
শান্তনু বসুর পরিচয় বিবিধ। ‘যুগান্তর’ আর ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’-য় চিত্র সাংবাদিকতায় হাতে খড়ি হয়েছিল কমলকুমার মজুমদারের একদা ছাত্র শান্তনুর । তারপর বিনোদনের কলমে লেখালেখির হাতে খড়ি। সে তাও অনেকদিন হল। ‘যুগান্তর’ ছাড়াও ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’, ‘আনন্দলোক’ সহ অন্যান্য কাগজেও কলাম লিখেছেন। তারপর বোম্বে ফিল্ম ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে পরিচয়, তা সেও নেহাৎ কম দিন হল না। সেসময়ের বাঘা বাঘা চিত্র পরিচালক, নায়ক নায়িকা, চরিত্রাভিনেতাদের সঙ্গে ওঠাবসার সূত্রে চলতে থাকে আলাপচারিতা। মুম্বাইয়ের ফিল্ম ম্যাগাজিন, ট্যাবলয়েড, সংবাদপত্র জগতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সেই সময়ই। সেদিনের ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’, ‘ইভনিং নিউজ’, ‘ফিল্মফেয়ার’, ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’, ‘মিড ডে’-র মতো বাঘা বাঘা কাগজে বেরিয়েছে তাঁর নানা লেখা। সম্প্রতি বানি রুবেন, অশোক কুমার, নাসির উদ্দিন শাহ, সয়ীদ মির্জা, যশ চোপড়া, শাওন কুমার, রাহুল দেব বর্মনদের মতো কয়েকজন নক্ষত্রপ্রতিম ব্যক্তিত্বের সঙ্গে শান্তনুর কিছু সাড়া জাগানো সাক্ষাৎকা্রের বাংলা রূপ নিয়ে ‘কথকতা’ থেকে প্রকাশিত হল তাঁর সংকলন গ্রন্থ ‘ নাক্ষত্রিক সংলাপ’ ।
নক্ষত্র তো অবশ্যই। এবং এহেন নক্ষত্র-সঙ্গ শান্তনুর জীবনে কম দিন তো হল না। ‘১৯৬৫ সালে হায়ার সেকেন্ডারি পাস করার পর আমি ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে শিক্ষার্থী হয়ে ঢুকি। বিকাশ ভট্টাচার্য ছিলেন আমার সেই শিক্ষক, যিনি নিজের হাতে শুধু ছবির পাঠই দেননি, সামগ্রিকভাবে শিল্পের ইতিহাস, এবং তার বিচিত্র নানা দিক নিয়ে অবহিত করেছিলেন। উদ্দীপিত করেছিলেন রস গ্রহণের আকাঙ্ক্ষাকে। এইখানে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছি সুহাস রায়কেও।' বলেছেন শান্তনু। বলেছেন, 'আর্ট কলেজ থেকে পাস করার পর ১৯৭২ সাল নাগাদ আমি মুম্বাই (তৎকালীন বোম্বে) পাড়ি দিই, ছবি আঁকাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে চেয়ে। কিন্তু সে সময়ের বোম্বের পরিচিত শিল্পীরা আমাকে সাহস যোগানো দূর, বার বার নিরস্ত করেছেন। স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের সেই ভয়ংকর দিনগুলোয় আমি ক্রমশ জড়িয়ে যাই ফিল্ম আন্দোলনে।' শান্তনুর বক্তব্য হল, এ বইতে 'চলচ্চিত্রের একটি স্বর্ণযুগ স্তম্ভিত হয়ে আছে।'
অসামান্য এ-বইয়ের পাতায় পাতায় বিধৃত হয়ে আছে সময়, যেখানে খোদ রাহুল দেব বর্মণকে বলতে শোনা যাচ্ছে, ‘শঙ্কর জয়কিষেনের কাছে আমি প্রেরণা পেয়েছি।’ খেদ প্রকাশ করতে শোনা যাচ্ছে, ‘আগের সুরকাররা সুরের থেকেও বেশ প্রাধান্য দিতেন গানের কথায়। শঙ্কর জয়কিষেনই একটা বিরাট রূপান্তর আনলেন গানের জগতে…’ পঞ্চাশ-ষাট-সত্তর, কিয়দংশে আশির মুম্বাই ফিল্মি গানের জগতের সম্পর্কে সামান্য ওয়াকিবহাল জনই টের পাবেন মাত্র কয়েকটি কথার আঁচড়ে ভারতীয় ফিল্মি গানের দুনিয়ার একজন প্রবল ঝোড়ো হাওয়ার মতো প্রতিভা ঠিক কোন বিশেষ দিকটির দিকে ইঙ্গিত করে গেলেন। ঠিক কী বোঝাতে চাইলেন এই বলে যে, ‘যে কোনো বড়ো সুরকারই জাজের ওপর নির্ভর করেন। যদি ধ্রুপদী গানে আমাদের যথেষ্ট জ্ঞান না থাকে তবে ভারতীয় ঘরানার ভালো গান বা সুর আমরা তৈরি করতে পারব না…’, অথবা কোন ইঙ্গিত করলেন এই বলে যে, ‘আমার বাবা খুব ভালো গান যে গাইতেন তা নয়, কিন্তু যখন তিনি লোক-সঙ্গীতে সুর দিতেন মনে হত সেই সুর বেরিয়ে আসছে মনের একদম অন্দর মহল থেকে…’ আসলে একটা মেজাজ, একটা গোটা সময়, কালপর্বকে ভেতর থেকে নির্মাণ করে যে মেজাজ সেই ধ্রুপদী মেজাজটাকে ভেতর থেকে কীভাবে ধরতে হয়, এই বইয়ের পরতে পরতে শান্তনু সেটাকেই পাঠককে ধরিয়ে দিতে চাইছেন। এই বিশেষ জায়গা থেকেই কখন যেন টুক করে এসে যান স্বয়ং দাদামনি অশোক কুমার, যিনি কথা বলতে বলতে তুলে ধরছেন দেখা যায় মুম্বাই ফিল্মের সেই রঙিন, লিজেন্ড হয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলো, যখন হিমাংশু রায় তাঁর ছবিতে ওঁকে অভিনয় করতে বলছেন এবং উনি সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ছুতো দেখিয়ে বলছেন, 'আমার পক্ষে এ কাজ কখনোই করা সম্ভব নয়।’ কেননা ১৯৩৪ সালে কোনো ভদ্রলোক এই পেশায় আসত না। বলছেন, ' আমার যখন ৫২ বছর বয়স তখনো আমি ২৩ বছরের মেয়ের সঙ্গে অভিনয় করেছি হিরোর রোলে।' দাদামনির মতো এসে যান সয়ীদ মিরজাও, যিনি রাগী গলায় বলতে পারেন, ' সারা দেশে আজ ছড়িয়ে পড়েছে বর্বর ও হিংসাত্মক শক্তিগুলি। আমরা যদি দেওয়াল লিখন পড়তে না পারি দোষ আমাদেরই । উট পাখির মত মাথাটা বালিতে গুঁজে আর পেছনটা বের করে কাউকে কি বোকা বানানো যায় ? ইচ্ছে করে ওই পেছনটায় কষে লাথি চালাই।' এই যে এসে যাওয়া, সয়ীদ মির্জার মতোই, এভাবেই এসে রাজ কাপুরের ঘনিষ্ঠ প্রচারবিদ ও বন্ধু বানি রুবেন শান্তনুকে ধরিয়ে দেন , ‘রাজের শেকড় বেরিয়ে এসেছিল পঞ্চাশের স্বর্ণযুগ থেকে। সেই সময়ের গুরু দত্ত, মেহবুব খান, বিমল রায়, কে আসিফ, বি আর চোপরার মতোসেরা ভারতীয় চলচ্চিত্রকারদের সমতুল্য ছিল রাজ। …’ মনে করিয়ে দেন, ‘আমাদের এখানকার বুদ্ধিজীবী এবং সিনেমা সমালোচকদের প্রশংসা পাবার বহু আগেই সোভিয়েত রাশিয়া, চীন, মধ্যপ্রাচ্য, পূর্ব ইয়োরোপ, আমেরিকা এবং ইংলন্ড থেকে পূর্ণ স্বীকৃতি পেয়েছিল রাজ।’ এরকম অজস্র মুহূর্ত এ বইয়ের পাতায় পাতায় যাদের বাদ দিয়ে আমাদের এই সময়ের সম্পর্কে বিস্তৃত ধারণা দেওয়াই কঠিন।
এ বইয়ের ছত্রে ছত্রে ধরা আছে একটা আমেজ, যা বাদে সময়কে ধরা এক অর্থে দুরূহ তো বটেই, অসম্ভবও। পড়তে পড়তে পাঠকের মনে একটাই কথা ঘুরপাক খেতে বাধ্য যে, যে বিস্তৃত ভুবনকে ধরতে চেয়েছেন শান্তনু মাত্র ৮০ পাতার আবহে সেই ভুবনকে ধরা কী সম্ভব ? যা দেখেছেন শান্তনু, যে সময়টাকে দেখেছেন, তাকে নিয়ে একটি আরো বড়ো বই কি আমরা তাঁর কাছ থেকে আশা করতে পারি না !
নাক্ষত্রিক সংলাপ : সঙ্কলন,সম্পাদনা ও সাক্ষাৎকার -শান্তনু বসু, কথকতা, ৩৫০ টাকা