
বর্তমানে আমাদের কাছে বছরে দু-বার নতুন বছর আসে। প্রথমটা 'নিউ ইয়ার'। সেটা ইংরেজি ক্যালেন্ডার শুরু হওয়ার প্রথম দিনটি। অর্থাৎ ১ জানুয়ারি।
আরেকটা আমাদের নববর্ষ। অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ। দুটোই উৎসব হিসেবে পালিত হয়। তবে দুটো'র মধ্যে তুলনা করলে বলা যায় বাংলা নববর্ষ, ইংরাজির কাছে যেন একটু ম্যাড়মেড়ে। ইংরেজি নিউ ইয়ার-এর জাঁকজমকই আলাদা। একদিনেই উৎসব মেটে না। খ্রিস্টমাস বা বড়োদিনের পর থেকেই যেন একটু একটু করে নববর্ষের আগমনী সুর বাজতে থাকে। আর ৩১ ডিসেম্বরের রাতে তো আর বলার কথাই নয়। সন্ধে থেকেই শুরু হয়ে যায় ধুন্ধুমার কাণ্ড।
তবে চিরকাল এরকম ছিল না। বিশেষ করে আমার অল্প বয়সটা গ্রামে কেটেছে। সেখানে 'নিউ ইয়ার-এর অস্তিত্বই ছিল না। তখন সাধারণ বাঙালি জীবনে শুধু 'পয়লা বৈশাখ'-এই পালিত হত নববর্ষের উৎসব।
আমার গ্রামের নাম বাঘনাপাড়া। পূর্ব বর্ধমান জেলায়। ব্যান্ডেল-কাটোয়া লাইনের অম্বিকা কালনার পরের স্টেশন। বিশেষত্ব এই যে, এখনও বাঘনাপাড়ায় পয়লা বৈশাখ খুব বড়ো উৎসব।
সকাল থেকেই সারা গ্রাম মেতে যায়। তার কারণ পরে বলছি।
ছোটো গ্রাম। গ্রামের মন্দিরে গোপেশ্বর, কানাই-বলাই ও জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রার বিগ্রহ। পয়লা বৈশাখ ভোর থেকেই মন্দিরে পুজোর ধূম। একটু পরেই ঐ তল্লাটের সব পরবেরই বাজনা 'ডগর কড়া' (অনেকটা তাসা পার্টির মতো) এসে যায়। শুরু হয়ে যায় বাজনার দাপট।
সেদিনকার জন্য কিন্তু বাঘনাপাড়া শুধু একটা গ্রাম নয়। চার ভাগে বিভক্ত -- পূব, পশ্চিম, দক্ষিণ ও মাঝের পাড়া। কারণ রাতে চার পাড়ায় হয় বিশাল তুবড়ি প্রতিযোগিতা । যে সে তুবড়ি নয়! একেকটা তুবড়িতে এক মণ বারুদ ঠাসা হয়। গ্রামের কেন্দ্রস্থল, বাজারে মাঝ রাত থেকে তার পরদিন ভোরে সূর্য ওঠার আগে পর্যন্ত চলে তুবড়ি পোড়ানো। মানে চার পাড়ার মধ্যে প্রতিযোগিতা। সেই নিয়ে নারী -পুরুষ, ছেলে-বুড়োর মধ্যে সে কী রেশারেশি! প্রতিযোগিতা বলে ব্যাপার। কোন পাড়া প্রথম হল, দ্বিতীয়ই বা কে, এ নিয়ে উত্তেজনা তো থাকবেই।
প্রত্যেক পাড়া নিজের নিজের বাজনার দল ভাড়া করে। মানে গ্রামে সেদিন মোট চারটে বাজনার দল। নিজের নিজের পাড়ায় বাজিয়ে চলেছে। সঙ্গে লেগে রয়েছে কচি-কাচার দল। কেবল ভর দুপুরে কিছুক্ষণ বন্ধ থাকে। শুরু হয়ে যায় বিকেল থেকে । রাতের কথা তো বলাই বাহুল্য।
সকাল থেকে প্রতি পাড়ায় চলে বারুদ পেষাই করা। বড়ো বড়ো জাঁতায়। সন্ধে থেকে পেল্লাই পেল্লাই পোড়া মাটির খোলে বারুদ গাদা। গ্রামের আদিবাসী পাড়ার বাসিন্দারা এ ব্যাপারে খুবই পটু। গাদা হয় খুব নিষ্ঠা ভরে। বারুদের স্তৃপে সামান্য গঙ্গা জলের ছিটে দিয়ে, হাত জোড় করে প্রার্থনা করে গাদা শুরু হয়। ওখানে বিড়ি - সিগারেট কেউ খেতে পারবে না। বারুদ গাদা চলে প্রায় মাঝ রাত পর্যন্ত। পাড়াগুলো বেশ কয়েকখানা করে তুবড়ি করে।
