তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
প্রশ্ন তুলছে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR)

ভোটার তালিকা সংশোধন হবে, সময়ের হাত ধরে। তার পরিবর্তন, সংস্কার এ আর নতুন কথা কী ! স্বাধীনতার পর যখন নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠিত হল তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু সুকুমার সেনের মতো এক বাঙালি গণিত শাস্ত্রবিদকে এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছিল পশ্চিমবঙ্গে। তিনি বিদেশে লেখাপড়াও করেছিলেন। ফলে, উপযুক্ত ব্যক্তি সুকুমার সেন তখন থেকেই পরিসংখ্যান শাস্ত্রকে ব্যবহার করে ভারতের ভোটার তালিকা তৈরিতে প্রথম সচেষ্ট হন। সেই দিন থেকে আজ এই ২০২৫- এর শেষ বেলায় এসে দেখছি, এখনও ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ সময়ের হাত ধরে বারবার হয়ে চলেছে।
এটাই তো স্বাভাবিক।
কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক মুখে বিহারে বা পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশন যখন এই সংশোধনের কাজ শুরু করে তার নাম হয় নিবিড় সংশোধন। আর এই সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হতে না হতেই পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দল বিজেপি সশব্দে প্রচার অভিযান শুরু করে যে, আমরা এবার এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন দিয়ে কোটি কোটি অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশ ফেরত পাঠাব। মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকা থেকে দূর করাটাই যেন এই নিবিড় সংশোধনের প্রধান লক্ষ্য। শুধু তাই নয়, এমন ধারণাও বিজেপি প্রচার করতে চাইছে যে, মৃত ব্যক্তির নাম, নিখোঁজ ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়া মানেই মমতার ভুয়ো ভোটারদের বাদ দেওয়া। ভোটের সময় এমনিতেই ধূলিঝড় এত ওঠে যে অনেক সময় সত্যিকে আর দেখাই যায় না। বাস্তবতা থেকে প্রচারের শক্তি অনেক সময় বেশি হয়ে যায়।
এবার পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ফলাফল কী হবে না হবে হাত গণনার বিষয়। তাতে যাচ্ছি না। ভোটার তালিকার সংশোধনের পর প্রাথমিক তালিকা ঘোষণা হবে এই ডিসেম্বরেই। আর এই ঘোষণা হলেই তার প্রতিক্রিয়া কী হবে আর বিএলওদের কি প্রতিক্রিয়া কী হবে ? তৃণমূল কংগ্রেস শাসকদল, সেখানে তারা নবান্নে সরকারে আছে সেই প্রশাসন এবং দলের কী প্রতিক্রিয়া হবে ? আরও বড়ো রকমের কোনো সংঘাতের পথে তৃণমূল কংগ্রেস যাবে কিনা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে, গেলেও ভোটের আগে যাবে কিনা ? বিজেপিও আবার পাল্টা অভিযানে নেমে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার দিকে এগোবে কিনা ? এই সবই কিন্তু অমীমাংসিত প্রশ্ন।

আপাতত সেইসব প্রশ্নকে দূরে সরিয়ে রেখে আমরা বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে কিছু কথা আলোচনা করতে পারি। যেটা সমস্ত মানুষেরই জানা বিশেষ প্রয়োজন।
The representation of people act 1950.বা জনগণের প্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫০ কী সেটা প্রথম জানা প্রয়োজন। এই আইনের ১৬ ধারাতেই পরিস্কার ভাষায় বলা আছে, যে কোনো ব্যক্তিকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে যদি :
প্রথমত,যদি তিনি ভারতের নাগরিক না হন।
দ্বিতীয়ত, উপযুক্ত আদালত zodi ঘোষণা করেন তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন কোনো ব্যক্তি।
আর তৃতীয়ত, নির্বাচনের সঙ্গে সম্পৃক্ত দুর্নীতি বা অন্য কোনো অপরাধ নিয়ে বা অন্য কোনো আইনের বিধানে যদি তাঁকে ভোটদান থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয় তাহলে তার নামও ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে। ভোটাধিকার তার থাকবে না।
এই আইনের ১৯ নম্বর ধারায় পরিষ্কার ভাবে বলা আছে যে, আঠেরো বছর বা তার বেশি বয়সী প্রত্যেক ব্যক্তি সাধারণভাবে একটা নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা । ভোটার হিসেবেই কিন্তু তাঁকে নথিভুক্ত করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় যে পদ্ধতিগত কিছু ত্রুটি হচ্ছে সেগুলো নাগরিক সমাজের অসাংবিধানিক বলে মনে হচ্ছে। এই ত্রুটিগুলো নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস শাসকদল হিসাবে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে।
প্রথম পদ্ধতিগত ত্রুটি হল, নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে সমস্ত বিদ্যমান ভোটারদের বিবরণকে সংশোধন করা। ২০০২ সালের নির্বাচনী রোলকে বেঞ্চমার্ক করা হয়েছিল। ম্যাচিং, ম্যাপিং প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর(SIR)-এর চতুর্থ যে পর্যায় সেখানে ভারতের নির্বাচন কমিশন দ্বারা একটা এসআইআরের গণনা ফর্মগুলো ডিজিটালাইজেশন করা প্রয়োজন এটা উপলব্ধি হয়েছিল। ভোটার তালিকায় বাদ দেওয়ার জন্য প্রায় সত্তর লাখের বেশি নাম চিহ্নিত করা আপাতত হয়েছে। পশ্চিমবাংলার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারের কার্যালয় থেকে আরও জানা গেছে, সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, এই বাদ যাওয়া নামগুলোর মধ্যে পঁচিশ লক্ষের বেশি মৃত ভোটার। তারপরে স্থানান্তরিত ভোটারের সংখ্যা রয়েছে কুড়ি লক্ষের বেশি। তাহলে নিখোঁজ ভোটারদের সংখ্যা সাত লক্ষেরও বেশি হলে বাকিরা নকল ভোটার বা অন্যান্য ভাবে মুছে ফেলার জন্য চিহ্নিত ভোটার।

