তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
ভাগলপুরে শরৎচন্দ্রের বাড়ি রক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেয়নি সরকার
ভাগলপুর। বিহারের এই শহরটার সঙ্গে একদা বাঙালির ছিল নাড়ির টান। বাসিন্দাদের ৬০ শতাংশ ছিল বাঙালি। এই শতাব্দীর গোড়ার দিকে সেই সংখ্যাটা কমতে শুরু করে। এখন মেরেকেটে হাজার পাঁচ ছয় হবে। নভেম্বরে ভোটের প্রচারে   এসে অবশ্য নরেন্দ্র মোদি শরৎচন্দ্র থেকে কাদম্বিনী গাঙ্গুলি - ভাগলপুরের কৃতী সন্তানদের নাম উল্লেখ করে বুঝিয়েছিলেন, হোম ওয়ার্ক ভালই করে এসেছেন। সত্যি, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বনফুল, কিশোর কুমার,‌ প্রথম বাঙালি মহিলা ডাক্তার কাদম্বিনী গাঙ্গুলি - বাঙালির গর্ব করার মত অনেক নাম মিশে আছে এই শহরের বাতাসে। শরৎচন্দ্রের কালজয়ী উপন্যাস 'শ্রীকান্ত'র পটভূমি ভাগলপুর। 'দেবদাস'-এর পরিকল্পনাও এখানেই। পশ্চিমবঙ্গের দেউলটি বা দেবানন্দপুরে যেমন কথাসাহিত্যিকের বাড়ি সংরক্ষিত, ভাগলপুরে কিন্তু তা নয়। বাঙালিটোলার মানিক সরকার ঘাট রোডে তাঁর মামাবাড়িতে বসবাস করেন উত্তরসূরীরা। তাঁরাই ব্যক্তিগত উদ্যোগে যত্ন করে রেখেছেন শরৎচন্দ্রের ব্যবহৃত জিনিসপত্র। এ'নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন শরৎচন্দ্রের মামাতো ভাইয়ের পুত্র শান্তনু গঙ্গোপাধ্যায়। জানালেন, 'কেন্দ্রীয় সরকারের স্মার্ট সিটি প্রকল্পের প্রতিনিধিরা এসেছিলেন। সাফ জানিয়ে দিয়েছি, বাড়ি নিয়ে কিছু করতে দেব না।' তিনি ও তাঁর কলেজ পড়ুয়া ছেলে মিলে আলমারি থেকে বার করে আনলেন কথাসাহিত্যিকের ব্যবহৃত কলমদানি, চেয়ার, গড়গড়া।

বাবার আর্থিক অবস্থা খারাপ থাকায় পাঁচ বছর বয়সে পাঠিনো হল মামাবাড়ি ভাগলপুরে। এখানকার স্কুলেই পড়াশোনা, এন্ট্রান্স পরীক্ষাও দেন এখান থেকেই। ভাগলপুরের উদাত্ত গঙ্গা কিশোর শরৎচন্দ্রের দামালপনার সাক্ষী। শ্রীকান্তের ডানপিটে সঙ্গী ইন্দ্রনাথের চরিত্রটি বন্ধু রাজেন মজুমদারের আদলে সৃষ্টি। রাজেন দিন নেই,রাত নেই, বাঁশি বাজিয়ে ডাকত, 'চল, মাছ ধরতে যাই।' দুই বন্ধুরই বাড়ি ছিল গঙ্গা তীরে। রাজেনের পরিবার আদমপুর ঘাটের বাড়ি বিক্রি করে চলে গেছে আগেই। গঙ্গার ধারে বটগাছের নিচে ঝিরিঝিরি হাওয়ায় বসে লিখতেন শরৎচন্দ্র। তাঁর কল্পনার পাখা নদীর উতল হাওয়ায় পেত ওড়ার ছন্দ। শরৎচন্দ্রের 'দেবদাস' যেভাবে যুগ যুগ ধরে মুগ্ধ করেছে গোটা দেশকে, সে রেকর্ড আর কোনো সাহিত্যিক ভাঙতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। সেই ১৯৩৫ সালে প্রমথেশ - যমুনা বড়ুয়া- চন্দ্রাবতী দেবীর 'দেবদাস' কিংবা ২০০২ সালের শাহরুখ -মাধুরী- ঐশ্বর্যার 'দেবদাস' - কালের বেড়া ভেঙে সুপার ডুপার হিট। কিন্তু সৃষ্টির কদর থাকলেও সৃষ্টিকর্তা যে ক্রমশ আড়ালে চলে যান, তার বড় প্রমাণ ভাগলপুর। পরবর্তী কয়েক প্রজন্ম হয়তো যত্নে রক্ষা করবে মামাবাড়ির শরৎ-স্মৃতি, কিন্তু গঙ্গা তীরের প্রিয় বটগাছের মতই হারিয়ে যাবে বাকি সবকিছু। যেমন একটু দূরেই বিক্রি হয়ে গেছে বনফুলের বাড়ি। শান্তনুবাবুর পুত্র সঙ্গে করে নিয়ে গেল সেই বাড়িটির সামনে। কিন্তু গেট পেরিয়ে ঢোকা গেল না। মামলা মোকদ্দমার জালে জড়িয়ে জরাজীর্ণ অবস্থায় ধুঁকছে বাংলো টাইপ সাবেকী বাড়িটি। 'একসময় এখানকার তো বটেই, কলকাতা থেকে আসা সাহিত্যিক আর বোদ্ধাদের আড্ডায় গমগম করত বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি। অনেকে তাঁকে ডাক্তারবাবু বলেও ডাকত।' আফশোস করলেন ভাগলপুরের প্রবাসী বাঙালিদের অভিভাবক বিলাস কুমার বাগচী, টুনিদা নামেই যিনি জনপ্রিয়। ১৯৯৭ সালে স্থানীয় প্রশাসনের শরৎচন্দ্রের বাড়ি দখল অভিযান রুখে দিয়েছিলেন, জানালেন সগর্বে। ২০০০ সালে প্রণব মুখার্জিকে নিয়ে গেছিলেন সেই বাড়ি দেখাতে। তারপর থেকে এত বছরেও অবশ্য বাড়ি সংরক্ষণে কোনো সরকারের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।


Scroll to Top