সমস্যা আছে। বিভিন্ন সরকারি ইস্কুলের পরিকাঠামো দিন দিন যেভাবে ভেঙে পড়ছে তাতে শুধু শিক্ষক আর পড়াশোনার অভাবই নয়, জলের অভাব, শৌচাগারের অভাব, নিরাপত্তার অভাবও বিশেষ করে ছাত্রীদের পক্ষে অতীব প্রতিকূল হয়ে উঠছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্যে ছাত্রের অভাবে সরকারি ইস্কুলগুলো সাম্প্রতিক ‘ম্যাগনেট’ প্রকল্পের অধীনে একত্র হয়ে যাবার ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের অনেক সময়েই অনেকটা দূরে (৫-১০ কিমি) ইস্কুলে যেতে হচ্ছে। গ্রামের রাস্তাঘাট, আলো-অন্ধকার-বৃষ্টি-রোদ্দুর সব বিচার করে মেয়েদের পক্ষে ইস্কুলে যাওয়াটা কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। সব কিছুর সম্মিলিত ফল হল ইস্কুল হইতে অকাল বিদায়। গত দু-এক বছরের মধ্যে ইস্কুলছুটের সংখ্যা এত বেড়ে যাবার পেছনে এটাও একটা বড়ো কারণ। তাই পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে গেলে এই সব বিষয়ই মাথায় রাখতে হবে।
একটি জনপ্রিয় শিশুখাদ্যের বিজ্ঞাপনে লাল জামা পরা শিশুকন্যাটি যখন গম্ভীর মুখে তার মা-কে প্রশ্ন করে ‘পেট তো ভরেছে কিন্তু আমার পুষ্টির কী হবে?’ তখন খুব মজা পাই, কিন্তু দেশজুড়ে শিশুকন্যারা যদি আঙুল তুলে প্রশ্ন করে ‘আমাদের পড়াশোনার কী হবে?’ তখন কী উত্তর দেবেন নীতিপ্রণেতারা, সেটা যেন ভেবে রাখেন।