বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
বিক্রি হয় না, বিকৃত করে না
প্রত্যর্পণের প্রশ্ন নেই, ডিসেম্বরে নিজেই দেশে ফিরবেন হাসিনা?
প্রত্যর্পণের প্রশ্ন নেই, ডিসেম্বরে নিজেই দেশে ফিরবেন হাসিনা?
May be an image of one or more people and dais

ডিসেম্বর যত এগিয়ে আসছে, তত কৌতূহল বাড়ছে শেখ হাসিনার পরবর্তী গতিবিধি নিয়ে। ভারত, বাংলাদেশ দুই দেশেই প্রশ্ন, সত্যিই কি ঘোষণা মত বিজয়ের মাসে দেশে ফিরবেন হাসিনা? গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁর এই ঘোষণা বলা বাহুল্য বাংলাদেশ সরকার ভালভাবে নেয়নি। একে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক। শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের অগাস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই ভারতে আছেন এবং তাঁকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ বারবার খারিজ করেছে ভারত সরকার। এর পাঁচ দিন পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদি আর তারপর দিল্লি এসে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে। গত ১২-১৩ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে বিমসটেক সম্মেলনে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাদের কাছে ভারত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঢাকায় প্রত্যর্পণ করা সম্ভব নয়। প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত অনুরোধগুলো ‘এক্সট্রাডিশন অ্যাক্ট, ১৯৬২’ অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং এর কার্যপদ্ধতি এই আইনে সুনির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। কোনও বিদেশি সরকার যখন ভারতে আত্মগোপন করে থাকা কোনও পলাতক অপরাধীকে হস্তান্তরের অনুরোধ জানায়, তখন এই আইনের দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় অধ্যায়ের বিধান অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রথমে কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় কোনও ম্যাজিস্ট্রেটকে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত করার নির্দেশ দেয়। তবে, এই প্রক্রিয়া শুরুর আগেই অনুরোধটি আইনত যথাযথ কি না এবং এতে কোনও প্রাথমিক বাধা রয়েছে কি না, যেমন অনুরোধটি রাজনৈতিক অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হয়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে, তিনি যখন নয়াদিল্লিতে পৌঁছন, তখনও তিনি কর্মরত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ পাননি। তৎকালীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ঢাকার সংবাদপত্রকে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে পারেন না। সুতরাং, ভারত এমন একজন 'প্রধানমন্ত্রী'কে আশ্রয় দিয়েছে যাঁর জীবন ঝুঁকির মুখে ছিল আর সেই মুহূর্তে তিনি ‘প্রত্যর্পণ আইন’ -এর সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘পলাতক’ ব্যক্তি ছিলেন না। তাই, প্রত্যর্পণের অনুরোধটি বিবেচনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি মানদণ্ড পূরণ করে না। লিখেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক গৌতম লাহিড়ী।

এ তো গেল প্রত্যর্পণের কথা। যেখানে শেখ হাসিনা নিজেই দেশে ফিরতে চাইছেন, সেখানে পরিস্থিতি কেমন দাঁড়াতে পারে? বাংলাদেশ মিডিয়া উল্লেখ করেছে, শেখ হাসিনার ঢাকায় ফেরার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। একটি হচ্ছে, তাঁর কাছে বৈধ পাসপোর্ট নেই। বাংলাদেশ সরকার তাঁর পাসপোর্ট আগেই বাতিল করেছে। ফলে পাসপোর্ট ছাড়া তিনি কীভাবে ফিরবেন? আরেকটি বিষয় হচ্ছে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিয়েছে। দেশে ফিরলেই যেখানে গ্রেপ্তার, কারাবাস, এমনকী প্রাণহানির জোরদার আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে জেনেশুনে তিনি আগুনে ঝাঁপ দেবেন?

তবে কূটনৈতিক মহলের মতে, হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে এ দুটি বিষয়ও সরাসরি সেভাবে বাধা নয়। পাসপোর্ট না থাকলে উপায় হচ্ছে, ট্রাভেল ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে সীমান্ত পার হওয়া। 'তিনি তো বাংলাদেশের নাগরিক। নিজ দেশে ফেরত আসতে চাইলে সেটা তাঁর অধিকার। একইসঙ্গে পাসপোর্ট পাওয়াও তাঁর অধিকার,' বলেছেন প্রাক্তন কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীর। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে দেখা গেছে, শেখ হাসিনা একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এবং বিভিন্ন ভার্চুয়াল বক্তব্যে জানিয়েছেন, তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করতে চান। এমনকি তিনি গ্রেপ্তার হওয়া বা প্রাণনাশের ঝুঁকির কথা জেনেই দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

দেশে ফেরার জন্য ডিসেম্বর মাসকে যে বেছে নিয়েছেন মুজিব কন্যা, তার পিছনের কারণ স্পষ্ট। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রমনা ময়দানে ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের জয়ের পতাকা উড়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে। সেই আবেগকে কাজে লাগাতে চাইছেন হাসিনা। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যে ব্যাপক পরিবর্তন দেখেছে বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু ও ভারত- বিরোধী যে হাওয়া উঠেছে সেদেশে, তাতে সেই পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় আছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ছাত্র- যুবদের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব কতখানি, তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহের অবকাশ আছে। এখানেই সামনে আসছে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব সঙ্কটের কথা।

বাংলাদেশে দলটির কর্মকাণ্ড অনেকদিন ধরে নিষিদ্ধ, নির্বাচনেও অংশ নিতে পারেনি তারা। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনার মত অন্য নেতারাও দেশছাড়া। ফলে দল বাঁচানোর জন্যই শেখ হাসিনা ফিরবেন এমন বক্তব্য দলের ভেতরে থাকলেও, বাস্তবে তার ভিত্তি তেমন নেই। তবে ঘোষণা করেও তিনি যদি না ফেরেন, তাহলে সেটা আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা তো দূরের কথা, বরং তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি বলে প্রচার করে উল্লসিত হবে বিএনপি ও জামাত।

এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্যে একটি ঘটনা নজর কেড়েছে। প্রাক্তন এয়ার ফোর্স অফিসার কেএম তাহসিফ সৌরিকে বৃহস্পতিবার ঢাকার একটি নদীতে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। এই তরুণ অফিসার ভিডিও রেকর্ডিং করেছিলেন যেখানে ২০২৪- এর ৫ আগস্ট প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর দেশ ছেড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে।

বাংলাদেশের মিডিয়ার একাংশ প্রশ্ন তুলেছে, ভারত কি বাংলাদেশের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগ হিসেবে শেখ হাসিনা ইস্যুকে ব্যবহার করছে? 'ভারত যদি এটাকে তার দরকষাকষির সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, সেটা আমার ধারণা ইতিবাচকের বদলে নেতিবাচক হওয়ার সম্ভাবনা আছে।' বক্তব্য এম হুমায়ুন কবীরের।

শেখ হাসিনা শেষপর্যন্ত কী করবেন সেটা সময়ই বলে দেবে। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের বড়সড় সাংবাদিক দল, মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা, রাষ্ট্রসঙ্ঘের আধিকারিকদের পাশে পেলে তাঁর দেশে ফেরা হয়তো কিছুটা মসৃণ হতে পারে।



ফলো করুন ফেসবুকে | থাকুন আপডেটেড
Scroll to Top