তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
ভবানীপুরে কেন মমতার বিরুদ্ধে শুভেন্দুকে দাঁড় করাল বিজেপি?

ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল কলকাতা। সেই কলকাতায় একদা ভারতের নবজাগরণ সাধিত হয়েছিল। সেই কলকাতায় ধীরে ধীরে উত্তর কলকাতার পাশাপাশি দক্ষিণ কলকাতা গড়ে ওঠে অভিজাত ‘ভদ্রলোক’ বাঙালির অঞ্চল‌ হিসেবে।

এই ভবানীপুরে‌ একদিন রাজ্যের প্রাক্তন প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায় ভোটে লড়েছিলেন। তাই একথা বলা যায় যে, ভবানীপুর অতীতেও ভিআইপি নির্বাচন কেন্দ্র হওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ভবানীপুরের নির্বাচন কেন্দ্রে পরিচিত পুরনো মুখ। দক্ষিণ কলকাতার ভিতরেই কালীঘাট। ভবানীপুর থেকে কার্যত ঢিল ছোড়া দূরত্বে কালিঘাটের হরিশ চ্যাটার্জি রোডে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থাকেন।‌

কিন্তু এবার ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুর এক বিশেষ রাজনৈতিক মাহাত্ম্য লাভ করেছে। কারণ, নন্দীগ্রাম থেকে দাঁড়ালেও অতিরিক্ত আসন হিসেবে ভবানীপুরকে বেছে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও প্রার্থী হয়েছেন মমতার বিরুদ্ধে। ভবানীপুরে সিপিএমের প্রার্থী কে? অথবা ভবানীপুরে কোন নকশাল প্রার্থী আছেন কিনা? কংগ্রেসের কেউ প্রার্থী আছেন কিনা এইসব প্রশ্ন আপাতত গৌণ।

প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে ভবানীপুরে শুভেন্দু দাঁড়ানোয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও নিরাপত্তার অভাববোধ আছে নাকি?

কেন শুভেন্দুকে মমতার বিরুদ্ধে প্রার্থী করা হলো? একথাও অমিত শাহ জানিয়ে দিয়েছেন, এ সিদ্ধান্ত তাঁর সিদ্ধান্ত। শুভেন্দু নন্দীগ্রাম থেকে তো প্রার্থী ছিলেনই। বিগত বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামান্য ভোটে হলেও হারিয়ে দিয়েছেন। যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজও অভিযোগ করেন যে, শেষবেলায় ভোট পর্বে লোডশেডিং করে দিয়ে অন্ধকার ঘরের মধ্যে শুভেন্দুর সমর্থকরা ষড়যন্ত্র করে তাঁকে ভোটে হারিয়েছে। ‘যো জিতা ওহি সিকন্দর’। কাজেই, নির্বাচন কমিশন যখন সেই অভিযোগকে গুরুত্ব দেয়নি তখন মমতাকেও পরাজয় স্বীকার করতে হয়েছে।

কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই উপনির্বাচন করে ভবানীপুর থেকে তিনি জিতে এসেছেন। অমিত শাহ বলেছেন, শুভেন্দুকে আমি বলেছি, একদিকে নন্দীগ্রাম থাকলেও তুমি ভবানীপুরেও দাঁড়াও। আসলে হারজিতের জন্যে নয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে শুভেন্দু অধিকারী প্রার্থী হওয়ায় বিজেপি মনে করছে, কৌশলগত ভাবে অন্তত তিনটে সুবিধা তারা পাবে।

প্রথমত, শুভেন্দু প্রার্থী হওয়ায় মমতা বনাম শুভেন্দু এই প্রচার সংবাদ মাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় হবেই, এবং সেটা হচ্ছেও। টিভির পর্দাতেও একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর অন্যদিকে শুভেন্দু ভাগাভাগি করে দুজনের ছবি দিয়ে মাঝখানে একটা বনাম লেখা হচ্ছে। এটা তো জোমিনি হকিকত/বাস্তবতা।

দ্বিতীয় সুবিধা, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেহেতু গোটা রাজ্য জুড়ে প্রচার করছেন, শুধু ভবানীপুর নয়, ২৯৪-টি আসনে তিনিই আসলে প্রার্থী।‌ একথাও সত্য, তৃণমূলের যারা ভোটার তারা তৃণমূলের প্রার্থীকে দেখে যতটা না ভোট দেয়, তার থেকে অনেক বেশি মমতাকে দেখে ভোট দেয়।‌ সুতরাং মমতার সারা রাজ্য জুড়ে নির্বাচনী প্রচারের যে ব্যস্ততা, সেখানে ভবানীপুরে শুভেন্দু দাঁড়িয়ে রোজ নানান রকমের অভিযোগ যদি আনেন, এমনকি খোদ অমিত শাহ এসে শুভেন্দু অধিকারীর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় উপস্থিত থাকেন, তাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটা রাজনৈতিক ইরিটেশন সৃষ্টি করা যেতে পারে।‌ অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরক্ত করা যেতে পারে।‌ মমতার নামে পোস্টার পড়েছে, দেওয়ালে লেখা হয়েছে, ‘আবার মমতা’। আর সেখানে সঙ্গে সঙ্গে বিজেপি পোস্টার লাগাচ্ছে, ‘এবার শুভেন্দু।’ এই ইরিটেশন তৈরি করাটাই হচ্ছে বিজেপির দ্বিতীয় কৌশল।‌

