তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
হাওড়ায় যে হিসাব মেলাতে পারবে, শেষ পর্যন্ত জিতবে সেই-ই

হাওড়ার ভোটকে যারা শুধু টিভির টক শো, সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস আর স্টুডিও-রাজনীতির ভেতর দিয়ে বুঝতে চান, তাঁরা ভুল করবেন। এই জেলায় ভোট শুধু দল দেখে হয় না। ভোট হয় দিনের দিন কে ভোট করাতে পারবে, কে মানুষের পাশে ছিল, আর কে কাজের প্রমাণ দেখাতে পারবে—তা দেখে। হাওড়ার মানুষের সোজা কথা—‘পাঁচ বছর কে আমাদের পাশে ছিল?’ , ‘বিপদে কে ফোন ধরেছে?’, ‘রাস্তা কে করে দিয়েছে?’, ‘ছেলে-মেয়েদের কাজের কথা কে বলছে?’ তাই এখানে পোস্টার যতই চেঁচাক, শেষ কথা বলবে পাড়া, বুথ আর মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।

প্রথমেই তথ্যটা পরিষ্কার করে নেওয়া যাক। হাওড়া জেলায় মোট ১৬টি বিধানসভা আসন। ২০২৬-এর বিধানসভা ভোট হবে ২৯ এপ্রিল। কিন্তু শুধু এই তথ্য দিয়ে হাওড়ার ভোট বোঝা যাবে না। এই জেলার রাজনীতি বুঝতে গেলে আরও গভীরে যেতে হবে।

প্রথম সূত্র খুব সহজ। ২০২১ সালে তৃণমূল হাওড়ার ১৬টির মধ্যে ১৬টিই জিতেছিল। কিন্তু এই ফল দেখে যদি কেউ ভাবেন, হাওড়ায় আবার একতরফা ভোট হবে, তা হলে তিনি ওপরের চিত্রটাই দেখছেন, ভেতরের স্রোতটা দেখছেন না। কারণ, সব জয়ের ব্যবধান একরকম ছিল না। কোথাও ব্যবধান ছিল খুব কম, কোথাও অনেক বেশি। বালিতে লড়াই ছিল জোরালো। হাওড়া উত্তরেও ব্যবধান ছিল টানটান। আবার অন্য কয়েকটি আসনে তৃণমূল অনেক বেশি স্বস্তিতে ছিল। তার মানে একটাই—হাওড়ায় তৃণমূল এগিয়ে আছে, কিন্তু সব আসনে একই রকম নিশ্চিন্ত নয়।

তাই এবারের লড়াইকে শুধু ‘কে এগিয়ে’ দিয়ে মাপলে ভুল হবে। দেখতে হবে কোথায় কার সংগঠন, কোথায় কার মুখ, কোথায় কার ক্ষোভ, আর কোথায় কার ভরসা। তৃণমূল এখনও এই জেলায় সবচেয়ে শক্তিশালী, কারণ তাদের নেটওয়ার্ক আছে, জনসংযোগ আছে, আর স্থানীয় স্তরে পৌঁছনোর ক্ষমতা আছে। কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত, ব্লক নেতৃত্ব, ক্লাব, পাড়ার পরিচিত মুখ—এই গোটা নেটওয়ার্ক এখনও সক্রিয়। ভোটের সময় এই নেটওয়ার্ক অনেক অভিযোগ সামলে দেয়। মানুষ তৃণমূলের ওপর রাগ করে, গাল দেয়, ক্ষোভও জানায়; তবু শেষে ভাবে, ‘কাজে লাগবে কে?’ এখানেই তৃণমূলের বড়ো সুবিধা।

২০২৬-এর প্রার্থী তালিকাতেও সেই কৌশল ধরা পড়ছে। বালিতে কৈলাশ মিশ্র, হাওড়া উত্তরে গৌতম চৌধুরী, হাওড়া মধ্যে অরূপ রায়, শিবপুরে রানা চট্টোপাধ্যায়, হাওড়া দক্ষিণে নন্দিতা চৌধুরী, সাঁকরাইলে প্রিয়া পাল, পাঁচলায় গুলশন মল্লিক, শ্যামপুরে নাদেবাসী জানা, বাগনানে অরুণাভ সেন, আমতায় সুকান্ত কুমার পাল, উদয়নারায়ণপুরে সমীর কুমার পাঞ্জা, ডোমজুড়ে তাপস মাইতি—এই তালিকায় পুরনো মুখও আছে, আবার প্রয়োজনমতো বদলও আছে। তৃণমূল বুঝেছে, ২০২১-এর জয়কে ২০২৬-এ হুবহু কপি-পেস্ট করা যায় না। যেখানে দরকার, সেখানে মুখ পাল্টাতেই হবে।

