
প্রায়শ্চিত্ত শব্দের অর্থ পুনরায় চিত্তে গমন।
বন্ধু যখন টেলিফোন করে জিগ্যেস করলেন, কী করছিস ? উত্তর দিলাম - প্রায়শ্চিত্ত।
বন্ধুর সাময়িক দূরভাষিক মৌনতায় বুঝলাম , শব্দটা ধরতে পারলেও, সে আমার প্রয়োগের কারণ ও উদ্দেশ্য কোনোটাই ধরতে পারেনি। না-পেরে হাতড়াচ্ছে। সুতরাং এবার আমাকে তার বোধগম্য হওয়ার মতো কিছু ধরতাই দিতে হবে। আমি যে কেন পুনরায় চিত্তে গমন করতে চাই , তার কিঞ্চিৎ ব্যাখ্যা দেওয়ার দরকার। আমি জানি সেই ব্যাখ্যার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসবে এক প্রবাসি মননের বঙ্গ নববর্ষের ছবি, চালচিত্র, পটভূমি আর আবহ।
ভেবে দেখলাম সামার আর গ্রীষ্মাবকাশ , এই দুই ... না না, একই ঋতুর দুই মহাদেশীয় অনুভবের তফাৎ বোঝাতে দুটি অব্যর্থ শব্দ ব্যবহারই যথেষ্ট। উষ্ণ এবং গরম। উষ্ণ-শব্দের মিঠে পেলবতা আর আর গরম-শব্দের ছ্যাঁকা দেওয়া রুক্ষতা , এই দুই অনুভূতি দিয়ে আমি আমার প্রবাসী ও স্বদেশী দুই নববর্ষের স্মরণ করতে পারি। অবশ্যই বাঙালির নববর্ষ, যার আসন্ন সূচনার তোড়জোড় শুরু হয়েছে তাবৎ বঙ্গজনের মধ্যে। আর আমি করছি প্রায়শ্চিত্ত।
এক ভোরের বর্ণনা লিখেছিলাম শ্রীমা-র জীবনধর্মী উপন্যাসের প্রথম খণ্ডে। সে ছিল এক গ্রীষ্মকালের ভোর। আর সেই দিন ছিল মাত্র ছ-বছর বয়সে মা সারদামণির সঙ্গে ঠাকুরের অলৌকিক বিবাহের দিন।... ভোরের আলো ফুটতে তখনও একটু দেরি আছে । আবছা আঁধারে মায়াময় হয়ে আছে চরাচর। নিবিড় স্তব্ধতায় দিনের লক্ষণ স্পষ্ট হয়নি। আকাশের ধূসরতা থেকে নক্ষত্রেরা অপসৃত হবে আর একটু পরে। শুকতারা এখনও জ্বলজ্বল করছে। দুদিন আগে চৈত্রসংক্রান্তি অতিক্রম করে গ্রামবাংলায় বৈশাখী নববর্ষ এসেছে। আসন্ন ভোরের পাতলা অন্ধকারে মানুষজন এখনও নিদ্রামগ্ন। এই সময়ে ভোরের হাওয়া আসে। পুব-দক্ষিণের স্নিগ্ধ হাওয়ায় এখন হিমেল স্পর্শ মিশে থাকে। স্বস্তিতে তন্দ্রাচ্ছন্ন মানুষ নিবিড় নীরবতায় রাত্রির শেষ প্রহর উপভোগ করে। সারদার মা শ্যামাসুন্দরী দেবী, তাঁর পাশে শোওয়া ছ-বছরের বালিকা কন্যাটির গায়ে হাত রাখেন। বড় কল্যাণময়ী তাঁর মেয়েটি, ভালোবাসা করুণা আর লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ সারদার । ভোরের অদৃশ্য দেবলোক আর খড়ি ফোটা পুব আকাশের দিকে তাকিয়ে শ্যামাসুন্দরী প্রার্থনা করেন, আমার মেয়েকে দেখো ঠাকুর ... এই ভোরের হাওয়া আর শান্ত প্রকৃতির মধ্যে ওকে বাঁচিয়ে রেখো ... কষ্ট দিও না আমার মেয়েকে...।
কোথায় যেন চলে গিয়েছিলাম । সম্বিৎ ফিরে পেলাম একটা ঝুপ শব্দে। তারপর চুপচাপ শান্ত পাড়ার রাস্তা দিয়ে ঠক ঠক শব্দে হেঁটে যেতে দেখলাম এক বৃদ্ধা মেম সাহেবকে। দাঁড়িয়েছিলাম আমার বাড়ির দোতলায়, আমার নিজস্ব একাকীত্ব উপভোগ করার স্টাডিতে। বৃদ্ধা আমার পরিচিত। অশান্ত বসন্ত অতিক্রম করে সামার আসার প্রস্তুতি পর্বে স্নিগ্ধ সকালে বেরিয়ে পড়েছেন মর্নিং ওয়াকে। হাত নেড়ে আমাকে বললেন, নাইস মর্নিং।
বটেই তো ! শুধু নাইস বললে কিছু বলা হয় না। এও আমার আসন্ন নববর্ষই তো ! হাত নাড়লাম আমিও।
