
খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে ঠাকুরবাড়ির নামডাক চিরকাল। রবীন্দ্রনাথও নিত্যনতুন রান্নাবান্না নিয়ে রীতিমত উৎসাহী ছিলেন। ঠাকুরবাড়ির মেয়ে বৌরা একদিকে যেমন লেখাপড়া, গানবাজনা, সেলাই চর্চা করতেন, অন্যদিকে তেমন রান্না শিখতেই হত তাঁদের । রবীন্দ্রনাথের ভাইঝি
প্রজ্ঞাসুন্দরীর এবিষয়ে বিশেষ উৎসাহ ছিল।রবীন্দ্রনাথের দাদা হেমেন্দ্রনাথের মেজো মেয়ে শুধু যে ভাল রাঁধুনি ছিলেন তাই নয়, নিরামিষ ও আমিষ রান্না নিয়ে তাঁর একাধিক বই আসলে গার্হস্থ্য বিজ্ঞানের অনবদ্য আকর। শয়ে শয়ে পদ তিনি নিজে হাতে রেঁধে তবেই তার প্রণালী লিখেছেন 'আমিষ ও নিরামিষ আহার' -এর তিনটি খন্ডে। গভীর গবেষণার ফসল ভূমিকায় রয়েছে পুরাকালে দেবতা ও ঋষিদের খাদ্যাভ্যাস থেকে ঊনিশ শতকে বাঙালির রসনাতৃপ্তির আখ্যান পর্যন্ত দীর্ঘ বিবরণ। সেই সঙ্গে জানিয়েছেন রান্নাঘর সাফসুতরো রাখার পদ্ধতি থেকে দাসদাসী চালনার কৌশল পর্যন্ত।
প্রজ্ঞাসুন্দরী লিখছেন, 'এ দেশে কোন বিষয়ে একটা শৃঙ্খলা ও পারিপাট্য নাই। আমাদের ঘরেও এই বাঙ্গালী চরিত্র বিশেষরূপে পরিলক্ষিত হয়। আমাদের ভোজে মাছের সঙ্গে ক্ষীরের সঙ্গে যেন একটা হ-য-ব-র-লৎব্যাপার হইয়া উঠে; এইরূপ আহার যেমন শাস্ত্রবিরুদ্ধ তেমনি স্বাস্থ্যবিরুদ্ধ। এই বিশৃঙ্খলা হইতে উদ্ধার করিয়া বাঙ্গালা খাবারকে শৃঙ্খলার সূত্রে আবদ্ধ করা আমার একটী প্রধান লক্ষ্য। এরূপ না করিলে বাঙ্গালা খাবারের মেরুদন্ড কোন কালেই গঠিত হইতে পারিবে না।' (বানান অপরিবর্তিত)
প্রজ্ঞাসুন্দরীর বই এখন দুষ্প্রাপ্য। ঠাকুরবাড়ির এক কন্যার সংগ্রহ থেকে তা পড়ার সৌভাগ্য হল এবং বলা বাহুল্য, চমৎকৃত হলাম। তাঁর বিয়ে হয়েছিল প্রখ্যাত অসমিয়া সাহিত্যিক লক্ষীনাথ বেজবড়ুয়ার সঙ্গে। সুখী গৃহকোণ তাঁকে আরো উৎসাহ জুগিয়েছিল রান্না নিয়ে সিরিয়াস কাজ করতে। আজকের গৃহিণীরা তো দূরের কথা, সেকালের গৃহিণীরাও কি জানতেন রান্নাঘরের নানা গুপ্ত কথা? আদার রসে হিং ভিজিয়ে সেই গোলা নিরামিষ তরকারিতে দিলে পেঁয়াজের গন্ধ হয় কিংবা রান্না ধরে গেলে কয়েকটি পানপাতা ফেলে দিলে পোড়া গন্ধ কমে যায়। বাংলায় মেনু কার্ড চালু করেছিলেন প্রজ্ঞাসুন্দরী, তাঁর ভাষায় 'ক্রমণী'। পদের নামকরণেও তাঁকে টেক্কা দেওয়া মুশকিল। যেমন, 'রামমোহন দোল্মা পোলাও' বা 'দ্বারকানাথ ফির্নি পোলাও'। অদ্ভুত কিছু পদও আছে- লঙ্কা পাতার চড়চড়ি, রসগোল্লার অম্বল, পেঁয়াজের পরমান্ন। তবে এর পাশাপাশি সাধারণ বাঙালি ঘরের রান্নাও পরিপাটি করে লিখে রেখেছেন প্রজ্ঞাসুন্দরী। তার মধ্যে যেমন রয়েছে পোস্তদানার আমষোল, তেমনি রয়েছে মিঠা চাউল।
বইয়ের তৃতীয় সংস্করণ বেরিয়েছে বাংলা ১৩৬৩ সালে। কোনো উৎসাহী প্রকাশক যদি প্রজ্ঞাসুন্দরীর বই পুনঃপ্রকাশ করতে এগিয়ে আসেন, বাংলার সামাজিক ইতিহাসের একটা অধ্যায় আলোয় ফিরবে।