
সমকালীন ভারতীয় যুদ্ধচিত্র মূলত দুটি প্রবণতায় বিভক্ত—একদিকে অতিরঞ্জিত জাতীয়তাবাদ, অন্যদিকে যুদ্ধকে নান্দনিক বীরত্বের স্পেকট্যাকলে রূপান্তর। এই প্রেক্ষাপটে ‘ইক্কিস’ একটি ব্যতিক্রমী পাঠ প্রস্তাব করে। পরিচালক শ্রীরাম রাঘমন যুদ্ধকে এখানে রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার না বানিয়ে স্মৃতি, মানবিক সম্পর্ক ও নৈতিক দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র হিসেবে নির্মাণ করেছেন। ফলে ছবিটি কেবল একটি ঐতিহাসিক যুদ্ধচিত্র নয়; এটি একটি যুদ্ধবিরোধী মানবতাবাদী চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে পেরেছে।
চলচ্চিত্র-তত্ত্বে ‘মেন-অন-এ-এ-মিশন’ ঘরানার মূল বৈশিষ্ট্য হল যুদ্ধের বৃহৎ কাঠামোর ভেতরে ব্যক্তিগত চরিত্রায়ণ। 'ইক্কিস ' এই ঐতিহ্য অনুসরণ করে, কিন্তু অনুকরণে সীমাবদ্ধ থাকে না।
পশ্চিমি ধ্রুপদি উদাহরণ—‘দ্য গানস অফ নাভারন’, ‘দ্য ডার্টি ডজন’, ‘দ্য গ্রেট এসকেপ’-এ যেমন দেখা যায়, যুদ্ধের চেয়ে যোদ্ধার মনস্তত্ত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ‘ইক্কিস'-ও তেমনই ব্যক্তিমানুষকে কেন্দ্র করে এগোয়। 'ইক্কিস' ছবিটি একটি জীবনীভিত্তিক যুদ্ধচিত্র, যেখানে ১৯৭১ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের পটভূমিতে পরমবীর চক্রপ্রাপ্ত বীর লেফটেন্যান্ট অরুণ খেতরপাল–এর জীবন ও আত্মত্যাগের কাহিনি বলা হয়েছে।
কাহিনি শুরু হয় অরুণ খেতরপালের শৈশব ও কৈশোর দিয়ে—দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা এবং সেনাবাহিনীর প্রতি গভীর টান তার চরিত্রকে ধীরে ধীরে গড়ে তোলে। ইন্ডিয়ান মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণের সময় তার নেতৃত্বগুণ, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এবং সহযোদ্ধাদের প্রতি দায়িত্ববোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ব্যক্তিগত জীবনে সে সংবেদনশীল ও রোমান্টিক; যুদ্ধচলচ্চিত্রের প্রতি তার ভালোবাসা এবং প্রেমিকা কিরণের সঙ্গে সম্পর্ক তাকে আরও মানবিক করে তোলে।
এরপর কাহিনি প্রবেশ করে ১৯৭১-এর যুদ্ধে। অরুণ পোস্টিং পান ১৭ পুণে হর্স রেজিমেন্টে। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ যখন তীব্র হয়, তখনই আসে ছবির মূল কেন্দ্রবিন্দু—শকরগড় সেক্টরের বসন্তর নদী এলাকার ট্যাংকযুদ্ধ। শত্রুপক্ষের আধুনিক ট্যাংকের মুখোমুখি হয়ে, সংখ্যায় ও অস্ত্রে পিছিয়ে থেকেও অরুণ অসাধারণ কৌশল, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং অকুতোভয় মনোভাব দেখান।
এক পর্যায়ে তাঁর ট্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তিনি নিজেও গুরুতর আহত হন। তবু পিছু হটার নির্দেশ অগ্রাহ্য করে তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান। শত্রুপক্ষের একের পর এক ট্যাংক ধ্বংস করে অরুণ সহযোদ্ধাদের জন্য পথ খুলে দেন এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ধরে রাখতে সক্ষম হন। শেষ পর্যন্ত, অতিমানবীয় সাহস ও কর্তব্যনিষ্ঠার পরিচয় দিয়ে তিনি শহিদ হন—কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগই যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
