তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে

ভারতে কন্যাশিশুদিবস পালিত হয় ২৪ জানুয়ারি। যে-দেশে রাজনৈতিক মানুষকে মুহুর্মুহু শ্লোগান দিতে হয় মেয়েদের বাঁচিয়ে রাখা হোক, সেখানে এই জাতীয় কন্যাশিশুদিবস সমারোহে পালন করা, বিকট রসিকতা নয়?

যেখানে, আমার পাশের বাড়ির রীতাকাকিমা, পুত্রবধূর কন্যাসন্তান প্রসব করার পর নার্সিংহোমে নাত্নির মুখ দেখতে না গিয়ে সখেদে আমাকে বলেন,' আবার মেয়ে হয়েছে বৌমার!কোন আনন্দে দেখতে যাই বলো!'সেখানে কন্যাশিশুদিবস নিয়ে আদিখ্যেতামূলক নাচানাচি করাটা কি মস্ত প্যারাডক্স নয়!

পরিসংখ্যান বলছে, গত একবছরে শিশুকন্যা ধর্ষণের, হার ৭৫ শতাংশ বেড়েছে।

গতবছর জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মধ্যে ৩০৬জন কন্যাশিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। যেখানে ২০২৪-য়ে ওই একই সময়ে ১২৪ জন শিশুকন্যা ধর্ষিতা হয়েছিল।

সমস্যা, আমাদের পারিবারিক গঠনের মধ্যেই তো নিহিত আছে। মেয়েদের মেধাকে গুরুত্ব দিই না আমরা। অনেক বিধিনিষেধে বেঁধে দিই তাকে। পিতৃতান্ত্রিক একটি সমাজে মানুষ ভাবে, যতটুকু স্বাধীনতা একজন নারীকে দেওয়া হবে, তার বেশি সে দাবি করলে, সেটা অপরাধ।

শিশুকন্যাকে, শিশুপুত্রসন্তানের মতো আজও সমান মর্যাদায় বড় করা হয় না অনেক অত্যাধুনিক পরিবারেও। আজও তো ভাবা হয়, মেয়ে জন্মেছে পরের ঘরে যাওয়ার জন্য। পণ্যসামগ্রীর মতো সাজিয়ে গুছিয়ে  বড় করা হচ্ছে তাকে মহার্ঘ করে তোলার জন্য। যখন. একইসময়ে তার দাদা বা ভাইটিকে স্বপ্ন দেখতে শেখানো হচ্ছে আকাশ ছোঁয়ার জন্য।কাজেই বাড়িতে বড় হয়ে ওঠা ছেলেটি দেখে তার জন্য একরকম আয়োজন। এবং একইসঙ্গে বোনের জন্য অন্য ব্যবস্থা।অতএব, তার মনস্তত্ব তখন কোনোমতেই পারে না একটি মেয়েকে তার যে বৃহত্তর জগৎ, সেখানে সঙ্গী করে নিতে। পারে না, বিয়ের পর স্ত্রীকেও সমানাধিকার দিতে। সেই মেয়ে ডানা মেলে একটুআধটু উড়তে চাইলেও সে তার ডানা ছেঁটে দিতে চায়। কারণ সে তো বড় হতে হতে বাড়িতেও এই একই 'শিষ্টাচার' লক্ষ করে এসেছে।

আরে! আপনি নিজেই ভেবে দেখুন, প্রতিবছর কোনো একটা দিনকে বিশেষভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে তোলা হল। কচি কচি মেয়েরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচল, গাইল, নাটক করল, নেতারা কন্যাশিশুর স্বার্থে অনেক জ্ঞানগর্ভ কথা বললেন। কিন্তু তারপর? পরদিন থেকে কি মেয়েটি একাএকা রাত করে নির্ভাবনায় বাড়ি  ফিরতে পারবে? তার বাড়ির লোকজন ঘরবার করবেন না? পরদিন থেকে কি মেয়েটি শর্টস্ পরে বেরোলে চায়ের দোকান থেকে জোর সিটি উঠবে না?বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সে আউটিঙে গেলে আত্মীয়স্বজন নিন্দেয় মূখর হয়ে উঠবে না?

বস্তুত, আমাদের যাবতীয় ভদ্রতা সভ্যতাকে দূরে সরিয়ে, আমি বলতে বাধ্য, মেয়েরা হল গিয়ে যৌনসামগ্রী।ন দশ বছরের বালিকার জন্য অনুশাসন শুরু হয়ে যায়, ছেলেদের গায়ে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসবে না, দাঁড়াবে না। নিজের মামা কাকারও কোলে উঠবে না আর!