এরই মধ্যে প্রতি পাড়ার কয়েকজন উদ্যোগী ও পাড়ার লোকেরা মিলে গ্রামের এক প্রান্তে কিছু বাজি পুড়িয়ে আসে। সঙ্গে থাকে বাজনার দল। বাজি মানে সচরাচর আমরা যা দেখি অর্থাৎ বোমা, হাউই, বোমা লাগানো গাছের ঝাড় ইত্যাদি। সেখানেও পাড়াগত রেষারেষি।
এরপর মাঝরাত থেকে শুরু হয় আসল পর্ব। বাজার এলাকা মানুষ মানুষে ছয়লাপ। বিচারকেরা ঘণ্টা বাজিয়ে একেক পাড়ার নাম বললেই সেই পাড়ার লোকজন এবং তিন-চারজন আদিবাসী একেকটা তুবড়ি কাঁধে নিয়ে নিজদেরই বাজনা সহ ছুটতে ছুটতে বাজার এলাকায় এমন ভাবে ঢুকবে যেন যুদ্ধ জয় করতে এসেছে।
তুবড়ি পোড়ার সময় একটু চুপ। পরের তুবড়িতে আগুন লাগানোর মাঝে চলে তারস্বরে চিৎকার। সঙ্গে চলে ছড়া কাটা। ব্যাপারটা বোঝার সুবিধার জন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন ‘পুব পাড়ার ঠ্যাং খোঁড়াদের / দেখলে হাসি পায়, / এক পয়সা বারুদ কেনে /এক পয়সা খায়’ । নির্দিষ্ট সময় অতিক্রান্ত হলে, বিচারকরা ঘণ্টা বাজাবেন। তখন এক দল বেরিয়ে গিয়ে, আরেক দল ঢুকবে। ভোর রাতে সব পোড়ানো হয়ে গেলে বিচারকরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে প্রথম, দ্বিতীয় ইত্যাদি স্থানাধিকারীদের ঘোষণা করবেন।
মাঝে অবশ্য আরেকটি পর্ব আছে। বোঝানোর জন্য একটু নিজেদের কথা বলব। ওইটুকু পাঠক দয়া করে একটু নিজ গুণে মার্জনা করে দেবেন। আমাদের হচ্ছে যৌথ পরিবার। জ্যাঠতুতো - খুড়তুতো ধরে তেরোজন ভাই-বোন। ছোটোবেলায় হালখাতা করতে বেরোতাম। যদিও জ্যাঠামশাই সব দেনা আগেই মিটিয়ে আসতেন। কিন্তু বিকেলে আমাদের একবার দোকানে দোকানে হাজিরা দিতে হত।
ঠাকুমা আমাদের তিন বড়ো ভাইয়ের হাতে ছোটো কাপড়ের টুকরো দিয়ে, তিনটে ঝুলি মতো করে বেঁধে দিতেন। আমরা তিন ভাই সেই ঝুলি হাতে ঝুলিয়ে, পেছনে ছোটো ছোটো আরো দশজন ভাই-বোনের ব্যাটেলিয়ান নিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াতাম। সে আমাদের কী আগ্রহ! কতরকমের খাবার যে থাকত ঐ ঝুলিতে। মিহিদানা, সীতাভোগ, বোঁদে, লাড্ডু, নিমকি আরো কত কী। বাড়িতে ঢুকলে মা-কাকিমারা ভাগ করে দিতেন। তাই খেতেই কী আনন্দ !
পরিশেষে একটা কথা সংযোজন না করলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। সারা গ্রাম যেমন আনন্দে মেতে, তেমনই বাড়িতে বাড়িতে ভালো-মন্দ রান্নার গন্ধে ভরপুর। পয়লা বৈশাখ এগিয়ে এলেই ছেলে-মেয়েদের প্রশ্নও এগিয়ে আসে। ‘বাবা, এ বছর গ্রামে যাওয়া হবে না?’ নানান ব্যস্ততার জন্য, ওদের ‘না’ বলতে নিজের মধ্যেই যে কী কষ্ট হয় !!