ছবির সমাপ্তি অংশে অরুণ খেতরপালের বীরত্বকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়—মরণোত্তর পরমবীর চক্র। ‘ইক্কিস ‘ শুধু একটি যুদ্ধের কাহিনি নয়; এটি তরুণ বয়সে দায়িত্ব, দেশপ্রেম, প্রেম ও মৃত্যুকে অতিক্রম করে যাওয়া এক অসামান্য মানবিক বীরত্বের দলিল।

লেফটেন্যান্ট অরুণ খেতারপাল চরিত্রটি কেবল একজন সৈনিকের নয়; একজন প্রেমিক, একজন পুত্র, এবং সর্বোপরি একজন স্মৃতিবাহকেরও। কিন্তু রাঘবন ‘ইক্কিস'-এ আরেকটি অসাধারণ কাজ করেছেন, যা দেখে আমি একেবারেই অবাক হয়েছি। সেটা বলার আগে সৎভাবে বলি—শুরুতে আমার যথেষ্ট সংশয় ছিল। জনি গদ্দার, অন্ধাধুন এবং মেরি ক্রিসমাস-এর মতো ছবির পরিচালক যখন এমন এক সময়ে যুদ্ধের ছবি বানাচ্ছেন, যখন ভারতীয় ইতিহাসের নানা সময়কাল নিয়ে একের পর এক যুদ্ধচিত্র তৈরি হচ্ছে—যার বেশিরভাগই অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এবং উগ্র জাতীয়তাবাদে ভরপুর—তখন সন্দেহ হওয়াই স্বাভাবিক। দেশপ্রেমমূলক ছবি বানানোয় কোনো সমস্যা নেই; বরং দেশপ্রেম ছাড়া যুদ্ধচিত্র প্রাণহীনই লাগে। কিন্তু ‘ইক্কিস' দেখিয়ে দেয়, কীভাবে সেটা সুন্দরভাবে করা যায়।
এই ছবি জানে—নায়কদের সম্মান জানানো, তাদের বীরত্ব ও আত্মত্যাগকে কুর্নিশ করা যায় অপ্রয়োজনীয় বাঁক না নিয়ে, কল্পনাকে সত্য হিসেবে চালিয়ে না দিয়ে, অতিরিক্ত যুদ্ধঘোষণা না করে—সংক্ষেপে বললে, দর্শকের মাথাব্যথা না বাড়িয়েই। অভিনয় নির্বাচন পুরোপুরি নিখুঁত। অরুণের ঊর্ধ্বতন অফিসারের ভূমিকায় শিখন্দর খের দারুণ ভারসাম্য রক্ষা করেছেন—যখন তিনি তরুণদের ঠাট্টা করছেন না, তখন ঠিকঠাক কমিক রিলিফ জোগাচ্ছেন।
রাঘবন ও তাঁর চিত্রনাট্য দল নন-লিনিয়ার কাঠামো বেছে নিয়েছেন—১৯৭১ এবং ২০০১ সালের ঘটনাপ্রবাহ, অর্থাৎ অরুণ খেতারপালের মৃত্যুর আগে ও পরের সময়কাল, পাশাপাশি এগিয়ে চলে। এর মূল উদ্দেশ্য রাজনীতি বা ধর্মের ঊর্ধ্বে মানবতা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া। এই ভাবনাটি বিশেষভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠে দুই চরিত্রের সম্পর্কের মাধ্যমে—যাঁরা ছবিটির হৃদয় ও আত্মা বলা যায়—এম. এল. খেতারপাল (ধর্মেন্দ্র) এবং ব্রিগেডিয়ার নিসার (জয়দীপ আহলাওয়াত)।
ছবিটি মূলত এই দুই চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়েই এগোয়, অরুণের পাশাপাশি। অরুণের বাবার পাকিস্তানের সারগোধা থেকে আসা এবং দেশভাগের আগে সেখানে বসবাস করার ইতিহাস গল্পে এক গভীর বেদনাময় মাত্রা যোগ করে। ২০০১ সালের পাকিস্তান পর্বে এম. এল. খেতারপালের নিসার ও তার পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর দৃশ্যগুলো ‘ইক্কিস'-এর সবচেয়ে আবেগঘন অংশগুলোর মধ্যে পড়ে।
