
১৯৫৬ থেকে ১৯৮৬। মাত্র তিনটে দশক। আর এই তিনটে দশকেই মাত্র ১১ টি চলচ্চিত্রে ( যার মধ্যে মাত্রই পাঁচটি দৈর্ঘ্যের ছবি তিনি করেছিলেন তার জন্মভূমি রাশিয়ায়, আর দুটি ইটালি এবং একটি সুইডেনে, যেখানে তিনি স্বেচ্ছায় নির্বাচিত জীবন যাপন করেছেন ) তিনি বিশ্ব চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় নিজেকে কেবল পরিচিতই করেননি, নিজের কাজ দিয়ে ওই দুনিয়াটাকে নিজের দিকে চোখ ফেরাতে বাধ্য করেছিলেন। তিনি, আন্দ্রেই আরসেনিয়েভিচ তারকোভোস্কি, যিনি প্রথমাবধি মনে করেছেন চলচ্চিত্র যদি হয় যাকে তিনি বলেছেন স্কাল্পটিং ইন টাইম, তাহলে তাঁর ছবি সেই ভাস্কর্য কর্মের মধ্যে নিহিত অন্তরঙ্গ উচ্চারণ ---- যার মধ্যে অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যৎ এসে মিশে যায় এক কাব্যিক অনুধ্যানে।
১৯৮৩ তে রাশিয়া ছেড়েছিলেন তার্কোভস্কি। গিয়েছিলেন স্বেচ্ছানির্বাসনে। তার আগে পর্যন্ত তারকোভস্কি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি বানিয়েছেন মাত্রই পাঁচটি, এবং এই পাঁচ বছর বেশিরভাগ সময়ে তিনি থেকেছেন বেকার, নয়তো ছাত্র পড়িয়েছেন। এমনকি ছবি বানিয়ে অপেক্ষাতে কাল গুণেছেন বছরের পর বছর। আর তাঁর ছবি যাতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে তার জন্যে রাষ্ট্র চেষ্টা করে গেছে অবিরাম। বিদেশে প্রশংসিত হয়েছে, পুরস্কৃত হয়েছে তাঁর কাজ, কিন্তু তাঁর দেশের দর্শকরা, যাঁদের জন্যে প্রাথমিকভাবে ছবি বানান একজন পরিচালক, তাঁদের কাছেই পৌঁছতে সেসব ছবিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে বছরের পর বছর। মধ্যিখান থেকে সময় কেটে গেছে, গড়িয়ে গেছে। তাঁকে ক্ষোভে ফেটে পড়তে হয়েছে, ‘আমাদের সিনেমাকে নষ্ট করছে আমাদের দেশে সম্মানিত সব উঁচু উঁচু পদে বসে থাকা সেইসব লোক, যারা দুটো কথা গুছিয়ে বলতে অব্দি পারে না।’ বলতে হয়েছে, ‘আমি শুধু কাজ করতে চাই, তার বেশি কিছু নয়।’ আর কাজ বলতে কীরকম সে কাজ ? তারকোভস্কি যাকে বলবেন, ‘নীরব দৃশ্যস্রোতে ভ্রমণ করা’ , তা বাদে আর কী ! এই ভ্রমণের অভিঘাতই সহ্য করতে পেরে ওঠে না বহু মানুষ । তারা সিনেমার পর্দায় পড়ে উঠতে চায় স্রেফ একখানি বই, যেখানে গল্প আছে, চরিত্র আছে, শব্দ আছে,কোলাহল আছে, হয়ত কেন, নৈঃশব্দও আছে অবশ্যই কোনো কোনো জায়গায় , কেবল যেটা নেই তাহল একজন মানুষের উপলব্ধি। তারকোভস্কি এই উপলব্ধিকেই তুলে আনতে চেয়েছেন পর্দায় । একজন চরিত্র কখন , কেন , কী করল, না করে তার উপায় ছিল না সেইটাকেই অনুসরণ করে চরিত্রের মনোগহনে পৌঁছিয়ে দিতে চেয়েছে আমাদের। এই পৌছিয়ে দেওয়ার নামই তিনি কখনো রেখেছেন ‘আন্দ্রেই রুবেলেভ’, কখনো রেখেছেন ‘নস্টালজিয়া’, আবার কখনো ‘দ্য স্যাক্রিফাইস’ বা অন্যকিছু।
তারকোভস্কির এইসব কাজ আর তাঁর জীবন এবং সময় নিয়ে সরকার আশরাফ সম্পাদনা করেছিলেন ‘নিসর্গ’ নামে পত্রিকার একটি সংখ্যা। ও বাংলায় প্রকাশিত হয়েই পত্রিকাটি তুমুল তোলপাড় ফেলেছিল একদা। সম্প্রতি বেরিয়ে ফুরিয়ে যাওয়া সেই সংখ্যাটিকেই এপার বাংলায় বই হিসাবে প্রকাশ করেছে ‘কথকতা’। ৪৫৭ পাতার পরিসরের এই সঙ্কলনের সূচিতে চোখ রাখলে টের পাওয়া যায় কত সুচিন্তিতভাবে একজন আন্দ্রেই তারকোভস্কি নামক ব্যক্তিকে নানা পরিসরের প্রেক্ষিতে ধরতে, বুঝতে চেয়েছেন সম্পাদক, এ বইতে। চেয়েছেন আমাদের ভাবনার নিজস্ব দিগন্তকে আলোকিত করতে, যা না করলে একজন সতত সক্রিয় মানুষ এবং তাঁর কাজকে অন্যের কাছে স্পষ্টত তুলে ধরা কঠিনই কেবল নয়, এককথায় অসম্ভব বললেও কিছুই স্রেফ বলা গেল না বলেই মনে হয়। সম্পাদক যথার্থ বলেছেন, ‘বর্তমান সংখ্যাটিতে প্রায় ৪৩৮ পৃষ্ঠা জুড়ে এত যে কথা তা তো তারকোভস্কি এবং তাঁর চলচ্ছিত্র নিয়েই। তবে এও মনে হয় এক মহাকাব্যিক তারকোভস্কিকে জানার জন্যে এই ৪৩৮টি পৃষ্ঠা কী আর এমন ! তাঁর ছবি তো একবার দেখে পুরোপুরি বুঝে ওঠা ভার ।’ চলচ্চিত্র মানে বিনোদন – এই যদি সত্যিই আপ্তবাক্য হয় তাহলে গড়পড়তা দর্শকের জন্যে তারকোভস্কির ছবি কী এবং কতটুকু, কতখানি তার আন্দাজটুকু মাত্র পেতে চাইবেন যিনি সরকার আশরাফ সম্পাদিত বইটির সূচিপত্রে একবার চোখ রাখাই তাঁর জন্যে যথেষ্ট। আর যিনি তারকোভস্কিকে সত্যিই বুঝতে চাইবেন, তাঁর সীমিতসংখ্যক ছবিগুলির পাশাপাশি ‘কথকতা’ থেকে বেরোনো এই বইটি তাঁর জন্যে আপাতত যথেষ্ট।
আন্দ্রেই তারকোভস্কি : সিনেমা ও অভিমুখ / সম্পা সরকার আশরাফ , কথকতা, ৮০০ টাকা