
সারা পৃথিবীতে যে জিনিসগুলো মানুষের মৃত্যুর সবচেয়ে বড়ো কারণ হয়ে উঠেছে বলে দেখা গেছে সেসবের মধ্যে তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যগুলি অন্যতম। তামাক থেকে কেবল যে সিগারেট বিড়ি তৈরি হয় তা নয়, তামাকজাত এমন নেশার বস্তুও আছে যা অনেকে মুখে নিয়ে চুষে বা চিবিয়ে খান। এগুলো সবই শরীরের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব ক্ষতি যে একদম সঙ্গে সঙ্গে হয় তা নয়, এই ক্ষতি হয় দীর্ঘ সময় ধরে, আস্তে আস্তে। এগুলো ধীরে ধীরে শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষয় করে। সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিটা হয় না বলে মনে করার কোনো কারণ নেই যে ভবিষ্যতে কিছু হবে না। যখন এ ক্ষতি সত্যিই দেখা দেয়, তখন জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। এইজন্যেই আমরা বলি তামাকজাত যেকোনো বস্তুই শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর। এর থেকে যেকোনো বয়সের মানুষেরই দূরে থাকা উচিত। আমরা দেখি অনেকে মুখে গুটকা বা এই ধরনের নানা জিনিস নিয়ে উপভোগ করেন। জিগ্যেস করলে এঁরা বলেন, ভালো লাগে। কিন্তু তাঁরা জানেন না , বা জানলেও বুঝতে চান না যে, এর থেকে মুখে আলসার হয়। তার থেকে ক্যান্সার। শুধু যে মারণরোগের ভয়, তা কিন্তু নয়। ধূমপান যিনি করেন তাঁর ক্ষেত্রে সব সময়ে ক্যান্সার না হলেও, অনেক সময় সিওপিডি দেখা যায়। দীর্ঘকাল ধূমপান করতে করতে একসময় এসে এইসব অসুবিধে দেখা যেতেই পারে। তখন শ্বাসকষ্ট হয়। লাং ক্যান্সারও হতে পারে।
এ বাদে আরেকটা বড়ো ব্যাপার হল, যিনি ধূমপান করছেন তিনি নিজের ক্ষতি তো করছেনই , সেই সঙ্গে আশেপাশে যাঁরা আছেন, যাঁরা ধূমপান করেন না বা করছেন না, ক্ষতি কিন্তু তাঁদেরও হয়। আমাদের পরিভাষায় এটা হল প্যাসিভ স্মোকিং। এর ফলেও কিন্তু শরীরে রক্তপ্রবাহের সমস্যা দেখা যেতে পারে । পেশীতে সংক্রমণ হতে পারে। সময়ে সচেতন না হলে চিকিৎসাও সম্ভব না।
পরিসংখ্যান বলছে, সরাসরি ধূমপান থেকে বছরে সারা পৃথিবীতে মৃত্যু হয় ৮ মিলিয়ন মানুষের। এটা তো সরাসরি ধূমপান থেকে ক্ষতি। এছাড়াও ১.২ মিলিয়ন মানুষ মারা যান প্রতি বছর প্যাসিভ স্মোকিং-এর কারণে। এটা মানব সমাজের পক্ষে কত বড়ো ক্ষতি সহজেই বোঝা যায়।
এবার হার্টের ডাক্তার হিসেবে বলি, আমাদের কাছে অনেকে আসেন ধূমপান জনিত নানা অসুবিধে নিয়ে। আমরা তাঁদের বলি, ধূমপান থেকে সবাই জানেন নানা ক্ষতি হয়, ধূমপান ছেড়ে দিন। তখন তাঁরা বলেন, ‘এতদিন ধরে খাচ্ছি, ছাড়তে খুবই অসুবিধা হচ্ছে।’ তাঁদের যুক্তি , ‘এখন ছাড়লে কী লাভ? আসলে দেখুন ডাক্তারবাবু, যে ক্ষতি সে তো হয়েই গেছে।’ আমরা তখন বলি, মোটেই তা নয়। সমীক্ষা বলছে, ধূমপান বন্ধ করলে, আগামী পাঁচ দশ বছর যদি না খান , তাহলে আবার কিন্তু আগের অবস্থায় ফেরত যাওয়া সম্ভব। সেই সুস্থতা প্রত্যেকটা মানুষই তো চান।
এটাই আসলে বাস্তব। আমরা মানতে চাইলেও অনেক সময় মানতে পারি না এটা নিজেদেরই সমস্যা। সচেতনতা জাগানোর জন্য সরকারি-বেসরকারি স্তরে ব্যাপক উদ্যোগ দরকার। সারা পৃথিবীতে এই বিষয়ে অনেক প্রজেক্ট চলছে। তার যথেষ্ট সুফলও পাওয়া গেছে। আসল প্রয়োজন সচেতনতা। তামাক বিরোধী দিবসে এই সচেতনতাই সবচেয়ে বড়ো কথা। আসুন, আমরা শপথ নিই , আর তামাক নয়। পৃথিবীর সব মানুষের সুস্থতাই কাম্য।
লেখক প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও কারডিওলজিক্যাল সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট