তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
শীতের আমেজ কমছে দূষণে   

শহরে ক্ষণস্থায়ী শীতের জন্য আগে মানুষের প্রতীক্ষা ছিল। এখন সেই প্রতীক্ষা বদলে গেছে আতঙ্কে। এটা ঘটনা যে, গতবছর কলকাতায় বায়ুদূষণ একটু কমেছে। তবুও বায়ুদূষণের নিরিখে আমাদের শহর মোটেই পিছিয়ে নেই। সাধারণভাবে যেটা বলা যায়, শীতের শুকনো এবং শীতল আবহাওয়ার কারণে বায়ু চলাচল কমে যাওয়া, যানবাহন, শীতের মরশুমে নির্মাণ এবং শিল্প থেকে তৈরি হওয়া ধুলো এবং ধোঁয়া বাড়া এর একটা বড়ো কারণ। এর পাশাপাশি শহর সংলগ্ন এলাকার ইটভাটা এবং কলকারখানা তো সারা বছর শহরে দূষণ ঘটিয়েই চলেছে। এই দূষণের কারণে বাড়ে হাঁপানি, ফুসফুসের ক্যানসার এবং হৃদরোগ। উত্তরে হাওয়ায় তা আরও বাড়ে। গাড়ির ধোঁয়া, পুরনো গাড়ির ব্যবহার বন্ধ না করা, নির্মাণ কাজে দূষণ সংক্রান্ত নিয়ম ভাঙা, সিঙ্গল ইউজ প্লাস্টিকের ব্যবহার শহরের দূষণ পরিস্থিতি আরও জটিল করছে।

লাভের গুড় পিঁপড়ে খেয়ে যাওয়ার মতো শহরে শীতের উপভোগ্যতা দূষণের কারণে অনেকটা ম্রিয়মাণ। এমনিতেই ঠান্ডা ও শুকনো বাতাস দূষণকে দীর্ঘায়িত করে। স্বাভাবিক কারণেই কলকাতায় তাই শীতে দূষণ বাড়ে। এটাই আমার আপনার মতো সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা। দূষণকারী পদার্থগুলির সঙ্গে সঙ্গত করে গাড়ির ধোঁয়া এবং নির্মাণ প্রকল্পগুলির থেকে ধুলো। এই ধোঁয়া এবং ধুলো কম করার প্রচেষ্টা প্রায় নেই বললেই চলে।

শহরতলী থেকে আসা দূষিত উত্তুরে বাতাস পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। যে ঋতু সত্যিই উপভোগ্য হওয়ার কথা ছিল, বায়ুদূষণে তা হয়ে উঠেছে বিপজ্জনক! শহরে দূষণ ঠেকাতে একটা বড়ো ভরসার জায়গা ছিল পূর্ব কলকাতার জলাভূমি। তা ছিল শহরের কিডনি। প্রবল নির্মাণ যজ্ঞে দিনের পর দিন তার আয়তন যে কমেই চলেছে, এ তো আমরা চোখের ওপরেই দেখছি। অন্যদিকে চোখে পড়ার মতো বাড়ছে প্লাস্টিক ও ইলেকট্রনিক বর্জ্য। এসব কিছুরই মিলিত যোগফল দূষণ বাড়িয়েই চলেছে।

শহরে অবৈধ নির্মাণ দূষণ বাড়ার একটা বড়ো কারণ। এই নির্মাণ যজ্ঞের পুরোহিতরা দূষণ ছাড়া বাকি সব বিষয়েই সচেতন। একদা শহরে শীত মানেই ছিল উপভোগ্য এক ঋতু। দূষণক্লান্ত নাগরিকরা তা যেন ভুলতে বসেছেন! শহর যেন প্রকৃত অর্থেই ‘শীতে উপেক্ষিতা’। দূষণের থাবা থেকে শহরের উচ্চকোটির এলাকাগুলিও বাদ নেই। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে অভিজাত এলাকা হিসেবে বিজ্ঞাপিত বালিগঞ্জ এবং ময়দান সংলগ্ন এলাকা হল সবচেয়ে দূষণ জর্জরিত এলাকা।

শহরের শীতের দূষণের সমস্যা মূলত তৈরি হয় যানবাহন, শিল্প, নির্মাণকাজ এবং বাজি পোড়ানোর মত বিভিন্ন উৎস থেকে  তৈরি হওয়া ধূলিকণা এবং গ্যাস থেকে। শীতে বায়ু চলাচল কম, কাজেই এই দূষণকারী উপাদানগুলি মাটির কাছে আটকে থাকে এবং বাতাসের মান কমিয়ে দেয়। এটা শিশু এবং বয়স্কদের জন্য ক্ষতিকর। শীতে বাতাসের গতি কমে যাওয়া  এবং আর্দ্রতা বেশি থাকার কারণে দূষণকারী কণাগুলি বায়ুমণ্ডলে বহু সময় ধরে আটকে থাকে। এমনকি প্রাতঃভ্রমণকারীদের সেরা জায়গা ময়দান সংলগ্ন এলাকার বায়ুদূষণ দেখলেও চমকে উঠতে হয়। সম্প্রতি সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়র্নমেন্ট –এর এক সমীক্ষা জানাচ্ছে, অতি সূক্ষ্মতম পিএম ২.৫ খুবই বিপজ্জনক দূষণ ঘটায়। প্রাতঃভ্রমণকারীদের জায়গারই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে শহরে ঘিঞ্জি এবং কলকারখানা রয়েছে এমন এলাকাগুলির অবস্থা কেমন তা জানার জন্য পরিবেশ বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই।

এটা ঘটনা পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে শহরে সামগ্রিকভাবে ২.৫ মাত্রার উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এরই পাশাপাশি শহরের কিছু অংশে হচ্ছে জাতীয় অনুমোদিত সীমার চাইতে অনেক বেশি দূষণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরতলী এলাকা থেকে কলকাতায় ঢুকছে বিষাক্ত বাতাস। তার ফলে কলকাতায় বাতাসের দূষণ সূচক ‘মডারেট’ থেকে ‘সিভিয়র’ হওয়ার দিকে এগোচ্ছে। শহর সংলগ্ন এলাকায় কৃষি জমিতে ফসলের গোড়া পোড়ানোর রীতি রয়েছে। শহরের লাগোয়া এলাকা নিউটাউনে প্রকাশ্যে চলছে ক্রপ বার্নিং, শীতে সেই বাতাস ঢুকছে শহরে। রাস্তায় জঞ্জাল পোড়ানো, ইটভাটা বায়ুদূষণে বড়ো ভূমিকা নিচ্ছে। পারদ পতনের ফলে ভারী হচ্ছে বাতাস, শহরে তৈরি হচ্ছে ধোঁয়াশা। দূষণ ক্লান্ত এই শহরে কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর  ‘শীতকাল কবে আসবে সুপর্ণা’ কথাটা ঠিক পরিহাসের মতো শোনায়।


Scroll to Top