
এক. এ তারিখটি যে প্রশ্ন করতে পারে
আবার এসেছে ২১ ফেব্রুয়ারি, প্রত্যেকবারই আসবে সাংস্কৃতিক অনিবার্যতা নিয়ে। কিন্তু একটা প্রশ্ন নিয়েও আসবে। প্রশ্নটা হল, এই যে, ভাষা-শহিদ দিবস, তা থেকে একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের সৃষ্টি, তা থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস—সবকিছুর কেন্দ্রে তো আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। মহাগৌরবময় ভাষা, উপমহাদেশের সবচেয়ে বেশি নোবেল পুরস্কৃতদের মুখের ভাষা ; এখন আবার ধ্রুপদি তকমাও পেয়ে সে ঝলমল করছে। তা প্রশ্ন হল, সেই বাংলা ভাষাকে, আমরা, তার বক্তারা—এখনই ঠিক কী অবস্থায় রেখেছি ?
কী অবস্থায়, মানে বাঁচা-মরার ঠিক কোন অবস্থানে ? আপনারা জানেন, জীবন মানেই জন্মমৃত্যুর দুই প্রান্ত একটা টানা পথ। বাংলাভাষার জন্ম হওয়ার পর থেকে বাঁচার অনেকটা পথ এগিয়ে এসেছে, অনেক গৌরব ও মহিমা পেয়েছে—মূলত তার সাহিত্যের জন্য, আবার দেশপ্রেম ইত্যাদির একটা বড় ভিত্তি হওয়ারও জন্য।
কিন্তু ভাষা মরেও যায়। ভাষার এই মৃত্যু নিয়ে পৃথিবী (ইউনেস্কো ইত্যাদি) খুব উদ্বিগ্ন, কারণ তার হিসেবে আদিকালের হাজার পনেরো ভাষার মধ্যে অর্ধেক এর মধ্যে মরে গেছে, আর এখনকার প্রায় সাত হাজার জীবন্ত ভাষার মধ্যে এমন অবস্থা হয়েছে যে, ভাষাবিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, তারও অর্ধেক এই একবিংশ শতাব্দীতে নাকি মরে যাবে। হিসেবটা কী মারাত্মক ভেবে দেখুন একবার ! প্রায় আট হাজার ভাষার মরে যেতে ধরুন চল্লিশ হাজার বছর লাগল, আর এই একটা শতাব্দী নাকি সাড়ে তিন হাজার ভাষাকে শ্মশানে তুলবে। অতীব রোমাঞ্চকর এক সম্ভাবনা। কী চমৎকার এক সময়ের মধ্যে বাস করছি আমরা।
তা এই মরণপথের যাত্রী ভাষাগুলির মধ্যে কি বাংলা আছে ? এবারের ২১শে ফেব্রুযারির বুক-চাপড়ানো উৎসবের মধ্যে এ কথাটা আবার প্রশ্ন হিসেবে এসেছে। এটার একটা ব্যবস্থা না করে শুধু উৎসব করলে হবে কি না, সে আর-একটা প্রশ্ন।
দুই. কোন বাংলাভাষার কুশল নিয়ে ভাবছি ?
বাংলাভাষা বলতে আমরা সাধারণত লেখাপড়ার মান্য চলিত বাংলা বুঝি। কিন্তু তা তো ঘটনা নয়, মুখের অনেক বাংলা আছে, সেগুলোকে রক্ষা করা নিয়ে কোনও আলোচনা বিশেষ হয় না। আমাদের ‘মাতৃভাষা’ বলতেও আমরা এটাকেই বুঝছি, যদিও আক্ষরিক অর্থে এটা অনেক বাঙালির আসল মাতৃভাষা (ঘরের প্রথম ভাষা) নয়।
এখানে প্রসঙ্গসূত্রে বা প্রসঙ্গ থেকে সরে গিয়ে, একটা সাময়িক রাজনৈতিক ঘটনাশৃঙ্খলের কথা বলি। এখন ভারতের নানা প্রান্তে বাংলাভাষীদের ওপর আক্রমণ কি বাংলাভাষার পক্ষে বিপজ্জনক বা ক্ষতিকারক ?
