তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আমাদের শীতের গল্প

আমাদের শীত-ফ্যান্টাসির আগমনী বাজিয়ে দেয় নভেম্বর। তবে সে মাসের প্রেম দীর্ঘ হয় – লম্বা হয় – বিস্তারিত হয় – কিন্তু  টেঁকে না। আমার অন্তত, না। কবিতা লেখার পথে উন্মুক্ত হয় – ‘লেপের আদর’ আসছে বলে কেবল নয়,মেলা বসার সময় এসে গেছে বলেও। ধুলো-বালি- গঙ্গার তীর- জাহাজের মাস্তুলে হিম লেগে গেলে, প্রেম পায় খুব। দুপুর ঘন হলে, ঘুম পায়। আর ঘুম ভাঙা শীতের বিকেল, ইশারায় কফি রাখে – আলিঙ্গন দেয়।

আমরা সব গরমের দেশের শীতকাতর লোক। আমরা পশম, চাদর নিয়ে লিখতে শুরু করে – এগিয়ে যাই ডিসেম্বরের ঘন হিম-অরণ্যে। সেখানে পাতা ঝরার শব্দে, বিরহের বদলে আসঙ্গ থাকে – একাকীত্বের বাঁশি থামিয়ে জাদুকররা খুঁজে নেয় রাজকীয় আড়াল। বোলপুরে এমন সময়ে উদযাপিত হয় আরেক জাদুবিদ নন্দলাল বসুর জন্মদিন। কলাভবনে মেলা বসে। সাজানো হয় নান্দনিক উপায়ে সব কিছু – নন্দনমেলা, সেই কবে থেকে শীতকালের বাঁশি বাজিয়ে আসছে – যাওয়া না যাওয়ার মাঝে, সে জাগরুক চিরকাল। দূরে থাকলেও, আলোর কথায় হিম জমে চশমার কাঁচে। মেলার মাঠে থাকলে, আকাশ নেমে আসে গায়ে। ঝুঁজকো সন্ধেতে হাতে বানানো গয়না কিনি অনেক। কমলালেবুর খোসা বেটে মাখা মেয়েরা, টার্টল নেক – পোলো নেক আপারের সঙ্গে জামদানী, তসর, হাতে বোনা তাঁতের শাড়িতে সেজে মেলা থেকে ফেরে। আমার তখন, বইমেলার কথা মনে পড়ে খুব। লিটল ম্যাগাজিনের পরিসরে যা যা দেখি, সে সবের আনন্দ রেণু ছড়িয়ে যায় বোলপুরের ঘাসে। চাঁদের মুখে জমে জ্যোৎস্নার সর। শীতকাল এগোতে থাকে পৌষ পার করে মাঘের দিকে। হেমন্তের গন্ধ ঘুমিয়ে যেতে না যেতেই ছড়িয়ে পড়ে কফির গন্ধ – কড়ক চায়ের সুঘ্রাণে সকাল আসে এখানে।

সকালে উঠে দেখি, কদম ফুলের দিন গত। হাওয়া বইছে দিগবিদক হুল্লাট করে – চাদর না সামলে হেঁটে যাই । পথের পাশে বাজার বসে হইহই করে। সব্জীর গায়ে জলের ছিটে –  শহরতলী থেকে আসা চাষি, মোটর ভ্যানে ফুলকপি – নানা রকম শাক বেচতে এসে, উদাস চালের দাম শুনে। দূরের চিত্রকরের ছবি মনে হয়  এই সব সামান্য জীবনগুলোকে। পাশেই যে মাঠায় প্লাস্টিক বিছানো রুগ্ন চা দোকান সারা বর্ষায় ভিজে একশা হতে হতে, নভেম্বরের রোদে পিঠ পেতেছে, সেখানে ‘কফি খায়’, গাঁ থেকে আসা হাটুরে লোক। কেমন যেন পোড়া পোড়া – রাস্তার উল্টোদিকে ‘কফি শপ’। সেখানে কাচের গায়ে চাঁদের জল জমতে পায় না- সেই কাচ পেরিয়ে দেখি, মাটির ভাঁড়, গাছের সারি, জমানো বালির পাশ দিয়ে শীতকাল উঁকি দিচ্ছে – শীতের গায়ে রংচটা, ঢলঢলে সোয়েটার। এদিকে, পার্কোলেটরে কফির গন্ধে মাত ঘর – কেক আসছে। ইদানীং নিউ মার্কেট বুড়ো হয়েছে বলে, আধুনিক জনতা আধুনিকতর কেকের দোকানে ভিড় করেন।

