তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
ভোকাট্টা জামাইষষ্ঠী

           

                     

                              

ছায়া ঠাইরেনের বাড়িতে বরাবরই জামাইষষ্ঠীটা বেশ আমোদ আহ্লাদেই কাটে। তাঁর সঙ্গে জামাইদের সম্পর্কও বেশ আধুনিক, মানে জামাইরা শাশুড়িকে ‘মাদার’ ব’লে ডাকে, তার সঙ্গে ভারত-ইংল্যান্ডের ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা করে, শাশুড়ি জামাইষষ্ঠী উপলক্ষে লক্ষ্মীনারায়ন বস্ত্রালয় থেকে জামাইদের জন্য স্ট্রেচলনের প্যান্টের পিস কেনে…এই আর কি ! ঠাইরেনের তিন মেয়েই চাকুরিরতা, সকালে তাদের সময় নেই আসার। তাই সারা সকাল ছায়া ঠাইরেন কিঞ্চিৎ ছিন্ন আর অনেকটাই কুঁকড়ে যাওয়া পাটের একটা শাড়ি পরে পুজোর আয়োজন সম্পন্ন করেন। নতুন তালপাতার পাখায় হলুদ আর সিঁদুরের ফোঁটা পড়ে। পাখার গোড়ায় লাল করমচা আর দুব্বোঘাস দিয়ে গিঁট বাঁধা হয়। ঘটের গঙ্গাজলেও একগুচ্ছ দুব্বোঘাস চুবোনো। বাটিতে বাটিতে ঘন গরুর দুধ, তাতে সোনার বরণ হিমসাগর আম ডোবানো। ঠাইরেনের কড়া নির্দেশে ঠাকুরমশাই পূজোর আসন ছেড়ে উঠলে তবেই না নাতিনাতনীরা ফলমূল আর মিষ্টি পেসাদ পাবে! ষাট্‌ ষাট্‌ ষাট্‌, নতুন পাখার বাতাস পাবে, হাতে হলুদ সুতো বাঁধবে।

জামাইষোষ্ঠীর সকাল তো ঠাইরেন এইভাবেই সারেন। এবার তো বিকেলের আয়োজন। তিন মেয়ে, তিন জামাই নিয়ে আসবে। নাতিনাতনীরা তো সকাল থেকেই তার চারপাশে ঘুরঘুর করছে। বিরিশিক্কো ওজনের দামড়া ট্রাঙ্ক খুলে ঠাইরেন এক এক করে বার করেন পেতলের গামলা, খুন্তি, কাঁসার থালা, জামবাটি ……তখন তো পূবপাকিস্থান, ওখান থেকে রিফিউজি হয়ে আসার সময় শুধু এই বাসনকটাই আনতে পেরেছিলেন। তাই ওগুলোর ওপর বড্ডো মায়া, যত্ন করে রেখেছেন এখনো। বাসনগুলোর গায়ে হাত বুলোন আর ভাবেন, এখনও মানুষটা ঐ দেশেই রয়ে গেছে। 

নাঃ, বেলা হলো। এবার ময়দা মাখতে হবে, মেজো জামাইটি আবার লুচির ভক্ত। ঘটির ছেলে কি না! সঙ্গে চাপ চাপ ছোলার ডাল, বোঁটাওয়ালা বেগুনভাজা আর পাঁঠার মাংস। ছোটজামাই আবার একটু তেলেঝোলে তাঁর হাতের পাঁঠা খেতে ভালোবাসে। আর শেষপাতে তো ঘন দুধে ডোবানো আম আছেই।

গম্‌গম্‌ করছে বাড়ি। খাওয়া দাওয়া শেষ। ফেরার তাড়া বড়ো একটা কারোর নেই। ঠাইরেন মনে মনে হাসেন আর দুহাত জোড় করে কপালে ঠেকান। কিন্তু আজ দুদিন ধরেই ঠাইরেনের মনে একটা শঙ্কা খচ্‌ খচ্‌ করছে। শেষে ছোটজামাইকে বলেই ফেললেন, -কালবোশেখি হচ্ছে এখন তখন, সঙ্গে বৃষ্টিও…মাঠ-ময়দান ডুবে গেলে ভারত-ইংল্যান্ডের টেস্টটা হবে কী করে? –আরে মাদার, এইটা জানেন না, গোটা ইডেনের নীচেই তো অর্ডার দিয়ে তৈরি করে একটা হিটার লাগানো হয়েছ, যাতে ম্যাচটা পন্ড না হয়ে যায়। পাঁচ থেকে দশ মিনিটেই মাঠ শুকনো হয়ে যাবে! ব্যাস খেলা শুরু। ছোটজামাই তার খেলা শেষ করে ব্যাটনটা মেজোজামাইয়ের হাতে দিতেই আকাশে প্লেন ওড়া শুরু। -বুঝলেন মাদার, প্লেন তো দমদম থেকেই ছাড়ে, প্লেনের পেছনে বাঁধা থাকে সরু তারের মতো একটা শক্ত নাইলন দড়ি, যেটা খালি চোখে আপনি মোটেও দেখতে পাবেন না। পাইলটরা সেই দড়ি বড়ো বড়ো লাটাইয়ে গুটিয়ে এয়ারপোর্টে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে যতক্ষন না  ওদিকে প্লেন নামছে। ডিসট্যান্স বুঝে দড়ি ছাড়ে আর গুটোয়। একদম ঘুড়ির মেকানিজম……শুনতে শুনতেই বিস্ফারিত নেত্রে ছায়া ঠাইরেন ভাবেন ছোটবেলায় ময়মনসিং-এ যখন ঘুড়ি ওড়ানো দেখতেন তখন তো আকাশে দুটো ঘুড়িকে প্যাঁচ খেতে খেতে একটাকে ভোকাট্টা হয়ে যেতে দেখেছেন কতোবার ! ঘুড়ি লাট খেয়ে তালগাছের মাথায় পড়ে কিংবা ল্যাম্পপোস্টে গিয়ে লট্‌কে যায়।  তাহলে কী এখানেও……! পরের দিনই হলুদ পোস্টকার্ডে গোট গোট করে লিখলেন, -এইবার বনগাঁ হইয়া ইন্ডিয়া আইসো। প্লেনে আসিও না, যেকোন সময় ভোকাট্টা হইয়া যাইতে পারে। ইতি তোমার ছায়া।

                                                    লেখক পেশায় অধ্যাপক


Scroll to Top