
ফেলুদার মতো প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর নয়। প্রদোষ মিটারের মতো প্রখর ব্যক্তিত্বও তার নেই। বরং আছে পাশের বাড়ির শিক্ষিত ভালো ছেলের ইমেজ। আর তোপসে নামটা নেহাতই বাবা-মায়ের ফেলুদা প্রীতির নিদর্শন। এই সম্বল করে কিন্তু দিব্যি একটা আন্তর্জাতিক স্তরের পারিবারিক রহস্যের সমাধান করে ফেললেন আবীর, যাঁর পর্দার নাম তোপসে। ঢাকা থেকে শিকড়ের সন্ধানে কলকাতায় আসা সাবাকে (বাংলাদেশের প্রতিবাদী অভিনেত্রী কাজী নওশাবা আহমদ) সাহায্য করতে গিয়ে যে জটিল ধাঁধার সমাধান করলেন তোপসে, তার স্টাইল একদম ফেলুদা ঘরানার। রহস্য গল্প আর তা নিয়ে ছবি পরিচালনা, দুটো তুরূপের তাস নিজের হাতে রাখার স্টাইলেও ফেলুদার স্রষ্টাকে অনুসরণ করেছেন অনীক দত্ত। তাঁর সে এলেম আছে বলেই করেছেন। এমনকী ধাঁধাটাও নিজেই তৈরি করেছেন বলে জানা গেল। ফ্রেন্ডস কমিউনিকেশন প্রযোজিত 'যত কাণ্ড কলকাতাতেই' ছবির টাইটেল কার্ডে লেখাও আছে, অনীক

প্রথাগত গোয়েন্দা যখন দেখা যায়নি সিনেমায়, তখন তাকে গোয়েন্দা গল্প না বলে রহস্য গল্প বলাই ভালো। এধরনের ছবির আলোচনায় কাহিনি বলে দিলে দেখার মজা মাটি। তাই অন্য দিকগুলো নিয়ে কথা বলাই ভালো। যেমন, পুরনো কলকাতা, কার্শিয়ং, দার্জিলিং তার সবটুকু ঘ্রাণ নিয়ে ধরা দিয়েছে। বিলেত ফেরত তরুণ ব্যারিস্টারের পার্ক স্ট্রিটে সাহেব পাড়ায় ফূর্তি করতে যাওয়ার ঠিকানা ট্রিংকাস থেকে পাহাড়ের পাকদণ্ডি পথ বেয়ে গাছপালার আড়ালে সস্ত্রীক আত্মগোপনের ডেরা পর্যন্ত সবটাই তার সময়কালের নিরিখে বিশ্বস্ত। কলকাতার অফিস পাড়ায় সেন্ট জনস চার্চ সংলগ্ন সমাধিক্ষেত্রে তোপসে-সাবার অভিযান মনে পড়িয়ে দেয় সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা কাহিনি 'গোরস্থানে সাবধান'-কে।
এছবিতে প্রতারণা আছে, খুন আছে, হিংসা আছে, দুষ্টু লোক আছে, আবার বুরুনের মতো বিশেষভাবে সক্ষম সরল বাচ্চা, তার মমতায় আর্দ্র মা, জেসিকার মতো সুন্দরী অ্যাংলো গায়িকা, ফেলুদার সিধুজ্যাঠার মতো এক মুশকিল আসান চরিত্রও আছে। বনেদী রায়চৌধুরী পরিবারের পড়তি অবস্থার ফাঁক গলে ঢুকে আসা সাপ সম্পত্তি দখলের লোভে ছোবল মারলেও তাকে কী অনাবিল উপেক্ষায় যেভাবে ক্ষমা করে দেন সাবা আর তাঁর মা, যাঁরা আসলে এই পরিবারেরই সদস্য, আমার মতে, সেটা এই ছবির আসল ট্যুইস্ট।
সহজ অথচ বুদ্ধিদীপ্ত এই পুজো রিলিজ নিয়ে আলোচনার ফাঁকে অনীক দত্ত নিজেই উস্কে দিয়েছেন একটা প্রশ্ন। বাংলা ছবিকে অন্যরকম আলো দেখানো এই পরিচালক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি নাকি অসুস্থতার কারণে পরিচালনা থেকে সরে যাচ্ছেন। আমরা যারা তাঁর গুণমুগ্ধ দর্শক, আমরা বলব, শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে আপনি মাথা ঘামাবেন না। যতদিন মগজাস্ত্র অটুট আছে, মাভৈ। 'হৃদয়ে কি জং ধরে পুরনো খাপে?'