তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
সেদিন-এদিনের কলকাতার অন্দর মহল

'কলকাতার তলপেট : মস্তানির সেকাল-একাল ( ১৯৪০ - ১৯৭৭)' বইটির প্রধান বৈশিষ্ট্য চার থেকে সাতের  দশক, এই ৩৭ বছরে কলকাতার মস্তান জগতের প্রধান চরিত্রদের নিয়ে বিশদ আখ্যান। মস্তানতন্ত্রকে ইতিহাস, সমাজ আর আবহমান রাজনীতির আলোয় ফিরে দেখা, বিশ্লেষণ করা। একদিকে, কলকাতার অলিগলি ঘুরে  ফিল্ড ওয়ার্কের মাধ্যমে ওরাল হিস্ট্রি তুলে আনা, আর অন্যদিকে, রাজনীতিবিদদের সাক্ষাৎকার, তথ্যসূত্র দেওয়া এই আখ্যানকে বাড়তি মাত্রা দিয়েছে।' বলা হয়েছে ব্ল্যাক লেটার্স থেকে অতি সম্প্রতি প্রকাশিত  , সৌরভ গুহর ২৩২ পাতার অসামান্য কাল-বিবরণীর, লেখকের  তরফে পরিচিতি নির্মাণ করতে গিয়ে। গত শতকের উক্ত সময়পর্বে যাঁরা এই শহরের আনাচে-কানাচে বেড়ে উঠেছেন, ঘুরে বেড়িয়েছেন এ বই তাঁদের সময়-স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলবার জন্য যথেষ্ট। বিশেষ করে যেহেতু এ বইয়ের লেখক পেশায় টেলিভিশন সাংবাদিক। দু-দশকের বেশি সময় জুড়ে কাজের অভিজ্ঞতায় লেখক কলকাতার অন্ধকার জগৎ নিয়ে কেবল চর্চাই করেননি, সেই চর্চাকে একই সঙ্গে গভীরতাও দিয়েছেন বিপুল যত্নে। ফলে এ বইয়ের পাতায় পাতায় উঠে এসেছে সেই সময়ের কলকাতার একদম জীবন্ত ছায়া ও ছবি, যে কলকাতার বুকে ধীরে ছায়া ফেলছিল স্বাধীনতা-উত্তর কালের সময়জ চরিত্র। এ বই সেই কালপর্বের ইতিহাস হিসেবে মূল্যবান অবশ্যই, কেননা এ বইতে সৌরভ খুঁজে বেড়িয়েছেন আজকের কালচরিত্রের মূল শিকড়টাকে , যা ভিত্তি হিসেবে আশ্রয় পেয়েছিল সেদিনের সামাজিক পরিমণ্ডলের মধ্যে। সৌরভের এ-কাজের মূল গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য যদি কোথাও থেকে থাকে তাহলে তা এই এখানেই। স্বাধীনতা-উত্তর কালের কলকাতা কীভাবে আজকের কলকাতায় পর্যবসিত  হল সেই ইতিহাস /ইতিবৃত্ত যিনি খুঁজবেন, আজ থেকে দশ পনের কুড়ি বাইশ বছর বাদে হলেও এ-বই তাঁকে খুঁজে পেতেই হবে।

   ২৩২ পাতার এ বই নির্মাণ করতে গিয়ে লেখক জোর দিয়েছেন সেই সময়কে আপাদমাথা তুলে আনবার উপর। এবং এ-কাজ করতে গিয়ে কেবল অনুসন্ধানের ব্যাপকতার উপরেই জোর দেননি তিনি, তার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন ভাষাভঙ্গির সাংবাদিক সুলভ টু-দা-পয়েন্ট দেখার বৈশিষ্ট্যকেও, সোজাসুজি, যার জন্যে তাঁর কলমে পুনর্বার প্রাণ পেয়ে জেগে উঠে আড়মোড়া ভেঙেছে সেদিনের কলকাতার টোপোগ্রাফি, যা যতদিন যাচ্ছে মুছে যাচ্ছে অবিরত।

  মোট চব্বিশটি লেখায় সৌরভ এ-বইতে এনেছেন গোটা একটা সময়কে, যে সময়ের কোণে কানাচে কলকাতা শাসন করেছে কখনো একদা ত্রাস, বিপ্লবী বিপিন বিহারী গাঙ্গুলির সহযোগী, ভূতপূর্ব রাজবন্দী, রডা কোম্পানির অস্ত্র লুঠের অন্যতম কারিগর অনুকূলচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ভাইপো, বিধান রায়ের ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর পাণ্ডা গোপাল পাঁঠার চেলা, ক্রিক রো-র ভানু বোস, কখনো গোপালেরই আরেক চেলা, চাইনিজ ডন জারবাতি, কখনো চুঁচুড়া চন্দননগর থেকে গোপালের সান্নিধ্যে আসা আরেক বেতাজ বাদশা রাম চ্যাটার্জি – সেই যে যিনি ১৯৬৯-এ দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী হয়েছিলেন, কখনো ভানুর প্রতিদ্বন্দ্বী রনি ডেভিডসন, তো কখনো আবার আরেকটু এগিয়ে এসে ফাটাকেষ্ট, গৌরীবাড়ির হেমেন মণ্ডল  এবং অন্যান্যরা। এই অন্যান্যদের মধ্যেও কম নেই। যেমন ধরুন কুঁদঘাট এলাকার একদা ত্রাস পি কে সেনগুপ্ত , যিনি নাম জিগ্যেস করা হলে নাকি বলে থাকেন, ‘নমস্কার স্যার, আমি পিকে সেনগুপ্ত, এইডা আমার ভালো নাম । আমার একখান খারাপ নামও আসে, বোম। কুদঘাটের বোম।’ সৌরভ লিখছেন, ‘সাদা জামা, সাদা প্যান্ট, কালো অ্যাম্বাসাডর। যার সামনে দু মাথায় দুটো ওয়ারলেস অ্যান্টেনা খাড়া হয়ে আছে। …তার রেলার কাছে অতি বড় প্রভাবশালীও ফিকে এই ২০২৪-এও।’ (পৃ ১৩৭)

  আজকের কলকাতাকে চিনতে হলে সৌরভের চিনিয়ে দেওয়া এই কলকাতাকেও আপনাকে চিনে নিতেই হবে, পাঠক। নইলে কলকাতা কেবল কেন, আজকের পশ্চিমবঙ্গকেও আদতে কতটা চিনে ওঠা যাবে সন্দেহ আছে।

কলকাতার তলপেট : মস্তানির সেকাল-একাল ( ১৯৪০ - ১৯৭৭) : সৌরভ গুহ, ব্ল্যাক লেটার্স ,৭০০ টাকা  


Scroll to Top