এবার আসুন বিজেপির কাছে। বিজেপির সমস্যা অন্য জায়গায়। তারা হাওড়ার অনেক অঞ্চলে উপস্থিত, কিন্তু সর্বত্র প্রোথিত নয়। শহুরে হাওড়ার কিছু অংশে তাদের ভোট আছে—বিশেষ করে যেখানে হিন্দিভাষী ভোটার, মধ্যবিত্ত ক্ষোভ, নাগরিক অসন্তোষ আর তৃণমূল-বিরোধী মনোভাব একসঙ্গে কাজ করে। তাই বিজেপি প্রার্থী বাছাইয়ে দু’ধরনের রাস্তা নিয়েছে—কোথাও স্থানীয় মুখ, কোথাও প্রচার-সক্ষম মুখ। শিবপুরে রুদ্রনীল ঘোষ, শ্যামপুরে হিরণ চট্টোপাধ্যায়—এই নামগুলো সেই কৌশলেরই অংশ।

বিজেপি বলতে চাইছে, ‘আমরাও লড়াইয়ে আছি, আমাদের প্রচারও জোরে চলবে।’ কিন্তু হাওড়ার ভোটাররা শুধু প্রচারের চাকচিক্যে সহজে মুগ্ধ হন না। তাঁরা পাল্টা প্রশ্ন করেন—‘ভোটের আগে এলেন, পাঁচ বছর কোথায় ছিলেন?’ এই প্রশ্নের উত্তর শুধু মঞ্চে দাঁড়িয়ে দেওয়া যায় না। বুথে বুথে দিতে হয়। বিজেপি সেই স্তরের বুথভিত্তিক সংগঠন এখনও সব জায়গায় গড়ে তুলতে পারেনি। তার উপর হাওড়ায় বড়ো সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে, যা বিজেপির নাগালের বাইরে।

বাম-সহযোগী শিবিরের অবস্থাও একরকম নয়। এখানে আর পুরনো দিনের মতো টানা লাল মানচিত্র নেই। কোথাও CPI(M), কোথাও ফরওয়ার্ড ব্লক, কোথাও ISF—মিলিয়ে লড়াই চলছে। বালিতে শঙ্কর মৈত্র, হাওড়া উত্তরে গৌতম রায়, হাওড়া মধ্যে ইমতিয়াজ আহমেদ, হাওড়া দক্ষিণে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবপুরে জগন্নাথ ভট্টাচার্য, পাঁচলায় ফরিদ মোল্লা, শ্যামপুরে অসিতবরণ সাউ—এই ছবিটা বলে দিচ্ছে, বাম শিবির এখনও কিছু গ্রহণযোগ্য মুখ তুলতে পারছে।

কিন্তু তাদের বড়ো সমস্যা বিশ্বাসের ঘাটতি। ভোটাররা অনেক সময় বামপন্থী নেতা, কর্মী আর প্রার্থীদের সম্মান দেন, কিন্তু ভোট দেন না। তাঁদের মনে প্রশ্ন—‘আপনারা জিতবেন তো?’ এই একটাই প্রশ্ন আজ বামেদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড়ো বাধা। রাজনীতিতে শুধু সততা যথেষ্ট নয়, জয়ের সম্ভাবনাও বড়ো ফ্যাক্টর। হাওড়ার ভোটার সেটাই বুঝে গেছেন।

শহুরে হাওড়ার একটা আলাদা ভাষা আছে। বালি, হাওড়া উত্তর, হাওড়া মধ্য, শিবপুর, হাওড়া দক্ষিণ—এই বেল্টে মানুষ এখনও কারখানার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন, কিন্তু বাস্তবতা বদলে গেছে। রাস্তা ভাঙা, জল দাঁড়ানো, ট্রাফিক, নিকাশি, ছোট ব্যবসার চাপ, বেকারত্ব—এই সবই এখানে বড়ো ভোটের ইস্যু। এক সময় ট্রেড ইউনিয়নের রাজনীতি ছিল এই অঞ্চলের মেরুদণ্ড। এখন কারখানা কমেছে, চাকরির ধরন বদলেছে, শ্রমের চরিত্র পাল্টেছে। ফলে মানুষের মনের ভাষাও বদলে গেছে।

আগে বলা হত ‘শ্রমিক অধিকার’ । এখন বলা হয়, ‘কাজ কোথায়?’ আগে শোনা যেত ‘শিল্প চাই’। এখন অনেকেই বলেন, ‘বাড়ির ছেলে বাইরে কাজে যাবে কেন?’ এই বদলে যাওয়া হতাশা না বুঝে শহুরে হাওড়ার ভোটকে বোঝা যাবে না। এখানে আবেগ আছে, কিন্তু সেই আবেগের নিচে জমাট বেকারত্বও আছে।

