
১৪ ফেব্রুয়ারি শিশুদিবস এই কথাটা মাথায় রেখেই বার বার মনে হচ্ছে আদতে চাচা নেহেরু শিশুদের জন্য কী চেয়েছিলেন ! Let us mould our children’s future with love and education, not with fear and punishment. ভালোবাসা আর শিক্ষা এই দুই শর্তেই তো শিশুর বেড়ে ওঠা, সুন্দর ও সার্থক হয়ে। এখানে ‘ভালোবাসা’ শব্দটা যত সহজে উচ্চারণ করা গেল, বাস্তবে শব্দটার ব্যাপকতা, বিস্তার ও বৈচিত্র্যের সবটুকু বোধহয় এখনও আমাদের বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন সম্পর্কের বিচিত্র ভালোবাসার রসায়ন শিশুমনকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাবলীল হতে সহায়তা করে। সেখানে বাবা-মা যেমন আছেন, পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও কিন্তু সেখানে সমান গুরুত্বের সঙ্গেই আছেন। শিশুর সঙ্গে প্রতিটা ভালোবাসার মুখই আলাদা আলাদা। কোনোটাকে দিয়েই কোনোটা রিপ্লেস করা যায় না। উচিতও না। সেক্ষেত্রে শিশুমনঃস্তত্ত্ব যে নিদারুণভাবে আহত হয়, তার ব্যক্তিত্ব বিকাশে যে বিঘ্ন ঘটে সে বিষয়ে অধিকাংশ সময়ই আমরা নিরুদ্বিগ্ন থাকি। এই তো সেদিন ‘পোস্ত’-সিনেমাটা দেখলাম। অতিনাটকীয় হলেও সিনেমার মেসেজটা ভাবিয়েছিল। যেখানে পোস্ত, মানে বাচ্চাটি শান্তিনিকেতনে তার ঠাম্মা-দাদুর তত্ত্বাবধানে থাকে। কর্মরত বাবা-মা শহরে থাকে। বাচ্চাটাকে নিয়ে একটা ঠান্ডা টেনশন সবসময়ই চলতে থাকে শাশুড়ি-শ্বশুর বনাম ছেলে-বৌমার মধ্যে। অথচ এই চারজন adult মানুষ, তাঁরা কিছুতেই বুঝতে চান না পোস্ত আসলে কী চায়! নিজেদের ইগো ও চাওয়া-পাওয়ার হিসেব নিকেশ করতে গিয়ে শিশুটি কোথাও হারিয়ে যায়।
আসলে পোস্ত কিন্তু চারজনকেই চায়। ভালোবাসার সেতুবন্ধনে পোস্ত প্রতিটা সম্পর্কের রসায়নকে নিজের মতো করে বুঝে নিতে চায়। কাউকেই হারাতে চায় না। আসলে আজকের দুনিয়ায় বিশ্বায়নের অ্যালগারিদমে আমরা বড্ডো বেশি করে আত্মপরতায় আক্রান্ত। ‘আমার ভালো থাকা’-র অধিকার নিয়ে বড্ডো বেশি মুখর। এ যুগের এটাই অসুখ। কম্প্রোমাইজ শব্দটা দুদিন বাদে শুধু অভিধানেই টিঁকে থাকবে। আর ঠিক এখান থেকেই একটা শিশুর ইনসিকিউরিটির শুরু। সে তার বাবা-মা আত্মীয়-পরিজন, স্বজন-বান্ধব সবাইকেই চায়। এদের সকলের সাহচর্য, ভালোবাসা আর আবেগের উষ্ণতায় শিশুমন তার সবটুকু আলো নিয়ে স্বপ্ন দেখতে চায়, কল্পনা করতে চায়।
শিশুমনকে যেমন স্বপ্ন দেখতে শেখাতে হয় তেমনি ভালোবাসতেও শেখাতে হয়। সেখানে এতটুকু খামতি হলেই সেটা কিন্তু শিশু থেকে পূর্ণ নাগরিক হওয়ার ভিতটাকে দুর্বল করে দেয়। চাচা নেহেরু সব সময় চাইতেন আজকের শিশুকে আগামীতে দেশের একজন পূর্ণ নাগরিক হিসেবে দেখতে। আমরা কি পারছি তাঁর সেই চাওয়ার সম্মান দিতে ?
