তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
হুগলির ভোটে চোরা স্রোত

ভাঙা হাটে তৃণমূল, জমি বাঁচানোর চাপে বিজেপি, আর বামেদের প্রত্যাবর্তনের লড়াই

হুগলির ভোটকে শুধু তৃণমূল বনাম বিজেপির লড়াই বললে একপেশে বলা হবে। ওপরের ছবিটা দেখে মনে হতে পারে, তৃণমূল এখনও অনেক এগিয়ে। আবার অন্য দিক থেকে দেখলে বোঝা যায়, বিজেপিরও এখানে কিছু শক্ত ঘাঁটি আছে।

কিন্তু এই দুই মেরুর মাঝখানে সিপিএম যে দ্রুততায় পরিচ্ছন্ন প্রার্থী দিয়েছে এবং সাংগঠনিকভাবে প্রচার শুরু করেছে, তাতে জেলার বহু পুরনো হিসেব-নিকেশ এ বার ওলটপালট হয়ে যেতে পারে।

তাই হুগলির ওপর দিকের ভোট-আবহাওয়া আর ভেতরের বাস্তব অবস্থা এক নয়। এখানে একসঙ্গে কাজ করছে তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, প্রার্থী বদলের ধাক্কা, প্রশাসনিক নাড়া-চাড়া, ভোটার তালিকা ঘিরে টানাপোড়েন, এবং বামেদের প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা।

হুগলিতে মোট ১৮টি বিধানসভা আসন। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে বিজেপি জিতেছিল ৪টি আসনে— পুরশুড়া, আরামবাগ, গোঘাট ও খানাকুল। সেই ফল দেখিয়েছিল, জেলার পশ্চিম ও গ্রামীণ বেল্টে বিজেপির কিছু বাস্তব সামাজিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

কিন্তু হুগলির রাজনীতি ২০২১-এ থেমে নেই। ২০২৪-এর পর বেশ কিছু আসনে নতুন অস্বস্তি, নতুন পুনর্বিন্যাস এবং নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে পুরনো জয় আর বর্তমান শক্তিকে এক করে দেখলে ভুল হবে।

তৃণমূলের সবচেয়ে বড় সংকট সব আসনে বিজেপি নয়; বহু জায়গায় তাদের প্রধান সমস্যা তাদের নিজেদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব।

উত্তরপাড়ায় কাঞ্চন মল্লিকের বদলে শীর্ষাণ্য বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রীরামপুরে ডা. সুদীপ্ত রায়ের বদলে তন্ময় ঘোষ, চুঁচুড়ায় অসিত মজুমদারের জায়গায় দেবাংশু ভট্টাচার্য, বলাগড়ে মনোরঞ্জন বেপারীর বদলে রঞ্জন ধাড়া, পাণ্ডুয়ায় সমীর চক্রবর্তী, সপ্তগ্রামে তপন দাশগুপ্তের বদলে বিদেশ বসু— এই পরিবর্তনগুলোকে শুধু 'নতুন মুখ' বলে দেখলে চলবে না।

এগুলোর মধ্যে যেমন প্রজন্ম-পরিবর্তনের বার্তা আছে, তেমনই আছে অন্দরের ক্ষোভ, জেলা সংগঠনের পুনর্বিন্যাস এবং ক্ষমতার নতুন ভাগ-বাঁটোয়ারার ইঙ্গিত।

কিন্তু মুখ বদল করলেই সংগঠন বদলায় না। অনেক সময় সেখানেই পুরনো রাগ, অপমান আর হিসেব-নিকেশ নতুন করে মাথা তোলে। উত্তরপাড়া, শ্রীরামপুর— একাধিক কেন্দ্রে এই নীরব অসন্তোষই বড় অদৃশ্য ফ্যাক্টর।

এই ফাঁকেই বামেদের ভূমিকা নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। উত্তরপাড়ায় মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়, শ্রীরামপুরে নবনীতা চক্রবর্তী, সিঙ্গুরে দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়, চুঁচুড়ায় সুনীল সাহা, বলাগড়ে বিকাশ গোলদার, পাণ্ডুয়ায় আমজাদ হোসেন, সপ্তগ্রামে অনির্বাণ সরকার, চণ্ডীতলায় শেখ আসিফ আলি, তারকেশ্বরে আবেশ খামরুই, গোঘাটে মুক্তারাম ধাউড়ে— এই তালিকা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, বামেরা এখানে নামমাত্র লড়াই করতে নামেনি।

এদের কেউ আন্দোলনের মুখ, কেউ পুরনো সংগঠক, কেউ মাটি-ঘেঁষা স্থানীয় কর্মী। অর্থাৎ, এরা কাগুজে প্রার্থী নন। বহু আসনে ফলের ব্যবধান কমানো, সমীকরণ ওলটানো, এমনকি সরাসরি জয়ের লড়াইয়েও উঠে আসার মতো বাস্তব উপস্থিতি এদের আছে।

