তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
 ব্যবহার কমাতে হবে প্লাস্টিকের 

                 

প্লাস্টিক এমন একটা জিনিস যা ছাড়া মানুষের এখন আর চলে না। আমরা সবাই জানি, জিনিসটা মোটেই পরিবেশবান্ধব নয়, তবুও প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ছে। আমাদের জীবনযাপনের পরতে পরতে জড়িয়ে যাচ্ছে প্লাস্টিক। চাইলেও যেন তাকে ছাড়ার আর কোনো উপায় নেই। একটু হিসেব করলেই দেখা যাবে গত কয়েক দশক ধরে সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে অবাধ ও অপ্রতিরোধ্য গতিতে যা বাড়ছে, তার নাম প্লাস্টিক! এবং এই বৃদ্ধি মানুষ ও পরিবেশ কারও পক্ষেই ভালো নয়। পাঁজিতে লেখা ত্রহ্যস্পর্শ যোগের মতোই প্লাস্টিক বাড়াচ্ছে তিন ধরনের প্ল্যানেটরি ক্রাইসিস। এক, জলবায়ু সংকট,  দুই, প্রকৃতি, জমি এবং জীববৈচিত্র্য সংকট এবং তিন, দূষণ ও বর্জ্য সংকট। একটু লক্ষ্য করলেই দেখবেন, সারা পৃথিবীতেই মানুষ কম-বেশি এই সংকটগুলির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। আমরা দেখছি যতদিন যাচ্ছে ততই এই সংকট  আরও বাড়ছে।

এই পটভূমিতেই এবার এসে গেছে আরেকটা পরিবেশ দিবস। ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এবারের পরিবেশ দিবসের শ্লোগান ‘বিট প্লাস্টিক পলিউশন’  অর্থাৎ প্লাস্টিক দূষণের অবসান ঘটাও। সত্যি এই দূষণের অবসান ঘটানো ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই। প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ দেখে চোখ কপালে উঠেছে বিশেষজ্ঞদের। হিসেব করে দেখা যাচ্ছে বছরে প্রায় ১১ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য অ্যাকোয়াটিক ইকো সিস্টেম বা জলজ বাস্তুতন্ত্রে মিশছে। এখানেই শেষ নয়, কৃষি সামগ্রীতেও মিশছে মাইক্রো প্লাস্টিক। মাটি, নর্দমা, জমা জল সবেতেই  প্লাস্টিক বর্জ্যের দাপট। জনস্বাস্থ্যের পক্ষে এটা একটা সাংঘাতিক বিপজ্জনক ব্যাপার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিঙ্গল-ইউজ-প্লাস্টিক (এসইউপি) বা একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক এখন দেশের পরিবেশের সামনে সবচেয়ে বড়ো বিপদ। খোদ প্রধানমন্ত্রীকে এর বিরুদ্ধে লালকেল্লা থেকে লড়াইয়ের ডাক দিতে হচ্ছে। নানা সতর্কতা ও নিষেধাজ্ঞা সত্বেও এই গোত্রের প্লাস্টিকের ব্যবহার কিছুতেই কমছে না। নানা ধরনের নেশার জিনিসের পাউচ কিংবা দোকান বাজার থেকে যাতে বোঝাই করে আমরা নানা জিনিস নিয়ে আসি সেই ফিনফিনে পাতলা প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবেশের পক্ষে সবচেয়ে বড়ো বিপদ। শুধু ক্যারিব্যাগই নয়, বোতল, জলের গেলাস, খাওয়ার প্লেট ইত্যাদি নানা অবতারে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক আমাদের সামনে এসে হাজির হয়। প্রয়োজন মিটলেই আমরা তা অবহেলায় ফেলে দিই। সামান্য প্লাস্টিক এরপরে হয়ে ওঠে ভয়ঙ্কর। হাওয়া ও জলের ডানায় ভর দিয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে যত্রতত্র, হয়ে ওঠে পরিবেশ দূষণের বড়ো কারণ। তুচ্ছ এই প্লাস্টিক সামগ্রীটিকে বাগে আনতে বাদ সাধছে আমাদের বদভ্যাস, আমাদের সচেতনতার অভাব।    

দূষণের ব্যাপকতা ক্রমেই আয়ত্বের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিশ্বে প্লাস্টিক দূষণের সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ দাঁড়িয়েছে বছরে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন থেকে ২.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি থেকে বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা, শিল্পগুলির ওপর আর্থিক প্রভাব, স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় ইত্যাদি ধরেই এই হিসেব কষা হয়েছে। চমকে যাওয়ার মতো হিসেব। কিন্তু সমস্যার ব্যাপকতা এতই যে এই হিসেবকে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছি আমরা। তবে এই ধাক্কায় মানুষের খুব একটা হুঁশ ফিরছে বলে মনে হয় না। আবার এমনটাও হতে পারে মানুষের প্লাস্টিক অভ্যস্ততাই আসলে এই সংকটের জন্ম দিয়েছে। চালু অভ্যাসের খোলনলচে না বদলালে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে না।

পরিবেশের এই সংকট থেকে বেরোতে বিশেষজ্ঞরা দিচ্ছেন  রিফিউজ, রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেল এবং রিথিঙ্ক-এর মন্ত্র। অর্থাৎ পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে আনার কথা বলছেন তারা। একটা বড়ো প্রাপ্তির দিক হল, সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণ রোধে একটা  আন্তর্জাতিক চুক্তির দিকে এগোচ্ছে বিশ্বের দেশগুলি।

প্লাস্টিক ব্যাপারটা হালকা, কিন্তু আমাদের জীবনে তার ছায়া এখন অনেক বিস্তৃত ও গভীর। এই সত্যকে মেনে নিতে হবে। রাতারাতি প্লাস্টিক হঠাও শ্লোগান তুললে চলবে না। এগোতে হবে ধীরে ধীরে, মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন না করে। তাহলেই প্লাস্টিক দূষণ রুখতে সবার গ্রহণযোগ্য একটা সমাধানে পৌঁছোতে পারব আমরা।


Scroll to Top