ধর্মেন্দ্রের জন্য ইক্কিস যেন এক ট্রিবিউট। তিনি তাঁর চরিত্রে ইতিহাস ও নৈতিকতার এক গভীর বোধ এনে দেন। ছবির নির্মাণশৈলী আরও সমৃদ্ধ হয়েছে তথ্য পরিবেশনের ভঙ্গির মাধ্যমে। রাঘবনের বিশ্বাস—কিছু ‘অনুপস্থিত’ তথ্য দেরিতে প্রকাশ পেলে তার প্রভাব আরও গভীর হয়। এই বিশ্বাসই ভাগ করে নেয় আহলাওয়াতের নিসার চরিত্রটি—যার গল্পগত গুরুত্ব এক গুরুত্বপূর্ণ ‘প্লট টুইস্ট’ হিসেবে যথাসময়ে উন্মোচিত হয় এবং ফাইনালের আবেগকে আরও তীব্র করে তোলে। ছবিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফর্মাল সিদ্ধান্ত হল নন-লিনিয়ার ন্যারেটিভ। ১৯৭১ ও ২০০১ সালের টাইমলাইন পাশাপাশি চলতে থাকে। এই দ্বিস্তরীয় সময়বিন্যাস স্মৃতির চলচ্চিত্রিক উপস্থাপনাকে সামনে আনে। এই কৌশলটি মাল্টিপল টাইম ফ্রেমের সঙ্গে তুলনীয় হলেও, ‘ইক্কিস‘-এ সময় এখানে উত্তেজনার জন্য নয়, বরং নৈতিক প্রতিফলনের জন্য ব্যবহৃত। ২০০১ সালের অংশে এম. এল. খেতারপাল ও ব্রিগেডিয়ার নিসারের সম্পর্ক দেশভাগ-উত্তর উপমহাদেশের একটি বিকল্প ইতিহাস রচনা করে—যেখানে স্মৃতি শত্রুতার চেয়ে শক্তিশালী।
অরুণের পিতার পাকিস্তানের সারগোধা-বাসের ইতিহাস ছবিটিকে একটি পোস্ট-পার্টিশন ডিসকোর্সে স্থাপন করে। এখানে যুদ্ধ রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র নয়, বরং স্মৃতি বনাম রাজনীতির দ্বন্দ্ব।
ব্রিগেডিয়ার নিসার চরিত্রটি ‘শত্রু’ ধারণাকে ভেঙে দেয়। তিনি দেখিয়েছেন যুদ্ধের অপর পাশের মানুষ—তার সঙ্গেও বন্ধুত্ব সম্ভব, ইতিহাস ভাগ করা সম্ভব। এটি ভারতীয় যুদ্ধচিত্রে এক বিরল মানবতাবাদী অবস্থান। এই দৃষ্টিভঙ্গি যুদ্ধকে নেসেসারি ইভেল হিসেবে নয়, বরং ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি হিসেবে চিহ্নিত করে।
একাডেমিকভাবে এ ছবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—ইক্কিস দেশপ্রেমকে জিঙ্গোইজম থেকে আলাদা করতে মানসিকভাবে শিক্ষা দেয়, যেটা এই মুহূর্তে ভারতীয় প্রধান ধারার ফিল্মে জরুরি। দেশপ্রেম এখানে নীরব, সংযত এবং দায়িত্বশীল। কোনো অতিরিক্ত যুদ্ধঘোষণা, স্লোগান বা শত্রু-দানবায়ন নেই। এই অবস্থান ছবিটিকে ভারতীয় সমকালীন যুদ্ধচিত্রের উগ্র প্রবণতার বিপরীতে দাঁড় করায়। এই অর্থে ‘ইক্কিস’ নিছক যুদ্ধের গৌরবগাথা নয়, বরং আত্মত্যাগের নৈতিক মূল্যায়ন। চিত্রগ্রাহক অনিল মেহতা যুদ্ধদৃশ্যকে গ্ল্যামারমুক্ত রাখেন। পরিষ্কার স্পেশাল জিওগ্রাফি, সীমিত স্লো-মোশন এবং সংযত ভিএফএক্স যুদ্ধকে বাস্তব অভিজ্ঞতায় রূপ দেয়।
চলচ্চিত্র-ইতিহাসে সেরা যুদ্ধবিরোধী ছবিগুলো যুদ্ধকে বীরত্বের উৎস না বানিয়ে অস্তিত্বগত সংকট হিসেবে দেখিয়েছে—যেমন ‘ফুল মেটাল জ্যাকেট’ সেভিং প্রাইভেট রায়ান।
‘ইক্কিস’ এই ঐতিহ্যের ভারতীয় উত্তরাধিকার। এখানে যুদ্ধ দৃশ্যমান হলেও, তার নৈতিক প্রশ্ন আরও দৃশ্যমান।
একাডেমিক দৃষ্টিতে ‘ইক্কিস’ একটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র, কারণ এটি—যুদ্ধকে মানবিক স্মৃতির ভেতর স্থাপন করে। দেশভাগ-উত্তর সম্পর্কের একটি বিকল্প নৈতিক কল্পনা নির্মাণ করে। ভারতীয় যুদ্ধচিত্রকে জিঙ্গোইজম থেকে উদ্ধার করে। ‘ইক্কিস’ প্রমাণ করে, দেশপ্রেম মানেই উচ্চস্বরে কথা বলা নয় ; কখনও কখনও নীরব মানবিক সম্পর্কই সবচেয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য হয়ে ওঠে।