উত্তরপাড়ার লড়াই তাই আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। একদিকে তৃণমূলের নতুন মুখ, অন্যদিকে মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের মতো পরিচিত বাম নেত্রী। এই আসনে বিজেপি থাকলেও, বিরোধী রাজনীতির নৈতিক জমি কতটা বামেদের দিকে সরে যেতে পারে, সেটাই বড় প্রশ্ন।

শ্রীরামপুরেও তন্ময় ঘোষকে শুধু প্রতিপক্ষকে হারালেই হবে না; তাঁকে প্রমাণ করতে হবে যে দলীয় বদলের ধাক্কা সংগঠন সামলে উঠেছে। যেখানে তৃণমূলের অন্দরে অস্বস্তি, সেখানে পরিচ্ছন্ন ও লড়াকু বাম মুখগুলির গুরুত্ব বাড়ছে।

চুঁচুড়া, বলাগড় ও সপ্তগ্রাম— এই বেল্ট এখন জেলার সবচেয়ে স্পর্শকাতর অঞ্চল। কারণ এখানে তৃণমূলের প্রার্থী বদল, বিজেপির আগ্রাসী লক্ষ্য এবং বামেদের সক্রিয় উপস্থিতি— তিনটি রেখাই এসে মিশেছে।

চুঁচুড়ায় দেবাংশু ভট্টাচার্যকে সামনে এনে তৃণমূল তরুণ মুখের বাজি ধরেছে। কিন্তু পুরনো সংগঠন কতটা নিঃশর্তে মাঠে নামবে, সেটাই আসল প্রশ্ন।

সপ্তগ্রামে তৃণমূলের বিদেশ বসু, বামেদের অনির্বাণ সরকার এবং বিজেপির স্বরাজ ঘোষ— এই ত্রিমুখী সমীকরণ দেখাচ্ছে, এখানে লড়াই শুধু দুই দলের মধ্যে আটকে নেই। বিজেপি যেহেতু আগেভাগেই স্বরাজ ঘোষকে নামিয়েছে, তাই বোঝা যাচ্ছে তারা সপ্তগ্রামকে বাস্তব টার্গেট হিসেবেই দেখছে।

বলাগড়ের ছবি আরও জটিল। এখানে তৃণমূলের রঞ্জন ধাড়া, বামেদের বিকাশ গোলদার— দু’জনকেই ঘিরে স্থানীয় সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই কেন্দ্রে বিজেপির ভেতরেও একটি স্পষ্ট অস্বস্তি কাজ করছে।

কারণ, বলাগড়ে বিজেপি যে মুখকে সামনে এনেছে— সুমনা সরকার— তাঁকে ঘিরে দলের পুরনো অংশের একাংশে ক্ষোভ আছে। অভিযোগ, দীর্ঘদিন সংগঠন করে যারা বিজেপির পতাকা বইেছে, তাদের পাশ কাটিয়ে তৃণমূল থেকে আসা বা তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ অতীত থাকা একজন নেত্রীকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই ক্ষোভ শুধু ব্যক্তি-অসন্তোষ নয়; এটি সংগঠনের কর্মীস্তরের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ ভোটের লড়াইয়ে শুধু প্রার্থী নয়, কর্মীর উৎসাহও বড় ফ্যাক্টর।

ফলে বলাগড়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ যেমন আছে, তেমনই বিজেপির ভেতরেও প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে চাপা অনীহা আছে। আর এই দুইয়ের ফাঁক গলেই বামেরা নিজেদের জায়গা শক্ত করতে চাইছে। তাই বলাগড় এখন সত্যিই একটি পরীক্ষাগার। এখানে ত্রিমুখী লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

পাণ্ডুয়া, চণ্ডীতলা, তারকেশ্বর, গোঘাট— এই আসনগুলিও নীরবে গুরুত্ব বাড়াচ্ছে। কারণ এখানে সামান্য ভোট সরে গেলেই বড় ফল তৈরি হতে পারে।

বিজেপিও হুগলিকে গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় সপ্তগ্রামে স্বরাজ ঘোষ, তারকেশ্বরে সন্তু পান, পুরশুড়ায় বিমান ঘোষ, আরামবাগে হেমন্ত বাগ, গোঘাটে প্রশান্ত দিগার এবং খানাকুলে সুশান্ত ঘোষ— এই নামগুলি সামনে এসেছে।

অর্থাৎ বিজেপি এখনও পূর্ণাঙ্গ তালিকা না দিলেও, যে আসনগুলোকে তারা মর্যাদার লড়াই বলে মনে করছে, সেগুলোয় আগেভাগেই প্রার্থী নামিয়ে দিয়েছে।