এপ্রিলের গোড়ার দিক। মাত্র কদিন আগেই সময়কে এক ঘন্টা এগিয়ে দিয়ে, দিন বড় হয়েছে। এখন সাড়ে আটটায় সন্ধে হয়। সাড়ে চারটেয় ভোর। এরপরে তিনটেয় ভোর হবে, রাত দশটায় সন্ধে। সামারে শুধু দিনের আলোর দেশ। ঘুমের জন্য ভারী পর্দা টেনে আলো ঠেকাতে হয়।
মার্চের গোড়ায় দেশ থেকে ফেরার আগেই নববর্ষ তথা পয়লা বৈশাখ উদযাপনের কথা শুনেছিলাম আমার আরেক দেশ বিলেতে। ঋতু-প্রকৃতি অনুযায়ী বসন্ত উদযাপন বললে ঠিক হত। কিন্তু আমরা তো তা বলব না ! কেননা আমরা সব ছেড়ে এলেও স্মরণীয় অভ্যাস সঙ্গে নিয়ে আসি। অভ্যাস কি মানুষকে আইডেন্টিটি দেয় ? কে জানে ! কিন্তু ওসব কিছু না-ভেবেই প্রবাসী বঙ্গজন নববর্ষ পালনে উদ্যোগী হবেনই। ... এসো হে বৈশাখ ... যাক পুরাতন স্মৃতি...। জিগ্যেস করুন , এটা বাংলা কত সাল ? জানে না।
হায় রে, বৈশাখ আসে না, কোনোদিন আসবে না। আর পুরাতন স্মৃতিও কোনোদিন যাবে না। তাই সোনার পাথর বাটির মতো বাঙালির নববর্ষ উদযাপন হয় প্রবাসে ... অন্তত বিলেতে তো বটেই। কী হয় ?
বিগত যৌবন ও যৌবনা কিছু পুরুষ এবং নারী একঘেয়েমির ফাটা রেকর্ড বাজিয়ে-বাজিয়ে বর্ষবরণ এবং বন্দনা করেন। কিশোর-কিশোরী বেলায় দেশে শেখা গুটিকয়েক সেই রবীন্দ্র গান বা কবিতা বা ধেই ধেই নাচ। আর ইদানিং আধুনিকতার সাম্যবাদ রচনার জন্য , এদেশের কয়েকটি অনিচ্ছুক বালক-বালিকা বা ছেলেমেয়েকে ধরে নিয়ে এসে, বঙ্গসংস্কৃতির ট্রেনিং দিয়ে স্টেজে তুলে রঙ্গ প্রদর্শন। তারা কিছুই জানে না, বোঝে না - কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে ! কিম্ভূত সেজে, লম্ফঝম্প করে মঞ্চে। ছবি ওঠে।
না না, সর্বত্র সব ব্যাপারটা যে এমন অন্ধের হস্তি দর্শনের মতো হয় তা নয়। তবে অধিকাংশই... সন্দেহ নেই।
নববর্ষ হচ্ছে দেশেও। বেশ কয়েক রকমের পয়লা বৈশাখ উদযাপিত হয়। সোনার দোকান , কাপড়ের দোকান ছাড়াও বাজার দোকানের নানাবিধ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কথা ছেড়ে দিলাম। আমি বই পাড়ার কথা বলছি । সাহিত্য ব্যবসায়ের নববর্ষ।
রৌদ্রদগ্ধ বেলায় ঘামতে-ঘামতে, হাঁপাতে-হাঁপাতে লেখককুল সন্দেশ গিলছে ডাবের জল দিয়ে। কোথাও ঠান্ডা মিষ্টিজল। এক প্রকাশক সেরে আরেকজনের দোরে। সাইড ব্যাগে প্যাকেট ভরছে। মিষ্টি নিয়ে যাবে বাড়িতে। বাংলা ক্যালেন্ডার। তার মধ্যে রেষারেষি, খাতিরের তারতম্য। কে কোন দোকানে ( দোকানই তো !) ঢুকবে, না-ঢুকবে তাই নিয়ে হিসেব। দর দরিয়ে ঘামছে লেখক , সাহিত্যিক। এসি থাকলেই বা কী ! না, বেশিক্ষণ বসে থাকবেন না। জায়গা খালি করুন দাদা ...।
মরতে যান কেন ! ১৪ বছর আগে একবার গিয়ে মনে হয়েছিল ' নববর্ষের সেই অতীতের দিন গিয়াছে। আপনি টিকিয়া আছেন, সশরীরে --- এই বার্তা দিয়া সৌজন্য প্রদর্শন ও মিষ্টিমুখ অথবা প্যাকেট ব্যাগস্থ করা বন্ধ করিয়া দিন।'
নববর্ষের ভোর রাতে উঠে বুক ভরে একটা শ্বাস নিন। অতঃপর প্রায়শ্চিত্তের মতো স্বকর্মে নিযুক্ত হোন। কর্মের নামই পূজা। উদযাপন।