তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
এবার পঁচিশে বৈশাখ

জীবনে অনেকগুলি পঁচিশে বৈশাখ দেখা হল।  কতকগুলি পঁচিশে বৈশাখ আমার নিশ্চেতনায় এসেছে আর চলে গেছে, তখন তার কোনো অর্থই আমার কাছে ছিল না, বছরের যে-কোনো আর-একটা বিবর্ণ দিনের মতো।  রবীন্দ্রনাথ বলে যে কেউ একজন আছেন পৃথিবীতে তা-ই জানতাম না--কী ওই নামটির সামগ্রিক অর্থ, কেন তাঁর কথা আমি ভাবব, কেন তিনি এক সময়ে আমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবেন, নানা দিক থেকে আমার জীবনকে উপহারে-উপহারে ভরিয়ে দেবেন এবং এমন একটা সময় আসবে যখন তিনি আমার দিনযাপনের অংশ হয়ে উঠবেন--এ সব কোনো সম্ভাবনাই দিগন্তে ছিল না।

ইতিহাসের পাকেচক্রে সেই সময়টা পার হয়ে এলাম, আর অনেক বাঙালির মতো এমন একটা সময়-সংঘট্টে ঢুকে পড়লাম যেখানে রবীন্দ্রনাথ নামে একজন হাজির।  দৈব বলে কিছুতে বিশ্বাস করি না, তাই এখনও ঠিক কোনো তুলনামূলক হিসেব তৈরি হয়নি যে, আমি ঘটনাক্রমে বাংলাভাষার মধ্যে জন্মেছি বলে এমনটা হয়েছে।  কিংবা রবীন্দ্রনাথ নামক একজন বাংলাভাষায় জন্মেছেন বলে আমি এই সমাপতনের সুফল ভোগ করছি।  জীবনের কত কিছুই অপ্রত্যাশিত আর আকস্মিকতায় বাঁধা, দুটোর একটা না হতেও পারত। 

তা হলে আমাদের মোদ্দা লাভ কী হল ?  আমি জানি, সারা পৃথিবীর লোকে এই জন্যে বাঙালিকে ঈর্ষা করে, কখনও ব্যঙ্গও করে--’হ্যাঁ, ওই তোমাদের আছে এক রবিঠাকুর !  তাই নিয়ে তোমরা নাচো।’ কিন্তু এটাও তো ঠিক যে, সারা পৃথিবীর সংস্কৃতিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ঘটনা নেই বললেই হয়।  আমি জানি, পৃথিবী তুলে কথা বলা ঝুঁকির কাজ, কারণ আমি ক-টা সংস্কৃতির খবরই বা রাখি !  কিন্তু এমন সব দিক থেকে একটা সংস্কৃতিকে আচ্ছন্ন করে আছেন এমন স্রষ্টা তো আর দেখতে পাই না।   তাঁর কবিতা আর গদ্যের বিপুল সম্পদের কথা বাদই দিলাম,  আর কেউ কি তেমন আছেন--পৃথিবীর কোনো প্রান্তে--যাঁর গান আমরা উঠতে-বসতে শয়নে স্বপনে, ঘরে ও সভায়, শোকে ও আনন্দে সর্বত্র গাই, শুরুতে, মাঝখানে, শেষে অন্তহীনভাবে ?  তাঁর ছবি নিয়ে সারা পৃথিবী মাতামাতি করে, তাঁর লেখা বহু সংস্কৃতিতে বাড়তি আনন্দ, উজ্জীবন আর সান্ত্বনা যোগ করে তাও জানি।  কিন্তু গানেই তিনি আমাদের সবচেয়ে কাছে আসেন, কাছে থাকেন।  শিশু থেকে বৃদ্ধ তাঁকে বড়ো আপন করে পায় তাঁর এই গানে।  তাই সেদিন দেখলাম, শুধু রবীন্দ্রনাথের গানই হয় উঠল সন্জীদা খাতুনের খেয়াপারের তরণি--কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে স্বীকার না করে, তাঁর মরদেহকে অর্পণ করা হল চিকিৎসাবিদ্যার স্বার্থে।  রবীন্দ্রনাথের গানের ভেলায় ভাসল সেই যাত্রা।

আমি জানি রবীন্দ্রনাথের এই মহামহিম উপস্থিতি, চেনা ধর্ম বা স্বীকৃত ঈশ্বরকে প্রত্যাখ্যান করে, অনেকেরই পছন্দ হয়নি।  ফেসবুকে অজস্র কটু মন্তব্য এসেছে।  মৃতের জান্নাতবাস বা স্বর্গপ্রাপ্তি হবে কি না তাই নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কত মানুষ।  মৃতের প্রতি সম্মান বা শুভেচ্ছার চেয়ে তাতে যেন ধিক্কারই ছিল বেশি।  আমরা জানি যে, সেই ধিক্কার নিয়ে মৃতের বা তাঁর আত্মজনদের কোনো বিশেষ দুর্ভাবনা ছিল না। 

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ, এবার আপনার মুখোমুখি হয়ে আমি বলি, এই যে আপনি আমাদের কারও কারও কাছে প্রচলিত ধর্ম বা ঈশ্বরের বিকল্প হয়ে উঠেছেন, আপনার দীক্ষায় শক্তি পেয়ে আমরা প্রচলিত ধর্ম বা তথাকথিত ভগবানকে প্রত্যাখ্যান করতে পারছি, তার জন্য তো আপনি অনেকের কাছে শত্রুতা ও ঘৃণার লক্ষ্য হয়ে উঠছেন, তা কি আপনি জানেন ?  বাংলাদেশে আপনার বিরুদ্ধে বিপুল বিষোদ্গার চলে, আপনার আর নজরুলের বই লাইব্রেরি থেকে বহিষ্কার করা হয় ধর্মবিরোধী বলে, আবার তারই পাশাপাশি বাংলাদেশের মুক্তবুদ্ধি বন্ধুরা রবীন্দ্রনাথকে আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরেন, ফেসবুকে রবীন্দ্রসংগীতের প্রচার করেন, তাও লক্ষ করি।  জানি না, আপনার ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের জন্য কোনো দুঃসময় আসছে কি না।

ভারতেই কি আপনার জন্য বিপুল সুখ বরাদ্দ ?  এই তো সেদিন ফেসবুকে দেখলাম আপনার ‘জনগণমন’ নাকি সম্রাট পঞ্চম জর্জের স্তবগান বলে এক হিন্দিভাষী বুদ্ধিমান সভায় বক্তৃতা করছে।  মূর্খদের আপনি কতবার শেখাবেন, যদি তারা ‘শিখব না’ এই দুর্দমনীয় পণ করে বসে থাকে ?  তাই উত্তরপ্রদেশের সিবিএসই পাঠক্রম থেকে আপনার ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্প বাদ যাবে, আপনার ‘হিন্দুত্ব’ নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আমি জানি, এই সব ‘তরঙ্গ মিলায়ে যায়, তরঙ্গ উঠে’র মধ্যে আপনি থাকবেন আমাদের চিরসখার মতো, কারণ আমরা অনেকে আপনাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচেছি, বাঁচব।  তাই আরও একবার, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে, পঁচিশে বৈশাখের সূর্যকে নমস্কার করব বলে প্রতীক্ষা করছি।


Scroll to Top