
নানা মুনির নানামত। আর তা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন শান্তিতে নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শ্যাম রাখি না কূল রাখি অবস্থায় ইস্তফার নাটক-ও আজ অতীত। তাই এপ্রিলের প্রথমার্ধে নির্বাচনের ইঙ্গিত। তবে তিনি আদৌ নির্বাচন চান কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে তাঁর ওপর চাপ বাড়ছে। বিএনপির কো-চেয়ারপার্সন তারেক রহমান ও তাঁর দলের নেতারা ডিসেম্বরেই ভোটের দাবিতে অটল। বাংলাদেশে ১২ দলীয় জোটের নেতারা বলেছেন, ‘এপ্রিল ফুল’-এর শিকার হতে তাঁরা রাজি নন। জামায়াত ও এনসিপির অবশ্য এপ্রিল নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নেই। রাজনৈতিক দলের দাবি ও পাল্টা দাবির পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীও নির্বাচন নিয়ে টালবাহানায় যে বিরক্ত সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সামরিক ও অসামরিক চাপে দিশেহারা ইউনূসের গদি টলমল। ফলে ফের অস্থিরতার কালো মেঘ পদ্মাপারে।
বিএনপি প্রকাশ্যেই চাপ বাড়াচ্ছে। দলের নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, ‘আপনার (ড. ইউনূস) চালাকি সবাই বুঝে গেছে, শুধু আপনি বোঝেন না। অনুরোধ করছি, নন্দিত হয়ে বিদায় নিন, নিন্দিত হয়ে নয়। জনগণের অধিকার তাদের ফিরিয়ে দিন।’ অথচ এত কিছুর পরেও ইউনুস কিন্তু নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে কুর্সি ছাড়তে নারাজ। তাই ‘ইস্তফার নাটক’, বলছেন বিএনপির নেতারাও। তবে জামায়াতে ব্যস্ত ঘোলাজলে মাছ ধরতে। তাই নির্বাচন নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই।
মূল লড়াই এখন বিএনপি বনাম এনসিপি (জাতীয় নাগরিক পার্টি)-র। ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এনসিপি মনে করে, জনগণ শুধু তাঁদেরই দলে। তাই বিএনপির তো বটেই, সেনা বাহিনীর বিরুদ্ধেও কথা বলতে পিছপা হন না এনসিপির নেতারা। ক্ষমতার দড়ি টানাটানিতে এনসিপিরও বিরোধ তুঙ্গে। আবার গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল --- এনসিপি সম্পর্কে এমনই ধারণা বিএনপির। ফলে অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তায় দুলছে ড. ইউনূসের গদি।
রোহিঙ্গাদের ‘মানবিক করিডর’ দেওয়া নিয়েও বিরোধ তুঙ্গে। সেনাপ্রধান জানিয়ে দিয়েছেন,‘সিদ্ধান্ত একটি নির্বাচিত সরকার থেকেই আসতে হবে এবং তা বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই হতে হবে’। কিন্তু সেনাপ্রধানের এক্তিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তুলছে এনসিপি। চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে চালু ও লাভজনক টার্মিনালকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে লিজ দেওয়া নিয়েও চলছে হট্টগোল। হট্টগোলের মধ্যে বিএনপি নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেনের দাবি, উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ও মাহফুজ আলমের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে হঠাতে হবে। পাল্টা আবার এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারির দাবি, আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদকে বাদ দিতে হবে। ফলে চাপে ড. ইউনূস।
সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়ে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বিএনপির সুরে সুর মিলিয়ে বলেছেন, ‘আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত।’ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। এই সময়সীমার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’ কিন্তু এনসিপি সেটা মানতে নারাজ। তাঁদের বায়নার শেষ নেই। ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনের আচরণকে ‘পক্ষপাতমূলক’ বলে কটাক্ষ করে ইসি ভেঙে দেওয়ার দাবি তুলেছেন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব নিজাম উদ্দিন।
জাতীয় ঐক্যের কথা বলা হলেও ড. ইউনূসের আমলে ঐক্যের কোনো জায়গা নেই। তাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমাও বলছেন, ‘দেশ কোনো ধরনের রাজনৈতিক ঐক্যের পথে নাই।’ হেফাজতে ইসলাম মাঠে নেমেছে নারী সংস্কার কমিশন বাতিলের দাবিতে। তাঁদের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক অবশ্য বিরোধ মেটানোর কথা বলছেন। তিনি বলেন, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূস অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়েছেন। আমাদের সেনাপ্রধান দেশের স্তম্ভ। আপনারা বক্তিগত মান অভিমানের কারণে মানুষের স্বপ্ন ফিকে হতে দেবেন না।’ আসলে তাঁদের লক্ষ্য এই পুতুল সরকারের আমলে নিজেদের আখের গোছানো। তাই নীরব দর্শক জামায়াত ইসলাম ও অন্যান্য মৌলবাদীরা। জামায়াতে ইসলামির আমির শফিকুর রহমান অবশ্য এপ্রিলে নির্বাচনের পক্ষেই সওয়াল করছেন।
দিন দিন প্রকট হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা। ঢাকায় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, ‘অনিরাপদ পরিবেশ, চাঁদাবাজি, প্রতারণামূলক অনলাইন কার্যক্রম, পণ্য পরিবহনে ঝুঁকি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে ব্যবসা ও বিনিয়োগে আস্থা হারাচ্ছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা।’ নিউ ইয়র্কের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মৌলিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাঁরা আওয়ামি লীগের ওপর ‘সাময়িক’ নিষেধাজ্ঞার কড়া সমালোচনা করেছেন। এই পরিস্থিতিতে বিএনপির হুঁশিয়ারি, ‘ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন না হলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সমর্থন ধরে রাখা ‘কঠিন হবে।’ এই অবস্থায় সেনাবাহিনীর ‘সচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি’, গুজবে কান দেবেন না। কিন্তু সেনাবাহিনীকে নিয়েও গুজব ছড়াচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। বেশিরভাগ নেটিজেনই চাইছেন, ড. ইউনূসের বিদায়। তাই তিনি এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামকে দিয়ে বলিয়েছিলেন, ‘পদত্যাগের বিষয়ে তিনি (ড. ইউনূস) ভাবছেন।’ কিন্তু তিনি নিজে কিছু বলছেন না, পদত্যাগের চিঠি তো দূরঅস্ত! সেই নাটকে যবনিকা আগেই পড়েছে। তাই এখন ইউনূস এপ্রিলের প্রথমার্ধে নির্বাচনের কথা বলে ফের জল বা পানি মাপতে নেমেছেন। অডিও বার্তায় শেখ হাসিনা বলেছেন, নির্বাচন করার লোকই নন ইউনূস। তাঁর অভিযোগ, ‘ইউনূস গত ৮ মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করেছেন। দেশকে বিক্রি করে দিচ্ছেন। ইউনূসের রাজত্বে জঙ্গিদের প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।’ দলীয় কর্মীদের প্রতি হাসিনার আশ্বাস, ‘ইউনূসের মতো জঙ্গি সরকারকে ক্ষমতা থেকে হঠিয়ে বাংলাদেশের মানুষের শান্তি-নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নতি ফিরিয়ে আনব।’