একথাও মনে রাখা জরুরি, এই লেখার সময় পর্যন্ত বিজেপি তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেনি। ফলে জেলার কয়েকটি আসনে তাদের চূড়ান্ত লড়াইয়ের ছবি এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

তবে যেসব আসনে তারা ইতিমধ্যেই প্রার্থী ঘোষণা করেছে, তা থেকেই বোঝা যায় তাদের প্রধান জোর কোথায়— একদিকে পুরশুড়া, আরামবাগ, গোঘাট, খানাকুল বেল্ট ধরে রাখা; অন্যদিকে সপ্তগ্রাম ও তারকেশ্বরের মতো আসনে নতুন জমি শক্ত করা।

হুগলি জেলায় এ বার প্রশাসনিক স্তরের বিষয়টিও উপেক্ষা করার মতো নয়। ভোটার তালিকা, BLO-তালিকা, ERO-তালিকা— সবই এখন রাজনৈতিক স্নায়ুচাপের অংশ।

উত্তরপাড়া, শ্রীরামপুর, চাঁপদানী, চণ্ডীতলার মতো আধা-শহুরে এলাকায় মানুষের ঠিকানা বদল ঘনঘন হয়। সেখানে ভোটার তালিকার সামান্য হেরফেরও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

এখানে আইএসএফ ও সংখ্যালঘু ভোটের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। হুগলিতে সংখ্যালঘু ভোট পুরো জেলায় সমানভাবে ছড়ানো নয়; চণ্ডীতলা, পাণ্ডুয়া, সপ্তগ্রাম-সহ কিছু বেল্টে তার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি।

ফলে সেখানে ভোটের মেরুকরণ বা কৌশলগত ভোট— দুটোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিজেপিকে ঠেকাতে সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশ তৃণমূলের দিকে যেতে পারে। আবার যেখানে তৃণমূলের বিরুদ্ধে স্থানীয় ক্ষোভ বেশি, সেখানে সেই ভোটের একটি অংশ বাম প্রার্থীর দিকেও সরে যেতে পারে।

অর্থাৎ, সংখ্যালঘু ভোট এখানে একরৈখিক হবে বলে মনে হয় না। আসনভেদে তার আচরণ বদলাবে। আর সেই বদল একাধিক কেন্দ্রে ফলের ব্যবধান ছোট করে দিতে, এমনকি ফল বদলেও দিতে পারে।

সব মিলিয়ে হুগলির ১৮টি আসনকে এখন তিন ভাগে নয়, চার ভাগে দেখতে হবে।

এক, তৃণমূলের তুলনামূলক স্বস্তির নিরাপদ আসন।

দুই, তৃণমূলের অস্বস্তির আসন— যেখানে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, প্রার্থী বদল বা অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ তীব্র।

তিন, বিজেপির বাস্তব শক্তির আসন— যেখানে তাদের ভোট শুধু ঢেউ নয়, সামাজিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে।

আর চার, সেই আসনগুলো যেখানে বামপন্থীরা শুধু ফল নির্ধারণের ক্ষমতাই রাখে না, জেলার দুই-তিনটি কেন্দ্রে বাস্তব জয়ের সম্ভাবনাও তৈরি করেছে।

উত্তরপাড়া, শ্রীরামপুর, বলাগড়, পাণ্ডুয়া বা চণ্ডীতলার মতো কয়েকটি আসনে যদি তৃণমূলের অন্দরের ক্ষোভ, বিজেপির সীমাবদ্ধতা এবং বামেদের গ্রহণযোগ্য প্রার্থী— এই তিনটি রেখা একসঙ্গে মিলে যায়, তা হলে বামেরা সেখানে শুধু ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে থাকবে না, সরাসরি জয়ের দৌড়েও উঠে আসতে পারে।

হুগলির ভোটের আসল চাবিকাঠি এখন এই চতুর্থ অঞ্চলটাই।

শেষ কথা হল, হুগলির ভোট এ বার কেবল আসন জয়ের খেলা নয়। এটি তৃণমূলের কাছে ঘর বাঁচানোর লড়াই, বিজেপির কাছে জমি ধরে রাখার লড়াই, আর বামেদের কাছে নিজেদের প্রত্যাবর্তনের লড়াই।

যে দল যত দ্রুত নিজের দলের ভিতরের ফাটল চিনতে পারবে, কর্মীদের ক্ষোভ সামলাতে পারবে, আর নীরবে মানুষের মনবদল ধরতে পারবে, সেই দলই শেষ হাসি হাসবে।

নির্দ্বিধায় বলা যায়, হুগলি জেলার ভোটে এবার শুধু ফল নয়, বহু রাজনৈতিক ধারণারও পরীক্ষা হবে। আর সেই পরীক্ষায় দুই-তিনটি আসনে বামপন্থীদের অপ্রত্যাশিত সাফল্য দেখা গেলে কেউ অবাক হবেন না।


Scroll to Top