
কাশ্মীরে বর্তমান সন্ত্রাসবাদের সূচনা ৮০-র দশকের শেষের দিকে। মাঝে মাঝে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও হত্যালীলা চলতেই থেকেছে। সবসময়েই এতে মদত ছিল পাকিস্তানের। সেদেশের সেনা বাহিনী এবং গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-এর মদতে সেখানকার জঙ্গী সংগঠনগুলি কাশ্মীরী তরুণদের সেদেশে নিয়ে গিয়ে, ধর্মের নামে মগজ ধোলাই করে, অস্ত্র দিয়ে পাঠিয়ে দেয় কাশ্মীরে সন্ত্রাস চালানোর জন্য। আবার এদের অনেকের প্রাণও যায় নিরাপত্তাবাহিনীর হাতে। তাছাড়া পাকিস্তানের জঙ্গী সংগঠনের সদস্যরাও অনুপ্রবেশ করে একই উদ্দেশ্যে। এ চিত্র গত চার দশকে যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এর মধ্যে ঘটে গেছে কার্গিল, পুলওয়ামা, উরি-র সন্ত্রাসবাদী হামলা এবং কান্দাহার বিমান ছিনতাই-এর মতো বড়ো ঘটনাও। তার মধ্যে কয়েকবার উপত্যকায় নির্বাচন হয়েছে। আবার এই এলাকার জন্য ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা প্রত্যাহৃত হয়েছে। এসবের মধ্যেই কিছুদিন করে পর্যটকরা নিশ্চিন্তে কাশ্মীরের মনোরম শোভা উপভোগ করেছেন। আর একটু রোজগারের মুখ দেখেছেন কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ, যাঁদের জীবনযাত্রা পর্যটনের ওপরই নির্ভরশীল।
কিন্তু বাস্তব এটাই যে কাশ্মীর সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হয়নি। কেন্দ্রে বিভিন্ন সরকার এসেছে, তারা তাদের মতো করে চেষ্টা করেছে, অর্থ বরাদ্দ করেছে। কিন্তু সে চেষ্টা কার্যকরী হয়নি। অর্থ দূর দূরান্তের গ্রামের গরিব মানুষগুলোর উন্নয়নের কাজে যথাযথ ভাবে পৌঁছয়নি। আর এটাও অস্বীকার করা যায় না যে কাশ্মীর সমস্যা চলতে থাকলে স্থানীয় কিছু মানুষের আর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের কয়েকজনের বেঘোরে প্রাণ গেলেও, কোনো কোনো সংস্থার কিছু লোকের যে সুবিধে হয়নি তা বলা যাবে না। উপত্যকার গরিব তরুণদের ভারতের মূল স্রোতে সামিল করার কোনও ব্যবস্থাই সম্পূর্ণ কার্যকরী করা যায়নি। উপত্যকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের দারিদ্র মোচন করা, সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ, চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যে সম্ভব হয়নি তা বাস্তবে দৃশ্যমান।
পহেলগামের যেখানে সর্বশেষ জঙ্গী হানা হয়েছে সেখানেও কোনো কলেজ নেই। কলেজ জেলা সদর অনন্তনাগে। যে পহেলগাম বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে উল্লেখযোগ্য স্থান করে নিয়েছে, পর্যটন থেকে যেখানে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হয়, সেখানে তরুণদের জীবনধারণের জন্য নির্ভর করতে হয় গাড়ি চালানো, ঘোড়ার সহিসের কাজ করা আর পরিবারের বড়োরা হয়ত চালান স্লেজ গাড়ি -- যাতে ব্যাপক শারীরিক পরিশ্রমের দরকার হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদের দারিদ্রের মধ্যে কেটে যাচ্ছে।
গোয়েন্দাদের আগাম খবর সংগ্রহের অভাব, উপত্যকায় নাকাবন্দি এবং জঙ্গীহানা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে তৎপরতার সঙ্গে তার প্রত্যাঘাত করার ব্যবস্থা অর্থাৎ সর্বত্র নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি এইসবের অভাব নিয়ে আলোচনা করাই যেতে পারে। তবে এটা তার সঠিক সময় নয়। ভারতের পক্ষে যে চুপচাপ বসে এই আঘাত হজম করা সম্ভব নয় সেটা জানাই ছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এল অপারেশন সিঁদুর।
সেনা অভিযানের নামের নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা ইতিমধ্যেই আলোচিত হয়েছে। যেভাবে স্ত্রীদের সামনে বিশেষ ধর্মের স্বামীদের হত্যা করা হয়েছে তাতে বিবাহের সোহাগ সিঁদুর মুছে ফেলার বিষয়টা এসে যায় এবং তার প্রত্যাঘাতের নামকরণ নি:সন্দেহে সমগ্র নারীজাতির স্বাভিমানকে ছুঁতে পেরেছে। এর আগে জঙ্গীরা স্থানীয় মানুষ, নিরাপত্তা কর্মীদের ওপর আঘাত হানলেও কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর আঘাত এবং বেছে বেছে একটা ধর্মের মানুষের ওপর আঘাত এরকম সার্বিকভাবে সম্ভবত আগে করেনি। সেই দিক থেকে এই জঙ্গী হানার ফল সুদূরপ্রসারী।
