তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
এই জট সহজে কাটার নয়

ঠিক এগারো বছর আগে। ভারতীয় ফুটবলে যেন পেশাদারি বিপ্লব। একেবারে ধামাকা বলতে যা বোঝায়, তাই। আইপিএলের মতো করে শুরু হয়ে গেল আইএসএল। অর্থাৎ, ইন্ডিয়ান সুপার লিগ। উদ্বোধন হল আমাদের কলকাতাতেই। কী আশ্চর্য!‌ প্রথমবার চ্যাম্পিয়নও কিনা কলকাতা (‌অ্যাটলেটিকে ডি কলকাতা বা এটিকে)।

বাঙালি যেন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। যে বাংলার দলগুলি ২০০৪ এর পর থেকে আর আই লিগে (‌তখন ছিল জাতীয় লিগ)‌ জেতেনি, আইএসএলে তাদের নতুন জয়যাত্রা শুরু। কোনও ম্যাচে আসছেন অমিতাভ বচ্চন, কোনও ম্যাচে ঋত্বিক রোশন। কোনও ম্যাচে শচীন তেন্ডুলকার, তো কোনও ম্যাচে সৌরভ গাঙ্গুলি। ফুটবল, বিনোদন, বাণিজ্য— মিলেমিশে একাকার।

দু’‌বছর যেতে না যেতেই (‌২০১৬)‌ কলকাতা ফের চ্যাম্পিয়ন। ‌২০১৯ এও চ্যাম্পিয়ন। তখনও মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গলের মতো দল আইএসএলের আঙিনাতেই নেই। এই দুই প্রধান এসে গেলে কী হবে!‌ শুরুতে মোহনবাগান, পরে ইস্টবেঙ্গলও এসে গেল। পিছু পিছু গতবছর এল মহমেডানও। শেষ তিনবারের মধ্যে দু’‌বার মোহনবাগান চ্যাম্পিয়নও হল। কিন্তু তারপরই আইএসএল যেন বিশ বাঁও জলে। এই বছর আদৌ আইএসএল হবে কিনা, তা নিয়েও জোর সংশয়।

হঠাৎ কী এমন ঘটল যে দেশের সেরা টুর্নামেন্টের অস্তিত্বই সংকটে পড়ে গেল?‌ ঘটনাটা মোটেই হঠাৎ করে নয়। ভারতীয় ফুটবল যে এমন সংকটে পড়তে চলেছে, এই অশনি সংকেত অনেক আগে থেকেই কেউ কেউ দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু যাঁদের সবার আগে বোঝার কথা, সেই অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (‌এআইএফএফ)‌ বোঝেনি। যারা ফ্র‌্যাঞ্চাইজি লিগের আসল পরিচালক, সেই এফএসডিএলের সঙ্গে নানা প্রশ্নে বিরোধ বাঁধল। প্রশাসনিক দূরদর্শিতা ও সদিচ্ছা থাকলে এই বিরোধ হয়তো মেটানো যেত। দু’‌পক্ষের আলোচনায় সমাধানসূত্র বেরিয়ে আসতে পারত। কিন্তু জল গড়িয়ে গেল আদালতে। একেবারে সর্বোচ্চ আদালতে। ফলে, আইনি জটে আইএসএল যেন আরও অন্ধকারে তলিয়ে গেল।

যাঁরা টাকা ঢালছেন, তাঁরা আরও বেশি কর্তৃত্ব চাইবেন। এটা সারা পৃথিবীর নিয়ম। পরিচালনায় কার কতটুকু ভূমিকা থাকবে, তার নিশ্চয় কোনও নির্দেশিকা থাকবে। দু’‌পক্ষের আলোচনায় এই নির্দেশিকা চূড়ান্ত হওয়ার কথা। একসময় যাঁরা ফেডারেশনের দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা অন্য জগতের লোক হলেও প্রশাসনটা বুঝতেন। কী করে জট ছাড়াতে হয়, সেটুকু বুঝতেন। যাঁরা ফেডারেশনের কাজকর্ম বুঝতেন, তাঁরা হয়ে গেলেন ব্রাত্য। কেন্দ্রীয় সরকার বিভিন্ন ফেডারেশনের মাথায় খেলোয়াড়দের বসাতে চাইছেন। নিঃসন্দেহে ভাল উদ্যোগ। কিন্তু শুধু খেলোয়াড় বসালেই তো হল না। সেই খেলোয়াড় আদৌ এমন প্রশাসন চালানোর উপযুক্ত কিনা, সেটাও দেখা দরকার। যেখানে বাইচুং ভুটিয়ার থেকে কল্যাণ চৌবেকে বেশি যোগ্য মনে করা হয়, যেখানে সৌরভ গাঙ্গুলি থাকা সত্ত্বেও মিঠুন মানহাসকে বোর্ডের দায়িত্ব দেওয়া হয়, সেখানে সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