আমার পরিষ্কার উত্তর, এটা বাঙালির ওপর আক্রমণ যতটা, বাংলা ভাষার (যে-বাংলাই হোক) উপর আক্রমণ ততটা নয়। এখানে পরিযায়ী শ্রমিক ও অন্যান্যদের মুখে বলা বাংলাভাষা একটা চিহ্নমাত্র, যার দ্বারা ওরা ‘বাঙালি’ (ওদের ভুল ধারণায় ‘বাংলাদেশী’)-দের শনাক্ত করে এবং হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক ক্রোধ উগরে পেটায় বা খুন করে। এটা ভাষার প্রতি আক্রমণ নয়, ভাষা দিয়ে চি্হ্নিত রাষ্ট্রিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর আক্রমণ। তাতে কোনও ধরনের বাংলা ভাষার (এবং তার সাহিত্যের) কিছুই এসে যায় না। অন্যদিকে আক্রমণকারীদের শিক্ষিত অংশ হয়তো বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ মন দিয়ে পড়ে। ফলে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা আর স্বার্থরক্ষার ব্যবস্থা আমাদের কর্তেই হবে, কেন্তু সেটা অন্য লড়াই, ভাষা বাঁচানোর লড়াই নয়। এমনকি পরিযায়ী শ্রমিকেরা যদি সুদিনের সন্ধান পায় আর প্রবাসে থিতু হয়ে অন্য ভাষার চাপে বাংলা ভাষা ভুলেও যায়, সেটা আমার ভাষার পক্ষে মারাত্মক কিছু হবে না। অন্য ভাষার পরিযায়ীরা বাংলাভাষী অঞ্চলে এসে হয়তো বাংলা শিখবে। এমন প্রায়ই হয়।
তিন. তবে কাদের হাতে বাংলাভাষা বিপন্ন ?
স্পষ্ট করে বলছি বলে কথাটা সকলের পছন্দ নাও হতে পারে। বাংলা ভাষা (মান্য চলিত, মুখে বলার ভাষা আর সাহিত্য) বিপন্ন খোদ বাঙালিদের হাতে। মুখের মান্য চলিত বাংলা বিপন্ন কাদের হাতে ? না এক, যে বাঙালিরা নিজেদের ইংরেজি শিক্ষিত উচ্চম্মন্যতায় বাংলার মধ্যে ইংরেজি মিশিয়ে খিচুড়ি ভাষা বলে অন্যদের চেয়ে নিজেদের ‘শিক্ষিত’ প্রমাণ করবার চেষ্টা করে। এটা আজকের ভাষায় একটা ‘ঔপনিবেশিক’ মনোভাব, এক ধরনের দাসত্ব, তা হয়তো আমরা অনেকে খেয়াল না করেই অবচেতনে বহন করে থাকি। বাংলায় প্রচুর ইংরেজি শব্দ অবশ্যই আছে, সেগুলো বাংলা হয়ে গেছে—চেয়ার, টেবিল, ফ্যান, স্কুল ইত্যাদি। কিন্তু তার বাইরে, ‘অ্যাকচুয়ালি আমি ওটা বলতে চাইনি, বাট আমাকে বলতে হল, সো তুমি এরকম খেপে গেলে’ এই হচ্ছে খিচুড়ি ভাষার প্রমাণ, ইংরেজিতে যাকে বলে কোড মিক্সিং আর কোড সুইচিং।
দুই, বাংলা সাহিত্যের, সংবাদ ও সাময়িকপত্রের পাঠক, অর্থাৎ লিখিত বাংলার পাঠক কমবার একটা ব্যবস্থা আর প্রতিবেশ এরই মধ্যে তৈরি করেছে প্রযুক্তি। টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল। এই চতুর্থ না পঞ্চম প্রযুক্তি বিপ্লবের শিকার শুধু বাঙালিরা নয়, তাই আমি বাঙালিদের আলাদা করে দোষ দেব না। কিন্তু বাঙালিদের বলব, বিপ্লবের ঝড়ে কাছাখোলা হয়ে উড়ে যাবেন না, নিজেদের বাংলা (মান্য-চলিতই ধরুন) মোটামুটি বাংলার চরিত্র বজায় রেখে মুখে বলুন, ঘরে, বাইরে বাঙালিদের সঙ্গে। বাংলা পড়ুন, লিখুন। প্রযুক্তির প্রভু হোন, দাস হবেন না। কম্পিউটারে মোবাইলে বাংলা অক্ষর ব্যবহার করুন, যে বানান জানেন তাতেই। বানানভুলের জন্য আমি বকব না, কিন্তু বাংলা পড়তে পড়তে তা শোধরাতে চেষ্টা করুন। আজ মুখবইয়ে দেখলাম এক প্রবীণ বাঙালি লেখিকা তাঁর মেয়ের অসুস্থতার কথা ভুল ইংরেজিতে জানিয়ে সকলের শুভেচ্ছা প্রার্থনা করেছেন। হয়তো তাঁর লক্ষ্য অবাঙালি বন্ধুরাও, কিন্তু I am request জাতীয় শব্দবন্ধ বুকে ধাক্কা দিল। তাঁর কন্যার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে, তাঁকে আঘাত করার বিন্দুমাত্র উদ্দেশ্য না নিয়ে বলি, বাংলায় তাঁর আবেদন লিখলে আমরা অবিমিশ্রভাবে খুশি হতাম।
