
শুধু তর্জন-গর্জন নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুনে ঘি ঢেলে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকেই এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা । আজকের ভাষণে ট্রাম্পের সুর ছিল অতীব আক্রমণাত্মক এবং চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ। হোয়াইট হাউস থেকে দেওয়া ভাষণে তিনি সরাসরি ঘোষণা করেছেন, আমেরিকা ইরানকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। অপারেশন এপিক ফিউরি নিয়ে ট্রাম্পের দাবি, গত চার সপ্তাহের অভিযানে ইরানের নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনী কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি দাবি করেছেন ইরানের শীর্ষ স্থানীয় প্রায় সব নেতাই নিহত হয়েছেন এবং দেশটিতে শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য না থাকলেও কার্যত তা-ই ঘটে গেছে। এক কথায় আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই ইরানকে চরমতম আঘাত করার ঘোষণা করেছেন তিনি। তাঁর লক্ষ্য পরিষ্কার—ইরানকে আলোচনার টেবিলে আসতে বাধ্য করা অথবা পুরোপুরি পঙ্গু করে দেওয়া।

ট্রাম্পের আজকের ভাষণের সবচেয়ে বিপজ্জনক অংশ ছিল হরমুজ প্রণালী নিয়ে। তিনি অন্যান্য দেশগুলোকে সাহস সঞ্চয় করে হরমুজ প্রণালীর দখল নিতে উস্কানি দিয়েছেন। তাঁর সাফ কথা, যারা জ্বালানি পাচ্ছে না, তারা যেন আমেরিকার থেকে তেল কেনে অথবা নিজেরাই গিয়ে প্রণালী দখল করে নেয়। মিত্র দেশগুলোর প্রতি তাঁর এই অবজ্ঞাসূচক সুর বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন ফাটল তৈরি করেছে বলেই কূটনীতিক মহলের ধারণা।
ট্রাম্পের ইরানকে এই প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে নেওয়ার হুঙ্কার বিশ্ব অর্থনীতিতে সুনামি নিয়ে এসেছে।
হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ থাকায় এবং ট্রাম্পের নতুন আক্রমণাত্মক ঘোষণায় ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এতে ইতিহাসে অন্যতম বড়ো সাপ্লাই শক ত্বরান্বিত হল বলে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা।
বিনিয়োগকারীরা আশা করেছিলেন ট্রাম্প হয়তো যুদ্ধবিরতির কোনো ইঙ্গিত দেবেন, কিন্তু উল্টো হুঙ্কারে ওয়াল স্ট্রিট থেকে দালাল স্ট্রিট—সবখানেই রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। নেমে এসেছে স্ট্যাগফ্লেশনের কালো ছায়া। আইএমএফ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক সতর্ক করেছে যে, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বৃদ্ধি কমবে এবং মুদ্রাস্ফীতি আকাশ ছোঁবে। বিশেষ করে ভারত ও ইউরোপের মতো জ্বালানি আমদানি নির্ভর দেশগুলোর ওপর এর প্রভাব হবে মারাত্মক। যুদ্ধের অস্থিরতায় বিনিয়োগকারীরা ইতিমধ্যেই নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ডলারের দিকে ঝুঁকতে শুরু করেছেন, যার ফলে ভারতীয় টাকা এবং অন্যান্য দেশের মুদ্রার মানও রেকর্ড হারে কমতে শুরু করেছে।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের আজকের ঘোষণা কোনো সমাধানের পথ দেখায়নি, বরং যুদ্ধের সময়সীমা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের ২০% জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ থাকা মানে হল সাধারণ মানুষের পকেট থেকে শুরু করে বড়ো বড়ো কর্পোরেট হাউসের ব্যালেন্স শিট, সব কিছুই এখন ট্রাম্পের এই তথাকথিত মিলিটারি অ্যাডভেঞ্চারের খুঁটিতে বাঁধা , যার থেকে এই মুহূর্তে অন্তত মুক্তির সম্ভাবনা দেখছে না ভারত সহ গোটা বিশ্ব।