শিশুকন্যা জন্মানোর আগেই ভ্রুণের লিঙ্গ নির্ধারণ করা গেলে, ভাবী জননীর গর্ভপাত ঘটানো হয় কিছু পরিবারে, আজও!আমাদের দেশে কোথাও আরও ভয়ংকর প্রথা, সদ্যোজাত কন্যার মুখে নুনচাপা দিয়ে মেরে ফেলা হয়। এগুলো সিনেমা বা নাটকনভেলের গল্প নয়। রুক্ষ বাস্তবকথা।ফলে, আমাদের লিঙ্গভিত্তিক ধারণাগুলোর আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। একই পরিবারে একজন'ছেলের মা' গরবিণী হয়ে ঘুরে বেড়ায় আর একজন 'মেয়ের মা' চোরের মতো বাঁচে।এ দৃশ্য নিজের চোখে দেখেছি আমি!

শিশুকন্যার জন্য যদি উৎসবই করি আমরা তবে তার চলার পথটিকে সামাজিক অন্ধকারে ঢেকে না রেখে,চেষ্টা তো করতে পারি আলো জ্বালিয়ে দিতে। নতুন ছড়া বানিয়ে বলতে তো পারি 'গেরস্তের ঘরে কোল-আলো খুকি হোক!' শিশুকন্যাকে প্রকৃত সুস্থতা, প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেওয়ার  ব্যবস্থা চাই সবকিছুর আগে। আর চাই ছেলেদের জন্য স্বাভাবিক যৌনশিক্ষা। যে-শিক্ষা শিশুকন্যা দেখলেই লাফিয়ে পড়ার মন থেকে তাকে বিরত করবে। যে-শিক্ষা কোনোমতেই তাকে মেয়েদের ভোগ্যপণ্য ভাবতে শেখাবে না।

না হলে, জন্মেই সে কন্যাসন্তানটি হয়তো চারপাশের শ্বাপদসংকুল অরণ্য দেখে ভয় পেয়ে আবার মাতৃগর্ভেই ফিরে যেতে চাইবে। আর, কাগজেকলমে সাফল্য পাবে আমাদের জাতীয় শিশুকন্যাদিবস।

আমাকে তুই আনলি কেন, ফিরিয়ে নে

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়

ভারতে কন্যাশিশুদিবস পালিত হয় ২৪ জানুয়ারি। যে-দেশে রাজনৈতিক মানুষকে মুহুর্মুহু শ্লোগান দিতে হয় মেয়েদের বাঁচিয়ে রাখা হোক, সেখানে এই জাতীয় কন্যাশিশুদিবস সমারোহে পালন করা, বিকট রসিকতা নয়?

যেখানে, আমার পাশের বাড়ির রীতাকাকিমা, পুত্রবধূর কন্যাসন্তান প্রসব করার পর নার্সিংহোমে নাত্নির মুখ দেখতে না গিয়ে সখেদে আমাকে বলেন,' আবার মেয়ে হয়েছে বৌমার!কোন আনন্দে দেখতে যাই বলো!'সেখানে কন্যাশিশুদিবস নিয়ে আদিখ্যেতামূলক নাচানাচি করাটা কি মস্ত প্যারাডক্স নয়!

পরিসংখ্যান বলছে, গত একবছরে শিশুকন্যা ধর্ষণের, হার ৭৫ শতাংশ বেড়েছে।

গতবছর জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মধ্যে ৩০৬জন কন্যাশিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে। যেখানে ২০২৪-য়ে ওই একই সময়ে ১২৪ জন শিশুকন্যা ধর্ষিতা হয়েছিল।

সমস্যা, আমাদের পারিবারিক গঠনের মধ্যেই তো নিহিত আছে। মেয়েদের মেধাকে গুরুত্ব দিই না আমরা। অনেক বিধিনিষেধে বেঁধে দিই তাকে। পিতৃতান্ত্রিক একটি সমাজে মানুষ ভাবে, যতটুকু স্বাধীনতা একজন নারীকে দেওয়া হবে, তার বেশি সে দাবি করলে, সেটা অপরাধ।

