তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
রঙে রেখায় রাজপুতানা

  

   

রাজস্থানের ইতিহাস ঘাঁটতে বসলে মনে হয় বিশেষ একটা অবস্থা ও পরিবেশের সম্মুখীন হয়ে ক্কচিৎ-কখনো মানুষ হয়ত বীরত্ব দেখায়, কিন্তু জীবন নিয়ে তাকে চলতে হয়। তাই জীবনবোধেই মানুষ আবিষ্কার করে জীবনগাথা। এই আবিষ্কারের কাজটা শক্ত, কারণ এককালে রাজস্থানের বীরত্বকেই শুধু তুলে ধরা হয়েছিল, কিন্তু রাজস্থানী ইতিহাসের মধ্যে যেখানে ফাঁক-ফোঁকর আছে সেই শূন্যস্থানগুলো লোকগাথার রঙ দিয়ে ভরাট করার প্রয়াসও হয়নি। প্রবীণ ঔপন্যাসিক আদিত্য সেনের কলমে এই ধারাবাহিক উপন্যাস সেই প্রয়াসেরই অংশ। এ উপন্যাসের প্রথম পাঁচটি অধ্যায় ‘বাংলা স্ট্রিট অনলাইন’-এ ধারাহিক প্রকাশিত হয়েছে। অনিবার্য কারণে কিছু সাময়িক ছেদ পড়ে যাবার পর উপন্যাসটি ফের প্রকাশ করা শুরু হল  

ছয়

জয়সলমের-এর অতি বৃদ্ধ মানুষও গড়গড়ায় টান দিয়ে আক্ষেপের স্বরে বলে, এ যা দেখছেন সাব, এই মরুদেশ যোধপুর বিকানের সমুদ্রেরই একটা অংশ ছিল। কার অভিশাপে সব কিছু মরুভূমি হয়ে গেল, সে গল্প জানেন তো ! রাম যখন লঙ্কা জয়ের জন্য সমুদ্রের কাছে গেছেন, প্রথমে সমুদ্র তো কিছুতেই পথ ছাড়বে না। অনেকবার অনুনয় বিনয়ের পরেও যখন কাজ হল না, তখন ব্রহ্মাস্ত্র ওঠালেন। ভয়ে জবুথবু হয়ে সমুদ্র রামকে কৃতাঞ্জলি হয়ে বলল, আহা ওটি কী করেন, ওটি করবেন না। আমি কথা দিচ্ছি, আমাকে যা করতে বলবেন, আমি তা নিঃশব্দে করব। রামের তখন মহা মুশকিল , রাগ যখন পড়ে গেছে তখন ব্রহ্মাস্ত্র তার ওপর নিক্ষেপ করার কোনো অর্থই হয় না। রাম সমুদ্রকেই জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তো দেখছি মহা বিপদে ফেললে আমাকে , এই ব্রহ্মাস্ত্র এখন আমি কোথায় ফেলি ? সমুদ্র উত্তর দিল , উত্তরে  দ্রুমকুল্য নামে একটি জায়গা আছে। সেখানে আভীর নামে সব কদাকার উগ্র স্বভাব দস্যুরা আমার জল খায়। ওইদিকে লক্ষ্য করেই আপনি ওই ব্রহ্মাস্ত্রটা ছাড়ুন। সেই ব্রহ্মাস্ত্রের অভিশাপেই এই দশা। এক মুহূর্তে সব শুকিয়ে গেল, খাঁ খাঁ করতে লাগল । এই সেই অঞ্চল, মরুকান্তার। রামায়ণে গল্পটা আছে, খুঁজলে ঠিক পাবেন।

   বশিষ্ঠ ভাবে, মানুষের কল্পনা শক্তি কত বড়ো ক্যানভাস । তাতে আলো ফেলে , ছায়া খেলে। সব মানুষই যেন রেমব্রাঁ-র আঁকা ছবি ; সবকিছুর মধ্যে শুধু মুখটা আলোয় উদ্ভাসিত ফ্লাড লাইটকে যেন অদৃশ্যভাবে ছড়িয়ে দিয়েছে মুখে, ছায়াটা আশেপাশে কোথাও আছে। অনাদরে নয়, আলো থাকলেই সে তির্যক রেখা টেনে আনে। কোথায় সে থাকে জানলেই তো আলো নিয়ে অত খেলা করা যায় !  রামায়ণে খুঁজলে পাবেন ব্রহ্মাস্তে অভিশাপে এই জায়গাটা রাতারাতি মরুভূমি হয়ে গেছে ভাবলে বড় আশ্চর্য লাগে। জয়সলমেরের প্রকৃতিগত রূপও তাই ; তার জন্য কোন বয়স বলে ব্যাপার নেই। বশিষ্ঠ আজ যে দৃশ্য দেখে, অতীতেও যেন তার শত শাখায় একই দৃশ্য। যেন যা দেখছে এখন সেটাই ছবি। বালিয়াড়ি ধূসর দিগন্তের ক্যানভাসে কে যেন অনবরত হরিদ্রাভ ওয়াশ দিয়ে যাচ্ছে।