ফেডারেশন সভাপতি হিসেবে কল্যাণ চৌবে যে কতটা অদূরদর্শী, গত কয়েক বছর ধরে বারেবারেই তার প্রমাণ রেখে গেছেন। সমস্যা মেটানো নয়, বরং সমস্যা বাড়িয়ে তোলাতেই তাঁর যত আগ্রহ। এফএসডিএলের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে, এখনই বিকল্প ব্যবস্থা করা দরকার, এটা তাঁর মাথাতেই ছিল না। না ছিল প্ল্যান ‘‌এ’‌, না ছিল প্ল্যান ‘‌বি’‌। একদিকে আইএসএল–‌কে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্যান্য প্রতিযোগিতাগুলিকে লঘু করে দেওয়া হয়েছে। আই লিগ কবে শুরু হয়, কবে শেষ হয়, লোকে জানতেই পারে না। রোভার্স তো কোনকালে বন্ধ হয়ে গেছে। ডুরান্ড যেন ভবঘুরের মতো। এখন তার ঠিকানা দিল্লি নয়। নানা রাজ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সন্তোষ ট্রফি নম নম করে হচ্ছে। কিন্তু সেই জৌলুস নেই। ইয়ুথ ডেভলপমেন্ট বলেও তেমন কিছু হচ্ছে না। তরুণ প্রতিভা তুলে আনার কোনও তৎপরতাই নেই। এমনকী সিনিয়র দলও যেন দিশেহারা। র‌্যাঙ্কিং পৌঁছে গেছে তলানিতে। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ— যে যখন পারছে, হারিয়ে দিচ্ছে। নেহরু কাপের মতো টুর্নামেন্ট শেষ কবে হয়েছে, লোকে ভুলেই গেছে। নেহরুর নামে যদি এতই আপত্তি, অন্য নামেই না হয় হোক। সেই উদ্যোগও তো চোখে পড়ছে না। যিনি জাতীয় দলের কোচ, তিনিই আবার আইএসএলে ক্লাব দলেরও কোচ। অবসর নিয়ে ফেলা সুনীল ছেত্রিকে ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে।

আসলে, ফেডারেশনের ভাবনা থেকে ফুটবলটাই হারিয়ে গেছে। ফলে, অন্ধকার গাঢ় থেকে আরও গাঢ়তর হয়েছে। আইএসএলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েকশো কোটি টাকার বাজেট। বিভিন্ন ক্লাবের যারা স্পনসর, তারা আইএসএল হবে, এই ভেবেই লগ্নি করেছেন। এখন আইএসএল–‌ই যদি সংকটে পড়ে যায়, তারাও হাত গুটিয়ে নেবে। নিচ্ছেও। ক্লাবগুলি সাহস করে কোনও বিদেশি নিতে পারছে না। অনেক ক্লাবের দলগঠনও কার্যত থমকে। অনেক ক্লাব ফুটবলারদের মাইনে দিতে পারছে না। কোথাও আবার অনুশীলনই বন্ধ। কবে আবার অনুশীলন শুরু হবে, কোচের কাছেও উত্তর নেই, কর্তারাও অন্ধকারে। আইএসএল নিয়ে জট থাকলে তার প্রভাব পড়ছে আই লিগেও। ভারতীয় ফুটবল এতখানি অনিশ্চয়তার মধ্যে কখনও পড়েনি। বেরিয়ে আসার রাস্তা কী?‌ অন্তত এই ফেডারেশন কর্তারা জানেন না। তাই কখনও আইনি লড়াইয়ে এগিয়ে দিচ্ছে ক্লাবগুলিকে, আবার কখনও এগিয়ে দিচ্ছে ফুটবলারদের।

জট পাকাবেন কল্যাণ চৌবেরা। আর জট ছাড়াবেন সুনীল ছেত্রিরা। সত্য সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!‌


Scroll to Top