ভালোবাসার উলটো উচ্চারণ হল ‘ভয়’! এই একবিংশ শতক একটা শিশুকে জন্ম ইস্তক ভয় ছাড়া আর কিই বা দিতে পেরেছে ! যুদ্ধ, দাঙ্গা, বোমা, মৃত্যু, আতঙ্ক, স্বজনহীনতা আজকের শিশুর বিপন্ন শৈশবের প্রথম পাঠ। ওদের ছেলেবেলা মানেই বীভৎসতায় বিক্ষত এক নির্মম অধ্যায়। সেখানে শৈশব কৈশোর সবটুকু জুড়ে আছে কেবলই মৃত্যুর আতঙ্ক! শিশুর সুকুমার মনের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের আগেই তা কুঁকড়ে দুমড়ে আকারহীন ! পরবর্তী সময়ে সে কখনোই সুস্থ স্বাভাবিক মনের একজন নাগরিক হয়ে উঠতে পারে না।
আজকের পৃথিবী জুড়েই ডিসটার্বড চাইল্ডহুড শিশুর সাবলীল মনোবিকাশের অন্তরায় হয়ে উঠেছে। একদিকে রাজনৈতিক আতঙ্ক যেমন তার শৈশবকে বার বার আঁচড়ে কামড়ে ছিন্নমূল করছে, ছুঁড়ে দিচ্ছে বীভৎসতার অন্তহীন নিঃসীমতায়, তেমনি অন্যদিকে কৃত্রিম মেধার চমকদার আতিশয্য ও টেকনোলজির যাদুমন্ত্র তাকে হৃদয়হীন যন্ত্রমানব তৈরি করছে। কারণ সে তো আজকাল আর পাশের বাড়ির পপিন বা টিনার সঙ্গে খেলে না ! ঠাকুরমার ঝুলি পড়ে না ! ফড়িং ধরতে ছোটে না ! প্রজাপতির ডানার রঙে মন রাঙায় না ! এখন তার সঙ্গী মা-বাবার মোবাইল ফোন। একটা ছোট্ট রাক্ষুসে ফোন, যে তার স্বপ্নময় রঙিন শৈশবে শুধু এক দোয়াত কালি ঢেলে দেয়। ‘হাবজি গাবজি’ সিনেমাটা দেখে চমকে উঠেছিলাম। খেলার মাঠ, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, গল্পের বইয়ে বুঁদ হয়ে থাকা আজ আর শিশুমনকে টানে না। প্রতিনিয়ত তারা নেশাগ্রস্ত হয়ে উঠছে অ্যানড্রয়েডে ! ভূতগ্রস্ত শৈশব নিয়ে দুঃস্বপ্নের মতো একটার পর একটা প্রজন্ম গজিয়ে উঠছে। আর পৃথিবীর বুকে নেমে আসছে আরও ভয় আরও আতঙ্ক ! সন্ত্রাস বিধ্বস্ত এক-একটা রাষ্ট্রে শিশুর শৈশব আজ নেয়ে উঠছে স্বজন বান্ধবের রক্তধারায় !
ভয় ! ভয় ! আরও ভয় পৃথিবী জুড়ে শিশুকন্যাদের। কখনও ভ্রূণাবস্থাতেই সে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সূর্যের নরম আলো ছুঁয়ে দেখার আর ফুরসৎ পাচ্ছে না, কখনও বা শিশুকন্যা হবার অপরাধে নারীমেধ যজ্ঞে বলি প্রদত্ত হচ্ছে ! তার অপরিণত তুলতুলে শিশুশরীরটা হয়ে উঠছে নরখাদকের বিকৃত কামের অবাধ চারণভূমি ! বিকারহীন একটা সময় শুধু নিরুত্তর হয়ে থাকে। আর রাশি রাশি বিক্ষত শৈশব অপেক্ষা করে স্তূপীকৃত আতঙ্কের সুড়ঙ্গ ধরে কবে আবার তারা একটা সুন্দর সকাল দেখবে ! ফেলে আসা পুতুলটা খুঁজে পাবে ! কবে আবার এই ধ্বস্ত পৃথিবী শিশুর বাসযোগ্য হয়ে উঠবে জানি না ! এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই বা জানতে ইচ্ছুকও নই আমরা। তা নইলে এই দেশ বা পৃথিবীর চেহারাটা এতটাই ভয়াবহ হয়ে ওঠে কী ভাবে ! মার্জনা করবেন চাচা নেহেরু, আমরা আপনার ইচ্ছেগুলো ইচ্ছে করেই প্রতিদিন একটু একটু করে হারিয়ে ফেলছি।