শিশুকন্যাকে, শিশুপুত্রসন্তানের মতো আজও সমান মর্যাদায় বড় করা হয় না অনেক অত্যাধুনিক পরিবারেও। আজও তো ভাবা হয়, মেয়ে জন্মেছে পরের ঘরে যাওয়ার জন্য। পণ্যসামগ্রীর মতো সাজিয়ে গুছিয়ে  বড় করা হচ্ছে তাকে মহার্ঘ করে তোলার জন্য। যখন. একইসময়ে তার দাদা বা ভাইটিকে স্বপ্ন দেখতে শেখানো হচ্ছে আকাশ ছোঁয়ার জন্য।কাজেই বাড়িতে বড় হয়ে ওঠা ছেলেটি দেখে তার জন্য একরকম আয়োজন। এবং একইসঙ্গে বোনের জন্য অন্য ব্যবস্থা।অতএব, তার মনস্তত্ব তখন কোনোমতেই পারে না একটি মেয়েকে তার যে বৃহত্তর জগৎ, সেখানে সঙ্গী করে নিতে। পারে না, বিয়ের পর স্ত্রীকেও সমানাধিকার দিতে। সেই মেয়ে ডানা মেলে একটুআধটু উড়তে চাইলেও সে তার ডানা ছেঁটে দিতে চায়। কারণ সে তো বড় হতে হতে বাড়িতেও এই একই 'শিষ্টাচার' লক্ষ করে এসেছে।

আরে! আপনি নিজেই ভেবে দেখুন, প্রতিবছর কোনো একটা দিনকে বিশেষভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে তোলা হল। কচি কচি মেয়েরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নাচল, গাইল, নাটক করল, নেতারা কন্যাশিশুর স্বার্থে অনেক জ্ঞানগর্ভ কথা বললেন। কিন্তু তারপর? পরদিন থেকে কি মেয়েটি একাএকা রাত করে নির্ভাবনায় বাড়ি  ফিরতে পারবে? তার বাড়ির লোকজন ঘরবার করবেন না? পরদিন থেকে কি মেয়েটি শর্টস্ পরে বেরোলে চায়ের দোকান থেকে জোর সিটি উঠবে না?বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সে আউটিঙে গেলে আত্মীয়স্বজন নিন্দেয় মূখর হয়ে উঠবে না?

বস্তুত, আমাদের যাবতীয় ভদ্রতা সভ্যতাকে দূরে সরিয়ে, আমি বলতে বাধ্য, মেয়েরা হল গিয়ে যৌনসামগ্রী।ন দশ বছরের বালিকার জন্য অনুশাসন শুরু হয়ে যায়, ছেলেদের গায়ে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসবে না, দাঁড়াবে না। নিজের মামা কাকারও কোলে উঠবে না আর!

শিশুকন্যা জন্মানোর আগেই ভ্রুণের লিঙ্গ নির্ধারণ করা গেলে, ভাবী জননীর গর্ভপাত ঘটানো হয় কিছু পরিবারে, আজও!আমাদের দেশে কোথাও আরও ভয়ংকর প্রথা, সদ্যোজাত কন্যার মুখে নুনচাপা দিয়ে মেরে ফেলা হয়। এগুলো সিনেমা বা নাটকনভেলের গল্প নয়। রুক্ষ বাস্তবকথা।ফলে, আমাদের লিঙ্গভিত্তিক ধারণাগুলোর আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। একই পরিবারে একজন'ছেলের মা' গরবিণী হয়ে ঘুরে বেড়ায় আর একজন 'মেয়ের মা' চোরের মতো বাঁচে।এ দৃশ্য নিজের চোখে দেখেছি আমি!

শিশুকন্যার জন্য যদি উৎসবই করি আমরা তবে তার চলার পথটিকে সামাজিক অন্ধকারে ঢেকে না রেখে,চেষ্টা তো করতে পারি আলো জ্বালিয়ে দিতে। নতুন ছড়া বানিয়ে বলতে তো পারি 'গেরস্তের ঘরে কোল-আলো খুকি হোক!' শিশুকন্যাকে প্রকৃত সুস্থতা, প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেওয়ার  ব্যবস্থা চাই সবকিছুর আগে। আর চাই ছেলেদের জন্য স্বাভাবিক যৌনশিক্ষা। যে-শিক্ষা শিশুকন্যা দেখলেই লাফিয়ে পড়ার মন থেকে তাকে বিরত করবে। যে-শিক্ষা কোনোমতেই তাকে মেয়েদের ভোগ্যপণ্য ভাবতে শেখাবে না।

না হলে, জন্মেই সে কন্যাসন্তানটি হয়তো চারপাশের শ্বাপদসংকুল অরণ্য দেখে ভয় পেয়ে আবার মাতৃগর্ভেই ফিরে যেতে চাইবে। আর, কাগজেকলমে সাফল্য পাবে আমাদের জাতীয় শিশুকন্যাদিবস।


Scroll to Top