আমি উল্লাসিত পেত্নীর মতো প্রেমে পড়ি – পুনরায় বেড়াতে যাই বেপাড়ায়। অদল-বদল করে, স্পাগেটি টপে ঢুকে খুলে রাখি আদি সোয়েটার, শাল। আমাকেও সব্বাই ‘পাগল’ই বলে ডাকে। তারপর একদিন, সার্কাসের বিজ্ঞাপন পরে বাসস্ট্যান্ডে, রেল স্টেশনে, বিষণ্ণ গলিতে, যুবকহীন বাড়িতে, পার্কের রংওঠা দেওয়ালে। তাঁবুর নিচে বাঘের ডাক শুনব বলে, কত শীত ঘুরে ঘুরে আজও সে গর্জন কানে আসেনি, তবুও বাঘের কথা, শীতে মনে পড়বেই বারবার। বারবার রবিবারের নিউ মার্কেটে হাজির হয়ে পায়রা ওড়ানো দেখবই। এইসব করতে করতে ডিসেম্বর এগিয়ে যাবে জানুয়ারির প্রারম্ভে। শীত বসবে আরো জমাট হয়ে। রাংতামোড়া পার্কস্ট্রিটে সব্বাই যাবে ক্রিসমাস ক্যারোল শুনতে। বচ্ছরকার দেখাশোনা শেষ করে, প্রেমের দিকে মনোযোগ দেওয়ার মুহূর্ত, উপস্থিত হবে আমাদের কাছে। আমরা সান্তাবুড়োর কাছে, বিশ্বাস চাইব আগেরবারের মতোই, এই জেনে যে, বিশ্বাস থাকবে না। ভরসা মরে যাবে। শীতকালে, যা যা হবে, যা যা হয় তা নিয়ে কবিতা লেখা হবে এইভাবে, ‘জামার ভেতর যারা হাফ সোয়েটার পরে, তারা কিছু একটা লুকোতে চায়। যেমন আমরাও চাইতাম, ছোটোবেলায়। আমাদের হাফ সোয়েটারগুলো ছিল ছেঁড়া ও ঘোলাটে রঙের। হয়তো মেজোমাসি বুনে পাঠিয়েছিল কবে ! বাজারে তখনও এস সাইজ আসেনি। ফলে মা-ও বলে দেয়নি সাইজ। বাধ্য আমরা ডবল এক্সেল সোয়েটার ট্রিপল এক্সেল জামায় ঢেকে ঘুরে বেড়াতাম। অনেক বড়ো হওয়ার পর যখন রাষ্ট্রের দিকে তাকালাম, তখন ভুল ভাঙল আমাদের। এখানে 'রাষ্ট্র' আসলে আমাদের বিল্টুদা। বয়স হয়েছে, চোখে যথেষ্ট কম দেখে। কিন্তু সে যে কম দেখে, তা কাউকে জানান দিতে চায় না। তাই সারাক্ষণ খালি চোখ রাঙায় আর চোখ রাঙায়। তার চোখ-রঙানির ঠেলায় বসন্তও আর বহুদিন বলতে সাহস পায় না- রাঙিয়ে দিয়ে যাও ! এতক্ষণে নিশ্চয়ই আপনারা বুঝে গেছেন যে আমাদেরও শীত করত ছোটোবেলায়। এবং প্রাচীন হাফ সোয়েটারগুলো ছেঁড়াফাটা ছিল বলে লুকোতাম সবসময়, এমনটা নয়। আসলে 'কনকনে ঠান্ডাতেও দ্যাখ জামাটুকুই যথেষ্ট', এই ছিল আমাদের ঘোষণার বিষয়। অর্থাৎ, লুকোনো। যেমনভাবে রাষ্ট্রও লুকিয়ে ফেলতে চায় তার ভেতরের শীত শীত ভাব। এখানেও বলে রাখা জরুরি যে শেষতম রাষ্ট্রটিও ঠিক রাষ্ট্র নয়। রাষ্ট্রপতিও নয়। বিল্টুদা তো নয়ই!’( কবিতা – জামার ভেতর হাফ সোয়েটার, কবি – দীপ্তিপ্রকাশ দে)।


Scroll to Top