তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
সেটা ছিল প্রবল উত্তেজনাময় একটা দিন


তখন আমি খুব ছোটো। রবিবার বা ছুটির দিন হলেই বাবা তখন আমাকে আর ভাইকে নিয়ে বেড়াতে বেরোতেন। কলকাতা শহরটার অনেক গলিঘুঁজি আমার ওই সময়েই খানিকটা চেনা হয়ে গিয়েছিল। আশেপাশে নানা জায়গাতে তো যেতামই, তাছাড়া যেতাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ময়দান এইসব এলাকায়। ছোটোবেলায় খেলা দেখতে যাওয়ার অভ্যেসও আস্তে আস্তে এভাবেই গড়ে উঠেছিল। এরকম ভাবেই এক বছর মনে আছে পয়লা মে তারিখে বাবার সঙ্গে আমরা গিয়েছিলাম ব্রিগেড এলাকায়, যুক্তফ্রন্টের মিটিং-এ। কলকাতায় আমাদের চেনা পরিচিতের সংখ্যা তখনই দেখেছি বেশ ভালো। অনেক পরিচিত ব্যক্তিও আসতেন এইসব এলাকায় এরকম মিটিং থাকলে। আত্মীয়রাও যেতেন। তো এরকমই সেদিন বিকেলে মনে আছে বাবার সঙ্গে গিয়েছিলাম ব্রিগেডে । পরে শুনেছি সেটা ছিল পয়লা মে। পরে একটু বড়ো হয়ে বুঝতে পারি সালটা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৯। আর কিছুদিন বাদেই কলকাতা রাজনৈতিকভাবে ঘটনাবহুল হয়ে উঠবে। এতটাই ঘটনা বহুল যে, আমাদের বিকেলে এই ঘোরাফেরাও হয়ে পড়বে অনেক সীমিত। পরে বড়ো হয়ে নিজেরা শহরের নানা জায়গায় ঘুরে অনেকই বেড়িয়েছি ঠিকই, কিন্তু সে অনেক পরে। সে সব অন্য গল্প।

সে বছর পয়লা মে দিনটা খুবই ঘটনাবহুল হয়েছিল বলেই সেই দিনটার কথা এত মনে আছে। বিকেলের দিকটায় দুই ভাই বাবার সঙ্গে ব্রিগেড এলাকায় পৌঁছে দেখি গোটা জায়গাটা ভিড়ে একেবারে জমজমাট। তখনই শুনলাম মনুমেন্টের নিচে, যেখানে এই সেদিনও বিভিন্ন বাসের টার্মিনাস ছিল, সেখানেও নাকি একটা ছোটোখাটো মিটিং-এর প্রস্তুতি প্রায় সারা। আর ব্রিগেডে তখন চলছে যুক্তফ্রন্টের জোরদার মিটিং-এর প্রস্তুতি।

যাই হোক, তখন তো অত বুঝতাম না। জোরদার প্রস্তুতি চলছে, এমন সময় আচমকা শোনা গেল নাকি মারামারি আরম্ভ হয়েছে। প্রচুর পুলিশ ছিল। অনেক কম বয়েসী , আমাদের দাদা, কাকাদের বয়েসের লোক ছিল। সবাই খুব উত্তেজিত ছিলেন। যাই হোক, মিটিং শোনা ও দেখা হল। পরে শুনেছিলাম এস এন ব্যানারজি রোড যেটা, সেই রাস্তায় সিপিআইএম আর নতুন পার্টির মিছিল দুটো একসঙ্গে এসে পড়ায় উত্তেজনা চরমে উঠেছিল। সেই থেকে মারামারির সূত্রপাত।

যাই হোক, খুব উত্তেজনার মধ্যে বাড়ি তো ফিরলাম বেশ রাতে। তারপর অনেক দিন ধরে বাবার পরিচিত, যাঁরা আমাদের বাড়িতে আসতেন, তাঁদের মধ্যে একটা আলোচনা বারবার ফিরে আসত শুনতাম : এই যে পার্টি আবারও ভাগ হয়ে গেল, এটা কতটা ঠিক হল। খুব জটিল সেসব আলোচনা তখন আমাদের সেই কলোনি এলাকায় ভালোই ছড়িয়ে পড়েছিল। সেসব শুনতে শুনতে তখনই আবছা বুঝেছিলাম এমন কিছু ঘটনা ঘটছে আশেপাশে, যা আমাদের জীবনে ছাপ ফেলবে। অনেক পরে বুঝেছি আমাদের সেদিনের সেই অভিযান ছিল সত্যিই খুব রোমাঞ্চকর এবং একই সঙ্গে ঐতিহাসিক। আগেই বলেছি, লাল ফেস্টুন আর পতাকায় যুক্তফ্রন্টের মিটিং তো বটেই, শহীদ মিনার এলাকাও রীতিমতো সজ্জিত ছিল। যুক্তফ্রন্টের সভায় ছিলেন, পরে শুনেছি জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্তরা। আর শহীদ মিনারের তলায় একজন বিদেশি অচেনা মানুষের প্রতিকৃতির নিচে আরেকদল অত্যন্ত চোয়াল শক্ত করা মানুষ, যাদের নাম লোকে তখন খুব জোর গলায় বলত না। তবে সেদিন ফেরার সময় অন্য অনেকের মুখে মুখে ফিরছিল শুনেছিলাম একটা নাম : চারু মজুমদার। আর কয়েকটা নামও বারবার উচ্চারিত হচ্ছিল, যার মধ্যে ছিল কানু সান্যাল, অসিত সেন, সত্যানন্দ ভট্টাচার্য ইত্যাদি।

ইতিহাস বলে, ১৯৬৯ এর ওই পয়লা মে তারিখেই শহীদ মিনার চত্বরের মিটিং-এ কানু সানাল সিপিআইএমএল দলের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করেন। এর পরের ইতিহাস ছিল সিপিআইএমএলের নেতৃত্বে ভারত জুড়ে বৃহৎ বৃহৎ সংগ্রামের ইতিহাস। প্রবল উত্তেজনা ছড়ানো অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে তার পরের বছরগুলো । পশ্চিমবঙ্গের বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাস যাঁরা জানেন, সেই ইতিহাস নিয়ে যাঁদের আগ্রহ আছে, তাঁরা ১৯৬৯ এর এই দিনটিকে মনে রাখতে বাধ্য ।


Scroll to Top