
এই লেখক আর পৌনে তিন মাস পরে নব্বুইয়ে পা দেবে। নিজের যৌবন সে বহু বহু দিন পার হয়ে এসেছে, সেদিকে যখন তাকায় তখন কুয়াশায় আচ্ছন্ন এক নদীর ওপারে একটি সবুজ দিগন্তের মতো কিছু একটা দেখতে পায়। হয়তো কথাটা একটু অতিকথন হল, কারণ কোনও মানুষই হয়তো, যত স্থবিরই হোক, যৌবনের কথা সম্পূর্ণ ভুলে যেতে পারে না। আসলে মানুষ সারা জীবনে যে সময়ের কথা সবচেয়ে বেশি করে মনে রাখে সে হল মানুষের যৌবন। তাই সম্পাদিকা যখন আদেশ দিলেন যে দেশের ‘যুব দিবস’ উপলক্ষ্য আমাদের তরুণ বন্ধুদের জন্য কিছু লিখুন, তখন ভাবলাম দেখি না, আমার বয়সের দূরত্ব পেরিয়ে ফেলে আসা দিনগুলি থেকে কোনও কথা তুলে আনতে পারি কি না, যা আমাদের তরুণ বন্ধুরা শুনবেন। এটুকু লিখেই একটু ভয় হল,--জানি না, তরুণ বন্ধুরা শুনেছি আজকাল পড়া থেকে মন সরিয়ে নিচ্ছেন, তাঁরা আমার লেখা পড়বেন তো ? তার পর ভাবলাম, খবরটা মনে হয় আংশিক। তাঁরা কম্পিউটার মোবাইল ইত্যাদি নিয়ে বসে থাকলেও এ দুটো যন্ত্রে তো পড়বারও সুযোগ আছে। শুধু ছবি বা রিল দেখে আর চ্যাট করে কি তাঁরা সময় কাটান ? আমার তো তা মনে হয় না। আমার প্রতিবেশে কোনও তরুণ বন্ধু নেই, কোন্ তরুণই বা আমার মতো এক থুত্থুরে বুড়োর বন্ধু হবে ? আমার ছাত্রছাত্রীরাই সব নানা চাকরি থেকে রিটায়ার করে বসে আছে ! ও হ্যাঁ, আমার দুই নাতি আছে যথাক্রমে বারো আর বাইশ বছরের, তাদের সঙ্গে আমর একটু কথাবার্তা হয় বটে।
যাঁর জন্মদিনের স্মরণে এদেশে এই যুব দিবস সংগতভাবেই চিহ্নিত হয়েছে, তিনি স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২), তাঁর কথা তোমরা সবাই জান। তিনি ছিলেন যৌবনের তেজ, সাহস, নীতি, সত্য আর মানুষের জন্য শুভবোধ আর শুভকর্মের প্রতিমূর্তি। তাঁর অনেক কথাই মনে রেখে ধ্যান করার মতো, অনুসরণ করার মতোও বটে। একটা কথা তোমাদের নিশ্চয়ই জানা, ‘এসেছিস যখন, একটা দাগ রেখে যা’। উদ্ধৃতিটা ঠিক হোক না হোক, মূল বিষয়টা বুঝতে কোনও অসুবিধে হয় না। পৃথিবীতে মানুষ হয়ে জন্মেছ যখন, এমন কিছু করে যাও যাতে পৃথিবী তোমাকে মনে রাখে।
এখন পৃথিবীটা এমন যে ভালো কিছু করলেও মনে রাখে, খারাপ কিছু করলেও মনে রাখে। বলা বাহুল্য, স্বামীজি কোন্টা করার কথা বলেছিলেন তা তোমাদের বুঝিয়ে বলতে হবে না।
আরও একটা ছেঁদো কথা বলি। মহাপুরুষেরা দু-ভাবে আমাদের সঙ্গে কথা বলেন। এক মুখে বলে বা লিখে। তাঁর মুখে বলা আমরা শুনিনি, কিন্তু তাঁর লেখা প্রায় তাঁর মুখে বলার মতোই। তার সরলতা, স্পষ্টতা, ওজস্বী বজ্রগম্ভীর গর্জন যেন তাঁর লেখার মধ্য দিয়ই আমাদের কানে পৌঁছোয়, সে তোমরা তাঁর রচনাবলি পড়লেই টের পাবে।