আবার গ্রামীণ ও আধা-শহর হাওড়ার ভাষা একেবারেই আলাদা। সাঁকরাইল, পাঁচলা, উলুবেড়িয়া পূর্ব, উলুবেড়িয়া উত্তর, উলুবেড়িয়া দক্ষিণ, শ্যামপুর, বাগনান, আমতা, উদয়নারায়ণপুর, জগৎবল্লভপুর—এই অঞ্চলগুলিতে ভোটের মাপকাঠি আবার অন্য। এখানে মানুষ সোজা কথা বলেন—‘রাস্তা হবে?’, ‘সেচ মিলবে?’ , ‘হাসপাতালে ডাক্তার থাকবে?’ , ‘স্কুলটা বাঁচবে?’ , ‘ফসলের দাম পাব?’ প্রার্থী যদি অচেনা হন, যদি এলাকায় না থাকেন, যদি বিপদের দিনে মানুষের পাশে না দাঁড়ান, তা হলে শুধু দলীয় প্রতীকের জোরে এখানে ভোট টানা যায় না। গ্রামীণ হাওড়ায় লড়াই টিভির ভাষায় নয়, সম্পর্কের ভাষায় হয়।

হাওড়ার ভোটে আর-একটা দীর্ঘ ছায়া আছে—শিল্পহীনতার ছায়া। একদিন এই জেলা ‘বাংলার শেফিল্ড’ নামে পরিচিত ছিল। এখন সেই নামের স্মৃতি আছে, গৌরবও কিছুটা আছে, কিন্তু আগের অর্থনীতি নেই। ছোটো কারখানা কমেছে, পুরনো শিল্প দুর্বল হয়েছে, নতুন কাজের নিশ্চয়তা তৈরি হয়নি। ফলে ভোটের মঞ্চে যে যত বড়ো বড়ো কথাই বলুক, মানুষ শেষে এসে একটা কথাই তোলে—‘কাজ কোথায়?’

মানুষ আরও জিজ্ঞেস করে—‘এলাকার ছেলেরা বাইরে যাবে কেন?’ , ‘শিল্পের নাম শুনি, কারখানা দেখি না কেন?’ যে দল এই প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর দিতে পারবে, সে শুধু ভোট নয়, ভবিষ্যৎও পাবে। আর যে দল শুধু আবেগ বেচবে, সে হাততালি পেতে পারে, ভোট নাও পেতে পারে।

তাই ২০২৬-এর হাওড়া বিধানসভা ভোটে তৃণমূল অনেকটাই এগিয়ে—কারণ, তাদের সংগঠন আছে, সরকারি স্তরে অ্যাক্সেস আছে, আর বহু জায়গায় লোকাল নেটওয়ার্ক এখনও অটুট। বিজেপি লড়ছে, বিশেষ করে শহুরে বেল্টে এবং কিছু অসন্তোষ-ভিত্তিক আসনে। কিন্তু সেই তুলনায় তাদের সংগঠন এখনও অসম। বাম ফ্রন্ট ও তাদের সহযোগীরা কিছু আসনে সম্মানজনক লড়াই করবে, কিছু জায়গায় ভোট কেটে অঙ্ক উল্টেও দিতে পারে, কিছু জায়গায় মুখের মর্যাদাও পাবে—কিন্তু গোটা জেলায় এখনও তারা প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। এই সত্যিটা না মানলে বিশ্লেষণ কিন্তু ভুল হবে।

শেষ কথা খুব সোজা। হাওড়া এবার বক্তৃতা শুনবে না, প্রশ্ন তুলবে। মানুষ জিজ্ঞেস করবে—‘কে পাশে ছিল?’, ‘কে ভরসা দিয়েছে?’ , ‘কে শুধু মাইক বাজিয়েছে?’ হাওড়ার ভোটার চুপচাপ থাকেন, কিন্তু অন্ধ নন। তাঁরা প্রার্থী বুঝে, সম্পর্ক বুঝে, কাজ বুঝে ভোট দেবেন।

তাই হাওড়ার রায়ও সম্ভবত খুব স্পষ্ট হবে—পোস্টারের বাইরে, স্লোগানের বাইরে, মুখের বাইরে গিয়ে মানুষ এবার খুঁজবেন ভরসা, কাজ আর সম্পর্কের হিসাব। যে সেই হিসাব মেলাতে পারবে, শেষ পর্যন্ত জিতবে সেই-ই।


Scroll to Top