ইন্দো সিথিয়ান ভোট্টিদের শতদ্রুর দক্ষিণ দিকে বিতাড়িত করে যদুপতি গজ কাশ্মীর রাজাকে পরাস্ত করে রাজকন্যাকে বিয়ে করলেন। যদুপতি গজের পুত্র শালিবাহন পাঞ্জাবের পুরো অঞ্চলটা দখল করে নেন। পরে গজনী দখল করে পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। বড়ো ছেলে বালান্দকে গজনীতে রেখে পাঞ্জাবে ফিরে আসার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। শালিবাহনের সাত পুত্র, বড়ো জন ভোট্টি, দ্বিতীয় পুত্রের নাম ভূপতি, ভূপতি পুত্র চাকিত মুসলমান হয়ে বালুচ বোখারার রাজা হলেন। ভোট্টির বংশধরেরা জয়সলমীরের শাসনভার নিল। জয়সলমেরের রাওল অভিষেকের সময় যোগীর বেশ ধারণ করে।
শালিবাহনের তৃতীয় পুরুষ মঙ্গল রাও এবং তার নাতি কেহর প্রথম ভোট্টি রাজপুত, যারা জয়সলমেরের কাছের এলাকা দখল করেছিল। জয়সলমের থেকে একশত কুড়ি কিলোমিটার দূরে তান্নু দেবীর স্মরণে তান্নু দুর্গ স্থাপিত হয় অষ্টম শতাব্দীতে। সেই ভোট্টিদের প্রথম রাজধানী। কেহর একটা ডাকাত দল তৈরি করেছিল। এরা উট ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিত এবং ক্যারাভানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। মরুভূমি এলাকায় ষষ্ঠ শতাব্দীর কিছু মন্দির খুঁজে পাওয়া যায়।
তখন থেকেই এই এলাকা ভূতের দেশ বলে গণ্য। ভূতেশ্বর মহাদেব আছেন বৈশাখীতে --- সেও আবার অষ্টম শতাব্দীর নিদর্শন। বালির ঝড়ের আঘাতে আঘাতে এই মন্দিরে কারুকার্য অনেকটাই অদৃশ্য। যদিও কেন জানি মনে হয় এই মন্দির বহু প্রাচীন। দশম শতাব্দীর আগে পর্যন্ত রাজধানী ছিল কাক নদীর তীরে লোদ্রবা বা লুধরবায়। মুমালের প্রেমের আখ্যান পারমার রাজপুতদের রাজত্বের সময়কার কথা।
উত্তর পশ্চিমের এই অঞ্চলটায় মুসলমানদের আক্রমণের আগে কারা রাজত্ব করত, লুধরবার মুমাল ও মহেন্দ্র প্রেম কাহিনি তার কিছুটা আভাস দেয়। নটী মুমাল ছিল অপূর্ব সুন্দরী। তার সৌন্দর্যের খ্যাতি নানা রাজমহলে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রত্যেক রাজাই তাই নিজের সামর্থ্য অনুসারে সর্বস্ব পণ করে মুমালকে প্রেম নিবেদনে ত্রুটি করেনি। নটীর হৃদয় পাওয়ার জন্য তাদের চেষ্টার সীমা ছিল না বলেই মুমালের দিনগুলি রঙিন হয়ে উঠেছিল। কারা কারা এই প্রেমিকদের দলে নাম লিখেছিল তার একটা লিস্ট করে রেখেছে বশিষ্ঠ। গুজরাটের শোলাঙ্কি রাজা সালহা, কচ্ছের রাও হামির জারেছা এবং অমরকোটের মহেন্দ্র বিশালট। এক একজনের রাজ দরবারের চমক দেখলে চমকে যেতে হয়। কিন্তু প্রেম নিবেদনের ব্যাপারে সবাই সাম্যবাদী।
বিদ্যাপতি যেমন বলেছেন, অঙ্গনে আওব যব রসিয়া, মুমাল সব রানাদের খুশি রাখত ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসত শুধু অমরকোটের রানাকে। সহায় সম্বল ও পরাক্রমে যিনি এদের মধ্যে বোধহয় সবচেয়ে খাটো ছিলেন । পরাক্রম তো শুধু ঐশ্বর্য্য নয়, সাহসও। অমরকোটের রানা যে ধরনের প্রেম নিবেদন করেছেন তা সচরাচর দেখা যায় না বলে সেই প্রেমাখ্যান রাজস্থানে অমর হয়ে রয়েছে। অমরকোটের পথে বেরুতে তখন কেউ সাহস করত না। বেরোলেই মরণ ----- এমন ফাঁদের রাস্তা। তবু এই মরুপথে জ্যোৎস্নার আলো যখন পড়ে সমস্ত দুনিয়াটা মায়াময় হয়ে উঠত, অমরকোটের রানা তখন সেই মায়াবী আলোতে মুমালের কথা ভেবে অধীর হয়ে উঠতেন। এক উটিনীর পিঠে চেপে অমরকোটের ওই দুর্লঙ্ঘ্য পথ রোজ অতিক্রম করে লুধরবায় যেতেন মুমালকে দেখতে,তাঁর সঙ্গে প্রেমালাপ করতে। জোৎস্না রাতে পথটা অতিক্রম করা তবু হয়ত অতটা কষ্টকর হত না, কিন্তু অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে কীভাবে এ পথ পেরোতেন সেটাই এই প্রেমোপাখ্যানের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক।
এর পর আগামী সংখ্যায়