আর মহাপুরুষেরা বলেন তাঁদের জীবন আর কর্ম দিয়ে। আমি যা বলছি শুধু নয়, আমি কী করছি সেটা দ্যাখো। এ জন্য মহৎ মানুষেরা অনেক সময় বলেন, ‘আমার জীবনই আমার বাণী’ বা ‘আমার জীবনও আমার বাণী’। এখন স্বামীজির জীবনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর মতো জ্ঞানী আর ইংরেজি-বাংলার বক্তা হওয়া, ঘরসংসার না করে সারা দেশ পায়ে হেঁটে (‘পরিব্রাজক’, এমনকি বিশ্বপথিক) ঘুরে মানুষের উপকার করে বেড়ানো আমাদের সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। বিবেকানন্দ সকলেই হবে, সেটা একটা অভাবিত ব্যাপার। তিনি নিজেও তা চাইতেন না।
তিনি জানতেন আমাদের জন্যও প্রচুর বিকল্প আছে, ওই ‘দাগ রেখে’ যাওয়ার। সেটা আমাদের নিজেদের পরিবার আর সমাজে থেকেই। তার একটা হল শিক্ষা, মানুষের সভ্যতা আমাদের সকলের জন্য যে বড় পথটা খুলে রেখেছে। এই শিক্ষা ইশকুল-কলেজে গিয়ে পরীক্ষায় পাশ করা মাত্র নয়, তা হল মানুষের সভ্যতা এ পর্যন্ত যা কিছু ভেবেছে, জেনেছে, করেছে, তার কোনও একটা ক্ষেত্রে সীমানাটা দেখে নেওয়া, কাজের দক্ষতাটা বুঝে নেওয়া। সে ছেলেই হোক, মেয়েই হোক। যথাসম্ভব ভালো করে, প্রাণপণ পরিশ্রম আর বুদ্ধি দিয়ে। স্বামীজির আর-একটা কথাও তোমাদের জানা আছে, ‘চালাকির দ্বারা কোনও মহৎ কর্ম সাধিত হয় না।’ অর্থাৎ যা শিখবে, যা করবে তা যেন তোমার যথাসাধ্য জিজ্ঞাসা, পরিশ্রম, মনোযোগ আর অধ্যবসায় দিয়ে তুমি জানতে আর শিখতে পার। তাহলেই তুমি মানুষের সমাজে একজন জরুরি সদস্য হয়ে উঠবে। তোমার কাছে সবাই আসবে ওই জ্ঞান বা কাজের জন্য, অন্যের চেয়ে ভালো জান বলে, করতে পার বলে। শিক্ষক হিসেবে, কর্মী হিসেবে, শিল্পী হিসেবে। তার জন্য পৃথিবী তোমাকে একটা জীবিকা দেবে, তোমার এবং তোমার পরিবারকে পোষণ করবে।
কিন্তু তাতেই তোমার জীবন পূর্ণ ও সার্থক হয়ে গেল বলে ভেবো না। মানুষ তোমাকে জরুরি মনে করবে, হয়তো ভয়ভক্তিও করবে। কিন্তু ভালোবাসবে কি /
হ্যাঁ, শুধু শ্রদ্ধাভক্তি বা প্রয়োজন নয়, ভালোবাসাও মানুষের সঙ্গে তোমার আর-একটা বন্ধন হোক। যা মানুষের জন্যে করবে, তুমিও মিষ্টি কথায়, ভালোবাসা দিয়ে করবে, নিছক যান্ত্রিকভাবে নয়, কাজটা করতে হবে বলে নয়। তোমার জ্ঞানকে ভালোবাসবে, মানুষকে ভালোবাসবে। এই মানুষ শুধু তোমার পরিবার নয়, পৃথিবীর সব মানুষকে, বিশেষ করে যারা বঞ্চিত, পিছিয়ে আছে, তোমার সেবা বেশি করে যাদের দরকার, তাদের।
আর শুধু মানুষকে নয় কিন্তু। পৃথিবীতে শুধু মানুষ নেই। আছে অনেক প্রাণী, যারা মানুষের উপর ভরসা করে বেঁচে আছে, গোরুঘোড়াকুকুরবেড়াল আর নানা পশুপাখি, আর মানুষেরও তাদের ছাড়া চলে না। আছে গাছপালানদীজঙ্গলপাহাড় আকাশপৃথিবী। তারা না থাকলেও তুমি বাঁচতে না। সব কিছু তোমার ভালোবাসা পাক।
দাগ কতটা কী রেখে গেলে তা নিয়ে সবসময় ভাববারও দরকার নেই। সব কিছুতে ভালোবাসাটা দিয়ে এগিয়ে যাও।