১৬ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর তালিকা থেকে কে বাদ গেল আর কে বাদ গেল না সেগুলো চুড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার কাজ শুরু হবে। যা গণনা ফর্ম জারি, শুনানি, যাচাইকরণ এইসমস্ত সিদ্ধান্ত এবং দাবি, আপত্তি, নিষ্পত্তির জন্য ১৬ ডিসেম্বর থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ২০২৬-এর ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচনী নিবন্ধন যে কর্মকর্তা যাকে ইআরও বলা হয় তাদের মাধ্যমে সবটা করে ফেলা হবে।
তাহলে ভোটার তালিকার বিভিন্ন মাপকাঠিটা পরীক্ষা করা, চুড়ান্ত প্রকাশের জন্য নির্বাচন কমিশনের অনুমতি নেওয়াটা হবে ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। ভোটার তালিকার চুড়ান্ত প্রকাশ হবে ১৪ ফেব্রুয়ারি। যেটা আগে ৭ ফেব্রুয়ারি ঠিক করা হয়েছিল। ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ভোটার তালিকা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটার সংখ্যা ৭,৬৬,৩৭,৫২৯ জন। এই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের আরও জটিল এবং আরও অনেক রকমের প্রক্রিয়ার মধ্যে ফেলা হবে এবং প্রশাসনিক ভাবে তখন চিহ্নিত করে আবার একটা খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হবে। এআরও তখন বিজ্ঞপ্তিও জারি করতে পারবেন।
এখন আইনের সহায়তা কি পাবেন না ? নিশ্চয়ই পাবেন। আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণকারী ব্যাক্তিরা আইনি পরিসেবা কতৃপক্ষ আইন- ১৯৮৭-কে অনুসরণ করতে পারেন। এই আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন করা যায়। জাতীয় আইনি পরিষেবা (NALSA) সেটারও সাহায্য নেওয়া হবে। চারটে বিষয় জানানো বিশেষ ভাবে প্রয়োজন।
প্রথমত, অনলাইন আবেদন সংশোধনের জন্য আপনি করতে পারেন। অনলাইন আবেদন লিঙ্কটা ব্যবহার করতে হবে। NALSA-র ওয়েবসাইটের অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে সেই আবেদন করতে হবে। nalsa-dla@nic.in এই ঠিকানায় ইমেইল করতে পারবেন। জরুরি ভিত্তিক সহায়তার জন্য NALSA-র টোল ফ্রি হেল্পলাইন নম্বর হচ্ছে -:১৫১০০। এখানে কল করে কোনো প্যানেল আইনজীবীর সাহায্য নিতে পারেন। এটা কিন্তু আইনগত ভাবে এটা বলা আছে। তার সুযোগ মানুষ নিতে পারে।
দ্বিতীয়ত, মৌখিক আবেদনও আপনি করতে পারেন। ধরুন আপনি ফর্ম ফিলাপ করতে পারেন না। তখন ফ্রন্টঅফিসের কোনো কর্মকর্তা বা যাদের প্যারালিগাল স্বেচ্ছাসেবক বলা হয়(পিএলভি) তারা আপনাকে ফর্মটা পূর্ণ করে দিতে পারবে। অফিসে যে ফর্ম পাবেন সেটাতেও আপনি নাম, ঠিকানা, মামলার ধরন, আপনার আয়ের প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য লিখে সশরীরে গিয়ে অথবা ডাকযোগেও এই আবেদন করতে পারবেন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, অফলাইন আবেদন নিকটতম আইনি পরিষেবা কতৃর্পক্ষের অফিসে গিয়ে আপনি করুন। যেরকম TLSC অর্থাৎ তালুক আইনি পরিষেবা কমিটি, জেলা আইনি পরিষেবা (DLSA) কিংবা (SLSA) রাজ্য আইনি পরিষেবা বা কতৃর্পক্ষ --- এদের কাছ থেকেও আপনি কোনো সমস্যা হলে সহায়তা নিতে পারেন।
এই এসআইআর (SIR)করতে গিয়ে কার লাভ কার লোকসান এই আলোচনায় না গিয়েও বলতে পারি যেভাবে বিজেপি রাজনৈতিক ভাবে এটা থেকে ফয়দা নেওয়ার কথা ভেবেছিল তাতে কতগুলো সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেই সমস্যাগুলো কী কী সেটাও আলোচনা করা যেতে পারে।
বিহারে এসআইআর (SIR) সফল হয়েছে। তার কারণ বিহারে শাসকদল বিজেপি তথা জেডিইউ নেতৃত্ব। নীতিশ কুমার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। বিজেপি প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। পশ্চিমবঙ্গে প্রশাসনটি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে। ফলে, যখন এসআইআর (SIR) অর্থাৎ ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নির্বাচন কমিশনকে বাস্তবায়িত করতে হবে তখন সেটা রাজ্য নির্বাচন আধিকারিকদের মাধ্যমে করলেও সেই রাজ্য নির্বাচন আধিকারিক দপ্তরটি কিন্তু রাজ্য প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে অনেকটাই থাকবে। রাজ্য প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও নির্বাচন কমিশনকে পুলিশ এবং জেলা প্রশাসনের মাধ্যমেই তো কাজ করতে হয়। ফলে, যা ইচ্ছে তাই করার যে স্বেচ্ছাচারিতা সেটা পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়।

