
আগস্ট মাসের প্রথমেই মায়ের কাছে যাওয়ার কথা ছিল তার। ভোরে ফোনে বলে রেখেছিল, ‘আজ হবে না, আজ অ্যাপ বাইক চালাব। কাল আসছি, মা।’ কী না করত সে ! খাবার ডেলিভারি থেকে বাইকে যাত্রী নেওয়া – সংসার চালাতে উদোম খাটত সারাদিন। গাঁ-এ ফিরে পাড়ার মোড় থেকে হাঁক দিতে দিতে আসত। সারা পাড়া জেনে যেত, সৌমেন বাড়ি ফিরছে। এবার পুজোয় সে আর কোথাও ফিরবে না। তেরোই আগস্টের বিকেলে, সৌমেন জ্যান্ত জ্বলে মরেছে সল্টলেকের সেতুতে। সেদিন তার বাইকে ধাক্কা দেয় এক চারচাকা। অভিঘাতে ব্রিজের রেলিং-এ সে কার্যত হেঁটমুণ্ড উর্ধ্বপদ হয়ে ছিটকে পড়ে --- পা আটকে যায় বলে নড়তে পারেনি। গাড়ির পেট্রোল লিক করে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে মিনিট কুড়ি ধরে পোড়ে ছেলেটা। সেখান থেকে আর কোথাও সে যাবে না – দুর্গাপুজো আসবে, যাবে, ঘরে না ফেরা, অকালে চলে যাওয়া ছেলেটা ‘নেই’। ওদিকে, কুম্ভমেলায় গিয়ে আমার যে বন্ধুর দাদা চিরতরে ঘুমিয়ে গেল – তাদের ঘরে লক্ষ্মী এসেছেন। কান্না চেপে, মা নাতনী কোলে ঠাকুর দেখবেন এবার। দু’মাসের শিশু, জেঠুকে দেখবে পাবে না কখনো। বাবা, মা, ঠাম্মার গল্পে, জানবে পুণ্য মানেই আয়ুর নিশ্চয়তা নয়।
এইসব ‘সারেগামা পেরিয়ে’, পুজো এসে গেল – আজ পঞ্চমী, মানে সম্বৎসরের আয়োজন, উল্লাসের দ্বারে আমরা। তবে সবাই নয় – সুবল সোরেন বা সন্তোষ কুমার মণ্ডলের বাড়ি এবার দুর্গা ঠাকুর কী নিয়ে আসবেন? এঁরা দু’জনেই মারা গেছেন। যোগ্য হওয়া স্বত্বেও চাকরি হারিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে। সন্তোষ ঋণ নিয়ে বাড়ি করছিলেন। সে বাড়ির একমাত্র রোজগেরে তিনিই ছিলেন শোনা যায়। সেখানে ধূপ-মালা- আরতির প্রভাব নেই আর। ফুলেদের প্রবেশ নিষেধ। ও পাড়ার প্রতিমার চোখে কি জল দেখতে পাবেন ? দেবীর তৃ্তীয় নয়নটি জলে ভরা। সে জল, এই দিন তিনেক আগেই শহর ভাসিয়ে এগারোটি প্রাণ নিয়ে তবে শান্ত হয়েছে। পুজোর মুখে, এই জল-দানবের তাণ্ডবে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়ে দিশেহারা কলেজস্ট্রিটের বইপাড়া,গড়িয়াহাট-হাতিবাগানের হকার্স মার্কেট। কুমারটুলিতে বহু প্রতিমা গলে গেছে- আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এখনও পুরোপুরি সামনে আসেনি। জমা জলের মাঝে আটকে বৃদ্ধ, শিশু, অসুস্থ মানুষ। এদিকে পুজো এসে গেছে – গেল বর্ষায় যে শিশুটিকে মা ঘরে রেখে কাজে গিয়েছিলেন, ফিরে এসে আর তাকে জীবন্ত কোলে তুলতে পারেননি--- সেই মায়ের চোখের জল আজীবন পড়বে। সেখানে এবার আর মায়ের আবাহন নেই। চির-বিসর্জনের সেই ঘরে উৎসব পা দিতে সাহস পাবে না আর। এর মধ্যেও ষষ্ঠী এসে যাবে। আমরা, ‘শশীবাবু’কে নিয়ে আবশ্যক স্টেট্যাস লিখে পুজো শুরু করব। সপ্তমী-অষ্টমী- নবমী গড়িয়ে বিসর্জনের বাজনা ফেলে রেখে, এ বছরের ‘পুজো’ শেষ হবে। ‘অবশ্যম্ভাবী আনন্দে’ মেতে উঠবে দুনিয়া। রোদ উঠলে, উপচে পড়া ভিড়ে, বেলুন বিক্রেতা বালকের মুখে হাসি ফুটবে। ঘর খালি করে চলে যাওয়া, মৃত কন্যার পুজোর শাড়ি দান করে দেবেন বাবা-মা। রান্না সেরে, সে শাড়ি জড়িয়ে ঠাকুর দেখতে যাবেন চার বাড়ি রেঁধে সন্তানদের মুখে অন্ন তোলা অন্নপূর্ণা। আলতা পরবে সদ্য বিবাহিত আই টি কর্মী , পাঞ্জাবি পরা স্বামীকে নিয়ে মাঝরাতে শ্রীভূমির লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে চা চাইবে । মা দুর্গা হাসবেন। আমাদের কান্না, হাসি, বিষাদকে অতিক্রম করে পুজো শুরু হবে – দর্পণে দেখা যাবে যে সব দুর্গা আর ফিরবে না তাদের ছায়া--- আলোকিত গ্রাম, শহর থেকে ঠাকুরের হাওয়া ঘুরে যাবে হাস্যমুখের ভিক্ষুকের দিকে, আতুর জননীর দিকে, সন্তানহারা পিতার দিকে, তুলসীতলায় বসা পুত্রের দিকে, ঘরে ফেরা পরিযায়ীর দিকে, ক্লান্ত সাংবাদিকের দিকে, বৃদ্ধাবাসের নির্ণিমেষ চাউনির দিকে – পুজো শুরু হচ্ছে। দুর্গা ঠাকুর রওনা দিয়েছেন। সহস্র মৃত্যু, অজস্র হত্যা, অমানুষিক অত্যাচার, দয়াহীন রোদ্দুর – বন্যা- অতিমারি পার করে – আমরা অপেক্ষায়-- ‘আমাদের পায়ে রাত্রিচক্র’ ঘুরছে।