তিন, এবার বাঙালি মানুষের দায়িত্বের কথায় ফিরে এসে বলি, বাংলা সাহিত্যের বাংলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করতে চলেছেন, জেনে বা না জেনে, সেই সব বাঙালি অভিভাবক, যাঁরা সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়িয়ে বাংলা ভাষাকে (সাহিত্যকে) পড়া আঋ ভালোবাসার মূল্যবান জীবন থেকে তাদের সরিয়ে নিতে চলেছেন। এক বিশাল প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে বাঙালি মধ্যবিত্ত আর উচ্চমধ্যবিত্তদের মধ্যে, যারা ভবিষ্যতে বাংলা তেমন বলবে না, আর খিচুড়ি বাংলা বললেও লেখার বাংলা আদৌ পড়বে না। তাই নিজেরা কখনও বাংলা লিখবে, তার তো প্রশ্নই ওঠে না। এই কারণেই লিখিত, মুদ্রিত বাংলায় বাংলা সাহিত্যের পাঠক তো ক্রমে ক্রমে কমবে। লেখকও কমবে। এই শ্রেণিটা ক্রমশ বাড়ছে। ঔপনিবেশিকতা আমাদের অস্থিতে মজ্জায় এমন ঢুকে যাচ্ছে যে, আমরা আমাদের সন্তানদের ইংরিজি শিখিয়ে শুধু খুশি নই, তাদের বাংলাটা ভুলিয়েও দিতে চাই। এখানেও বাঙালিরাই বাংলাভাষার সর্বনাশের জন্য দায়ভাগী হবে। অন্য কাউকে দোষ দেবার সুযোগই নেই।
এই অবস্থা তৈরির জন্য বর্তমান সরকারও অনেকটা দায়ী, কারণ সরকার বাংলা স্কুলগুলোকে অবহেলা করে এই সরকার এমন একটা বিশ্বাস তৈরি করেছে যে উচ্চাকাঙ্ক্ষী মধ্যবিত্ত সমাজ ভাবছে বাংলা স্কুলে পড়লে ছেলেমেয়ে মানুষ হবে না, ভালো করে ইংরেজি শিখবে না। আমাদের মতে বাংলাভাষায় স্কুলে সব বিষয় পড়েও দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি খুব ভালো করে শেখা আর শেখানো যায়। সরকারের উদাসীনতা সেই বিশ্বাসকে দুর্বল করেছে, আর বাংলা স্কুলে ইংরেজি ‘মাধ্যম’ প্রবর্তন তার গোড়া ধসিয়ে দিয়েছে। ভালো ইংরেজি বলতে লিখতে শেখার জন্য ইংরেজি ‘মাধ্যমে’ পড়ানোর দরকার নেই। বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ভালো করে সরকারি স্কুলেই শেখানো যায়। এই বিশ্বাস নিয়ে সরকারের এগিয়ে আসা উচিত ছিল। এখন ডিজিটাল যুগে আরও কত সুযোগ তৈরি হয়েছে ঘরে বসে ইংরেজি বা অন্য ভাষা শেখার।
এই বৃদ্ধ বয়সে, দিনশেষের কাছাকাছি এসে আমার ভাষার ভূস্তরের ক্ষয় দেখে আমি আতঙ্কিত হয়ে আছি।
আমার কথাগুলোর সঙ্গে যাঁরা দ্বিমত পোষণ করেন তাঁদের যুক্তিগুলো শোনার জন্য আমি আগ্রহী ও অপেক্ষমাণ।
শেষের মন্তব্য : এ কথাগুলো একটা ভাষার নিজের ভূমিতে ভাষা কীভাবে বিপন্ন হতে পারে মূলত তাই নিয়ে আলোচনা। বিদেশে অন্য ভাষার দুর্গতি-সুগতি অন্য প্রসঙ্গ। আমরা কখনও নিজেদের ভাষাভূমিতেই কিছুটা বিদেশ তৈরি করে নিই, বিশ্বায়ন, মানসিক ঔপনিবেশিকতা ইত্যাদির কারণে, এখানে মূলত সেই কথাগুলোই ছুঁয়ে যাওয়া হল। এবারের ২১শে ফেব্রুয়ারি আমাদের এই বিষয়টা নিয়ে ভাবার প্র্যাকটিসের মধ্যে ঠেলে দিক।