তৃতীয় বিষয়টা হলো, বিজেপির এবারে কোন‌ও ছায়া মুখ্যমন্ত্রী নেই। কিন্তু অমিত শাহের পছন্দের প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। তাই মুখ্যমন্ত্রীর পদপ্রার্থী বিজেপির না থাকলেও শুভেন্দুকে মমতার সঙ্গে লড়াইয়ে অবতীর্ণ করে শুভেন্দুকে অনেকটা বিকল্প ছবি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে। ‌এটা হচ্ছে মূলত অমিত শাহ এবং কতিপয় নেতাদের মাধ্যমে।‌

কিন্তু এই কৌশল হিতে বিপরীতও হতে পারে।‌ সেই ঝুঁকি অমিত শাহ নিয়েছেন। কারণ বিজেপির অন্য কোনও রাজ্য নেতা শুভেন্দু অধিকারীকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মানতে রাজি নন। এমনকি শুভেন্দুর নাম মুখ্যমন্ত্রী পদের প্রার্থী হিসেবে আলোচনা হচ্ছে দেখে, শমীক ভট্টাচার্যকে প্রশ্ন করা হলে, বিজেপির রাজ্য সভাপতি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে, আমাদের কোনও মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী নেই। আমরা নির্বাচনে জেতার পর মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, তা আমাদের দল ঠিক করবে। এটাই দলীয় প্রথা। অমিত শাহকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছেন, বাঙালিই মুখ্যমন্ত্রী হবেন। এই বাংলার নেতাদের মধ্যে থেকেই মুখ্যমন্ত্রী হবেন। বাইরে থেকে কেউ আসবেন না। কিন্তু কোনও নাম অমিত শাহ ঘোষণা করেননি। সেটা বিজেপির অবস্থানও নয়। আরেকটা বিষয় ভবানীপুর কেন্দ্রে আলোচনা হচ্ছে যে, ভবানীপুর কেন্দ্রে শুধু বাঙালি নয়, প্রচুর গুজরাটি, মারাঠি , মারোয়াড়ি বিহারী- বহু হিন্দিভাষী ভোটার আছেন। বিগত লোকসভা নির্বাচনে বেশ কয়েকটি পুরসভার ওয়ার্ডে বিজেপি ভাল ফল করেছিল। যেসব জায়গায় তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে ভোট ব্যবধান অনেক কম ছিল।

সেটা অবশ্য কলকাতা পুরসভার পরিষেবার অভাব এবং স্থানীয় অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি ফ্যাক্টর বলেও তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা মনে করেন। যখন মমতা দাঁড়িয়েছেন, তখন সেখানে অবাঙালিরাও মমতার সঙ্গে ভবানীপুর কেন্দ্রে আছেন বলে মনে করছে তৃণমূল নেতৃত্ব।

আর সেই কারণেই মহুয়া মৈত্র যখন গুজরাটিদের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন এবং বাঙালি-গুজরাটি মেরুকরণের রাজনীতি করার চেষ্টা করেন, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রুষ্ট হন এবং মহুয়াকে তিরস্কার করা হয়। মহুয়াকে বলা হয়, এইধরনের বিবৃতি প্রত্যাহার করে নেওয়া প্রয়োজন। মমতা বলছেন, কলকাতায় যাঁরা গুজরাটি বা অন্য ভাষাভাষীর মানুষ থাকেন, তাঁরা নিরাপদে আছেন এবং তাঁদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যথেষ্ট ভাল।‌ তিনি বারবার বোঝাতে চাইছেন, ভবানীপুর একটা কসমোপলিটান কেন্দ্র। কলকাতা নানা ভাষা, নানা পরিধানের‌ শহর। বাঙালি মধ্যবিত্ত থেকে অবাঙালি ব্যবসায়ী নানা রকমের ভোটার রয়েছেন।

ভবানীপুরে শেষ হাসি হাসবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এমনটাই মনে করছে তৃণমূল শিবির।‌ তবে বিজেপি‌ রণে ভঙ্গ দিচ্ছে না। তাদের প্রচেষ্টাও ক্লান্তিহীন।


Scroll to Top