দ্বিতীয়ত, উত্তরবঙ্গেই এর আগের ভোটে বিজেপি ভোটে বেশ ভালো ফল করেছিল। সেখানে সাতাত্তরটি বিধায়ক হয়েছিল। সেই উত্তরবঙ্গই বাংলাদেশের সীমান্ত। সেই বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশীদের তাড়ানো হবে বলে হুঙ্কার দিয়েছেন বিজেপি নেতারা। এখন এই সীমান্তবর্তী জেলাগুলো যদি ধরা যায় কোচবিহার থেকে বনগাঁ পর্যন্ত তাহলে এই জায়গাগুলোতে শুধু মুসলমানরাই নয়, সেখানে হিন্দুরাও আছে। ফলে, ভোটার তালিকা থেকে যে বাদ যাচ্ছে সেটাতে যত মুসলমান বাদ যাচ্ছে সেইভাবে অনেক হিন্দুরাও বাদ যাচ্ছে। এর ফলে মতুয়া, রাজবংশী,তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি, ওবিসি নানান সম্প্রদায় তাদের বহু ভোটারের নাম বাদ গেছে। প্রশাসনিক জটিলতা এবং প্রক্রিয়ার জটিলতায় অনেকটাই নাম বাদ গেছে। এই বাদ যাওয়া নামগুলোর সবাই কি তৃণমূলের সমর্থক? এখানে বিজেপি ভোটাররাও, বিশেষ করে যেসব এলাকায় বিজেপি জিতেছিল সেখানে অনেক বিজেপি ভোটারও বাদ যাচ্ছে। ফলে মতুয়াদের বিরাট সমস্যা হয়ে গেছে। মতুয়ারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছেন যে প্রধানমন্ত্রীকে ২০ ডিসেম্বর আসতে হচ্ছে শুধুমাত্র মতুয়াদের কাছে গিয়ে জনসভা করবেন বলে, যে জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বোঝাবেন, যে মতুয়াদের কোনো ভয় নেই।
তাহলে এই সমস্যাগুলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সৃষ্টি করেননি। বিজেপির তরফে এক করতে গিয়ে আরেক হয়ে গেছে। শিব গড়তে গিয়ে বাঁদর হয়ে গেছে। এখন এই পরিস্থিতিতে এসআইআর (SIR)টা নির্বাচনের প্রচারের একটা হাতিয়ার হতে পারে যে, আমরা অনুপ্রবেশকারীদের তাড়াতে চাই, আমরা বাংলাদেশের সমস্ত মুসলমানদেরকে পাঠিয়ে দিতে চাই। এটা বলার ফলে একটা ধর্মীয় রাজনৈতিক মেরুকরণে বিজেপি রূপান্তরিত করতে চাইছে। কিন্তু ভোটার তালিকার ক্ষেত্রে এসআইআর (SIR) যে উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল সেটা যে এখন খুব বেশি কাজ দিচ্ছে তা নয়। সেই কারণেই এসআইআর (SIR) নিয়ে আর বেশি সময় বিলম্ব না করে বিজেপি রাজনৈতিক ভাবে এসআইআর (SIR)-এর জায়গায় মুর্শিদাবাদের বাবরি মসজিদ গঠনের ব্যাপারে যে হুমায়ূন কবীরের রাজনৈতিক প্লান সেইসব নিয়ে প্রচারে বেশি করে নেমে পড়েছে।


Scroll to Top