এর নামকরণ এবং সাংবাদিক সম্মেলনে প্রত্যাঘাতের বিবরণ দেওয়ার জন্য সেনা বাহিনী ও বিমান বাহিনীর দুই মহিলা আধিকারিককে নির্বাচিত করা এই সবই খুব সুচিন্তিত। মহিলা আধিকারিক বাছা হয়েছে বিশেষ দুটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে। পদমর্যাদায় তাঁরা বিদেশ সচিবের সঙ্গে একাসনে বসার মত কিনা বা একজনের কর্মক্ষেত্র সিগনাল এবং অন্যজন হেলিকপ্টার পাইলট হলেও তাঁদের বেছে নেওয়াও একটা বার্তা দেবার জন্য। যদিও এই সব কাজে সাধারণত ডিজিএমও বা ডিরেক্টর জেনারেল অফ মিলিটারি অপারেশন্স বা এয়ার হেডকোয়ার্টারস-এর আধিকারিকরা বা সেনার জনসংযোগের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকরা থাকেন। তবে দুই আধিকারিকই অত্যন্ত দক্ষ এবং এঁদের উপস্থিতি নি:সন্দেহে সমগ্র বিষয়টিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। যদিও বিদেশ সচিবসহ সেনা ও বায়ুসেনা আধিকারিকরা সকলেই লিখিত বক্তব্য পাঠ করেছেন।
ধ্বংস হয়েছে পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরে অবস্থিত জঙ্গী ঘাঁটিগুলো। এগুলো ধ্বংস করার যুদ্ধ প্রযুক্তির ব্যবহারে নিঃসন্দেহে ভারতীয় সেনা ও বায়ুসেনা এক অত্যন্ত উচ্চমানের সামরিক অভিযানের পরিচয় দিয়েছে। কারগিলে বিপক্ষের বাংকার দখলে ভারতীয় সেনাদের যে উপস্থিতি দেখা গেছিল, এক্ষেত্রে যুদ্ধপ্রযুক্তি অনেক উন্নত -- দূর থেকে মাপা এবং নির্ভুল অঙ্কের প্রয়োগ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মূল লক্ষ ছিল জঙ্গী ঘাঁটি। তাতে অনেক চিহ্নিত এবং কুখ্যাত জঙ্গীর নিধন হয়েছে। তবে তাদের শেষযাত্রায় আবার পাকিস্তানের সেনা ও অন্যান্য নেতা আধিকারিকের উপস্থিতি প্রমাণ করে সন্ত্রাসবাদের আসল মদতদাতা পাকিস্তান।
ভারতের প্রত্যাঘাত দ্বিতীয় দিনে পাকিস্তানের জঙ্গী ঘাঁটি ছেড়ে কয়েকটি সেনা ঘাঁটিও স্পর্শ করেছে। আবার পাকিস্তানের আক্রমণে ভারতের সীমান্ত এলাকায় শেল হানায় ভারতীয় সেনা ও সাধারণ নিরীহ ভারতীয় নাগরিকদের মৃত্যু হয়েছে। তার মধ্যে আছেন শিশু ও মহিলাও। তবে পাকিস্তানের আক্রমণ প্রতিহত করে দিতে পারার ক্ষেত্রে ভারত যুদ্ধ প্রযুক্তির দিক থেকে ব্যাপক অগ্রগতির পরিচয় দিয়েছে। পাকিস্তান থেকে ভারতের মাটি লক্ষ করে আসা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কার্যকরী হবার আগেই ভারতীয় সেনা তা চিহ্নিত করে ধ্বংস করে দিয়েছে। যুদ্ধের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এটা বিরাট সাফল্য।
ভারত পাকিস্তান সংঘাতের দিকে সারা পৃথিবী তাকিয়ে আছে। তবে এক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো। ভারতীয় উপমহাদেশে ভারত সাগর এলাকায় চীনের একটা আগ্রাসী মনোভাব রয়েছে। পাকিস্তান ভূখণ্ডের ওপরও রয়েছে চীনের নজর।
ভারতের কাছে আরেকটা চিন্তার বিষয় বাংলাদেশ। বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক খুব ভালো। দুদেশের সেনাবাহিনীর মধ্যেও যোগ রয়েছে। আর সন্ত্রাসবাদীদের তো যোগাযোগ থাকেই। ফলে পাকিস্তান যাতে বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশকারী ঢুকিয়ে তাদের দিয়ে পূর্বাঞ্চলে অস্থিরতার সৃষ্টি করতে না পারে সেদিকেও সেনা, আধা সেনা এবং পুলিসের বিশেষ ভাবে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এই অঞ্চল যে বিভিন্ন ধরনের সন্দেহজনক লোকের আনাগোনার পথ তা তো সবারই জানা। বিশেষ করে খাগরাগড়ের বিস্ফোরণের পর সেটা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গেছে।
যুদ্ধ নিঃসন্দেহে অনভিপ্রেত। তবে দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তের ওপার থেকে সন্ত্রাস চালানো আর কতদিন বরদাস্ত করা যেতে পারে ? পহেলগামের পর একটা বড়ো ধরনের জবাব দেওয়ারও প্রয়োজন দেখা দেয়। কিন্তু কাশ্মীরের মানুষের দীর্ঘমেয়াদী কল্যাণ, সন্ত্রাসমুক্ত কাশ্মীর কীভাবে গড়ে তোলা যায় সেটাই বড়ো প্রশ্ন। তবে দেশ ও জাতির এই বিশেষ সময়ে সব রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষ সরকার তথা সেনার সঙ্গে আছেন এটাই ভারতীয় গণতন্ত্রের ঐতিহ্য।