
জলবায়ু সঙ্কট এই সময়ের একটা ক্রমেই বেড়ে চলা সমস্যা। তার প্রভাব নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। শুনতে অবাক লাগলেও বিশেষজ্ঞরা এখন বলছেন, সম্পূর্ণ নতুন একটা কথা। তাদের মতে, লিঙ্গ অসাম্য এখন মিলে যাচ্ছে জলবায়ু সঙ্কটের সঙ্গে। তাদের মতে, এটা ঘটছে সারা পৃথিবী জুড়েই। মেয়েদের জীবন, জীবিকা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা সবকিছুর ওপরই তার ছাপ পড়ছে। রাষ্ট্রসংঘের বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই এখন লিঙ্গসাম্য রক্ষার লড়াইয়েও একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে জলবায়ু সঙ্কট মোটেই “জেন্ডার নিউট্রাল” বা লিঙ্গ নিরপেক্ষ নয়।
মেয়েদের প্রতি হিংসা এমনিতেই বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বে প্রতি তিনজনের একজন মহিলা তাদের জীবদ্দশায় শারীরিক, যৌন এবং মানসিক হিংসার শিকার হন। সংখ্যাটা আদতে আরও বেশি। এদিকে আরেকটা তথ্য জানাচ্ছে, প্রতি সাতজন আক্রান্ত মহিলাদের একজন পুলিশ অথবা ডাক্তারদের কাছে সমস্যাটা জানান। অর্থাৎ প্রকৃত সমস্যাটা আরও ব্যাপক। এই ছোট পরিসংখ্যানটি সমস্যার ব্যাপকতা আরও স্পষ্ট করছে। রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছে ২০২৫ এর ২৩ এপ্রিল।
এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। শুধু ২০২৩ সালেই ৯৩.১ মিলিয়ন মহিলা ভূমিকম্প সহ নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হয়েছিলেন। এর পাশাপাশি ৪২৩ মিলিয়ন মহিলা আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের ঘনিষ্ঠ সঙ্গীদের হাতে। এছাড়াও আমরা দেখছি খরা, বন্যা, মরুকরণ বা ডেসার্টিফিকেশনের একটা প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে মেয়েদের ওপর। আমরা এও দেখছি যে এই চরম প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সময়ে বাড়ছে জোর করে বিয়ে, বাল্যবিবাহ, নারী পাচার এবং যৌন হেনস্থা। তা যেন দুর্বৃত্তদের পৌষ মাস! গ্রামাঞ্চলের প্রান্তিক সম্প্রদায়গুলিতে এই বিপদ আরও বেশি। আদিবাসী সম্প্রদায়ের মহিলা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী মহিলা এবং সাধারণভাবে আমরা যাদের এলজিবিটিকিউ বলে থাকি, তাদের লাঞ্ছনা বাড়ছে।
সোজা কথায় প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা বিপন্নতা বাড়াচ্ছে মেয়েদের। বিপন্ন হচ্ছে তাদের জীবিকা, আশ্রয় এবং সুরক্ষা। নারী সুরক্ষা নিয়ে যেকোন উদ্যোগ বা আলোচনাতে প্রকৃতির ভূমিকা আর উপেক্ষা করা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রসংঘের হিসেব অনুযায়ী বিশ্বে প্রতি ১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমান বাড়া মানে সঙ্গীদের ওপর ৪.৭ শতাংশ যৌন নির্যাতন বাড়া। জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যাগুলির মধ্যে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মেয়েদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং ন্যায় পাওয়ার সমস্যাকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে উষ্ণ প্রবাহের সময় নারী হত্যাও বেড়ে যায়।
দেখা যাচ্ছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় আর্থ-সামাজিক ক্ষমতার একেবারে নিচের তলায় থাকা মহিলা ও কন্যাসন্তানদের বিপন্নতা বেশি। রাষ্ট্রসংঘের স্পটলাইট ইনিশিয়েটিভ এর ২০২৫ এর ২৩ এপ্রিল প্রকাশিত একটি রিপোর্টে জরুরি ভিত্তিতে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ না করলে এই নিগ্রহ আরও বাড়বে। ২০৯০ এর মধ্যে আরও ৪০ মিলিয়ন নারী আইপিভি বা ইন্টিমেট পার্টনার ভায়োলেন্স এর শিকার হবেন। লিঙ্গভিত্তিক হিংসা এমনিতেই এখন বিশ্ব মহামারীর চেহারা নিয়েছে। প্রতি তিনজনের অন্তত একজন মহিলা শারীরিক, যৌন বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা এই সঙ্কট আরও তীব্র করবে। বলে রাখা ভালো, স্পটলাইট ইনিশিয়েটিভ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং রাষ্ট্রসংঘের একটা অংশীদারি উদ্যোগ। মহিলা এবং কন্যাসন্তানদের ওপর হিংসা রুখতে সারা পৃথিবী জুড়ে এরা কাজ করেন। তাদের সাম্প্রতিক রিপোর্টে এই পরিস্থিতিকে বলা হয়েছে “নিগ্রহের শ্যাডো প্যানডেমিক”।
প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার ফলে স্থানান্তর, খাদ্য নিরাপত্তার সমস্যা, সুরক্ষার অভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। তা হয়ে উঠেছে লিঙ্গভিত্তিক হিংসার উৎস। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মহিলাদের মধ্যে এর প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্ট বলছে শুধু ২০২৩ এ ৪২৩ মিলিয়ন নারী এর শিকার হয়েছিলেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পিছিয়ে থাকাদের মধ্যেও পিছিয়ে থাকাদের কণ্ঠস্বর অশ্রুত থেকে যায়। এই সমীক্ষা আপাত সম্পর্কহীন একটা বিষয়ের ওপর আলো ফেলেছে। জলবায়ু সঙ্কটকে মিলিয়েছে মেয়েদের অস্তিত্বের সঙ্কটের সঙ্গে। প্রমাণ করেছে তা মোটেই লিঙ্গ নিরপেক্ষ নয়।