তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
মঞ্চে ফের অগ্নিগর্ভ নকশালবাড়ি ও চারু মজুমদার

সে প্রায় ৫৮ বছর আগের কথা। উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়ি ব্লকে স্থানীয় জমিদার ও জোতদারদের বিরুদ্ধে মূলত আদিবাসী কৃষক সমাজের বিদ্রোহে ঝারুগ্রামে  এক পুলিশ ইন্সপেক্টর খুন হয়। আন্দোলন দমন করতে তৎকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকার পুলিশবাহিনি পাঠায় নকশালবাড়ি থানা থেকে ৫-৬ কিলোমিটার দূরে বেঙ্গাইজোত গ্রামে। গ্রামের নেতারা পুলিশ আসার খবর পেয়ে মেয়েদের ঢাল হিসেবে সামনে দাঁড় করিয়ে দেন। পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আটজন নারী, একজন পুরুষ আর দুই শিশু। নকশালবাড়ির বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে পাশের খড়িবাড়ি ও ফাঁসিদেওয়াতে। চা বাগানের শ্রমিকরাও ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে কৃষকদের এই লড়াইকে সমর্থন জানায়। তৎকালীন শাসক বিশাল প্যারামিলিটারি পাঠিয়ে আন্দোলনকে কব্জা করতে ব্যাপক ধরপাকড় ও অত্যাচার শুরু হয়। কয়েকশো মানুষ আহত এবং হাজারের বেশি গ্রেপ্তার হন। উল্লেখ্য, জঙ্গল সাঁওতাল গ্রেপ্তার হন, চারু মজুমদার আত্মগোপন করেন। সিপিআই-এম এর অন্যতম নেতা চারু মজুমদার ছিলেন এই ভাবনার অনুপ্রেরণা। নকশাল আন্দোলনের প্রাণপুরুষও ছিলেন তিনি। তাঁর অন্যতম সহযোগী ছিলেন কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল, সরোজ দত্ত প্রমুখ। এর পরের ইতিহাস ব্যাপক ও বিস্তৃত।

   প্রসঙ্গটি এল নকশাল আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে চন্দন সেনের  নাটক , বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ‘বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ’ নাট্য প্রযোজনাটির কারণে। নাটকটিতে বিপ্লবী ইতিহাসের রক্তাক্ত অধ্যায় থেকে তৎকালীন বামপন্থী দলগুলির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মতপার্থক্য, ভাঙন থেকে শুরু করে বিপ্লব, আদর্শ এবং ব্যক্তি জীবনের জটিলতাও উঠে এসেছে। কেবল তাই নয়, নাটকটি নকশালবাড়ি আন্দোলনের অস্থিরতা এবং তার পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকেও ছুঁতে চেষ্টা করেছে। তবে নাটকটির কেন্দ্রে রয়েছেন নকশালবাড়ি রাজনীতির অন্যতম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব চারু মজুমদার। স্বভাবতই নাটকে তাঁর শৈশব, কৈশোর, যৌবন এমনকি বিবাহ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক জীবন কথাই প্রাধান্য পেয়েছে।

   চারু মজুমদারের রাজনীতি ও আন্দোলন প্রসঙ্গে এসেছে উৎপল দত্ত ও ‘তীর’ নাটকের প্রসঙ্গ। গোড়ায় তিনি নকশালবাড়ি আন্দোলনকে সমর্থন জানালেও সংশোধনবাদী রাজনৈতিক দলেরই অন্যতম প্রচারক ছিলেন। এসেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র তিমিরবরণ সিংহের কথা, যাকে বহরমপুর জেলে পুলিশ নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। শোকাহত কবি শঙ্খ ঘোষ প্রিয় ছাত্রের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, ‘'ময়দান ভারী হয়ে নামে কুয়াশায়/ দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যায় রুটমার্চ/ তার মাঝখানে পথে পড়ে আছে ও কি কৃষ্ণচূড়া?...’ এমনকি, নকশালবাড়ির কৃষক গেরিলাদের সক্রিয় সমর্থন করার জন্য সিপিআই (এম)  থেকে বহিষ্কৃত হয়ে চারু মজুমদারের সঙ্গে যোগ দেওয়া সিপিআই (এমএল)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও কেন্দ্রীয় কমিটি এবং পলিট ব্যুরো সদস্য সুশীতল রায় চৌধুরীর কথাও এসেছে, কিন্তু  আন্দোলনে চারু মজুমদারের অন্যতম সঙ্গী কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল প্রমুখের কথা আসেনি। তবে এই নাটকে চারু মজুমদার ও তাঁর স্ত্রী লীলা মজুমদার সেনগুপ্তর সংসার জীবনকথাটি বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। যে লীলাকে একদা বামপন্থী আন্দোলনে সামিল হওয়ার আহ্বান জানানো হত সেই তিনি সহধর্মিনী হওয়ার পর আন্দোলন কর্মসুচি থেকে বাদ পড়ে যান। কারণ, তখন তাঁকে তিন সন্তান আর অসুস্থ শ্বশুরের সমস্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। কেন তাঁকে নকশাল্বাড়ি রাজনীতি বা পার্টির কাজে ব্রাত্য করে দেওয়া হল? নকশালবাড়ি আন্দোলনের ইতিহাসেও কি লীলা মজুমদার সেভাবে আছেন?  এই প্রশ্নটি এই নাটকের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং অবশ্যই জরুরী।


Scroll to Top