  প্রমাণ ছাড়াই যখন এ পৃথিবীটা চলবে কিংবা চলছে, তখন তোমরাই বা অত প্রমাণ তত্ত্বের ধার ধারো কেন ! কার তাতে লাভ হয় ! তাছাড়া আজ যা ভাবি সেটাই তো একদিন প্রমাণিত হয়। হঠাৎ এক আলোর ঝলকের মতো দেখেন সেটাই একদিন প্রমাণ করে ছাড়েন। এই বিশ্বাসেরও দাম আছে। পুরনো ও নতুন প্রস্তর যুগের অন্তর্বর্তী  সময়ে জয়সলমেরে জুরাসিক কালের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। সেই একশো পঁচানব্বই মিলিয়ন থেকে একশো পঁয়ত্রিশ মিলিয়ন বছর আগের কথা। এই জুরাসিক কালের চুনাপাথর বালু পাথর প্লেটের মতো কোমল পাথর জয়সলমেরের  মরুভূমির বালির মধ্যে খুঁজলে এখনো পাওয়া যায়। দেখলেই মনে হয় সমুদ্রের গহ্বরে  এর জন্ম। মরুভূমির চারপাশে কত না জীবাশ্ম পাথর ছড়ানো পড়ে থাকে। সমুদ্রের প্রকৃতি বিজ্ঞান অনুশীলনের পক্ষে এসব অমূল্য সম্পদ।

জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া এইতো সেদিন যোধা অকাল- এ ৫০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে নানা বৃক্ষ জীবাশ্মের খোঁজ পেয়েছে। গাছের গুড়ি ৫০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে ---- পর্বতশিলার মতো দেখতে। কিন্তু কিছু কিছু গাছের মাথায় এখনো ফুল ফোটে। এসব জায়গায় ঘুরে বেড়ালে বশিষ্ঠের কেমন যেন একটা অনুভূতি হয় ; সারাক্ষণ আঁকতে ইচ্ছে করে । মায়াকোভস্কির মতো বলতে ইচ্ছে করে, প্রিয়তমা আরেকটু অপেক্ষা কর ---- সারাদিন লিখতে লিখতে আমার আঙুলগুলো ফুলে-টুলে ঢোল হয়ে গেছে, লেখাটা শেষ করেই আমি তোমার কাছে আসছি ---- বিদায়। জীবাশ্ম সময়ের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে হাসে, বলে, আমাকে আঁকো, কী, আঁকতে পারবে ? বশিষ্ঠ অনেক সময় অনেক কিছু মনের পটে এঁকে নেয়, পরে বাড়িতে গিয়ে সেই রেখাগুলির ওপর রং চড়ায় ; কুমোর যেমন প্রতিমার মুখে রঙ দেয় , চোখের দৃষ্টি ফোটায়। এই জীবাশ্মগুলির বয়স নাকি ১ লক্ষ ৭৫ হাজার বছর। তারপর থেকে বশিষ্ঠ  কতবার জন্ম নিয়েছে কে জানে। বশিষ্ঠ শুনেছে সবচেয়ে বড় গাছ লম্বায় ৮ মিটার প্রস্থে দুই মিটার।

  মানুষের বিশ্বাস কত বড়ো রঙের আধার। একটা কিছু করে সে ছাড়বেই। নয়তো রং মেখে হাসবে। এইতো জয়সলমের-এর লোকগুলোর এই অন্ধ বিশ্বাস কেউ কি উড়িয়ে দিতে পারল ? এতদিন পরে কিছু কিছু প্রমাণ তো পাওয়া যাচ্ছে। বশিষ্ঠ ভাবে, প্রমাণ না হয় হল যে এই মরু স্থল একদিন সমুদ্রের অংশ ছিল। তাতে কি এখানকার লোকগুলি সমুদ্রের নোনা জলে হাজার বছরের তৃষ্ণা মেটাতে পারত ? সমুদ্রের অস্তিত্ব প্রমাণ হলে মূল দেশের সৌন্দর্য যেন আরও বেড়ে যায়, যেন বলা যায়, জয়সলমের-এর কত আভিজাত্য, তোমরা এসে একবার দেখো। মানুষের মন কত বড়ো, মরুভূমি কিংবা বিকানের-এর বালির সমুদ্র যেন।

সমুদ্র ছাড়াই তো জয়সালমের-এর মুখটাকে ফসিলের মতো লাগে। মহারাওলের প্রাসাদের আশেপাশে লোকজনের বসতি; সেখানে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকলেই বশিষ্ঠ আঁচ করতে পারে যেন ফসিলের এক একটা বৃক্ষ। খাটিয়ায় বসে গড়গড়া টানছে বৃদ্ধ কিংবা যুবক। গরুগুলো রাস্তা আগলে ঝিমুচ্ছে। মেয়ে-বউরা ঘোমটা টেনে কাপড় কাচে। সময়টা কোথাও যেন প্রবহমান নয়। মাঝে মাঝে ঘড়িগুলো যেন গলে গলে পড়ে যায়, যেন সালভাদর দালির গলে যাওয়া সময়। অতীত  নেই, ভবিষ্যৎ নেই। প্রাগৈতিহাসিক অদ্ভুত একটা স্বপ্নালোকিত অবস্থা। মাছ যেমন বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে জলের ওপর ভেসে ওঠে, মাঝে মাঝে এই লোকগুলো যেন বর্তমানের বুকে নিঃশ্বাস নিতে শুধু একবার তাকিয়ে দেখে, তারপর নেশার ঘোরে আবার ডুব দেয় অতীতে। অত ডুব দিয়ে কী যে  রত্ন ওরা তুলে আনে, ওরাই জানে ! জয়সলমের-এ ১৬ হাজারের মতো লোক; অত কম লোকের পক্ষে বর্তমানের ফ্রেমে আঁটা আধুনিক মানুষ হয়ে ওঠাও তো মুশকিল।

                                                                   এরপর আগামী সংখ্যায়


Scroll to Top