
ভবানীপুরের এক সাধারণ ঘর থেকে যেদিন যাত্রা শুরু হয়েছিল অরুণকুমারের সেদিন কে জানত, একদিন এই মানুষটাই হয়ে উঠবেন বাঙালি অবাঙালি
নির্বিশেষে কোটি মানুষের স্বপ্নের নায়ক ?
প্রথম দিকে কত যে বাধা, কত যে ব্যর্থতা—অসংখ্য ছবির ব্যর্থতা, পাড়ার মানুষজনের ঠাট্টা, আত্মীয়স্বজনের হতাশা। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন—‘একদিন মানুষ আমাকে চিনবেই।’
সেই দিন এসেছিল। ‘অগ্নিপরীক্ষা’-র পরেই বাংলার সিনেমা পায় নতুন সূর্য। আর সেই সূর্যের আলোতেই জ্বলে ওঠে প্রেম, স্বপ্ন আর জীবনের অজস্র রঙ। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর পর্দার রসায়ন হয়ে ওঠে কিংবদন্তি। মায়া, আকাঙ্ক্ষা আর প্রেমে ভরা তাঁদের জুটি মানুষকে শিখিয়েছিল—সিনেমা শুধু বিনোদন নয়, সেলুলয়েডের বুকে আঁকা এও এক কবিতা।
কিন্তু উত্তমকুমার তো শুধু প্রেমের নায়ক ছিলেন না। সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’-এর অরিন্দম মুখার্জির মতো চরিত্রে তিনি যেন নিজেকেই উন্মোচন করেছিলেন। খ্যাতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা একাকীত্ব, হতাশা আর প্রশ্নবোধক চোখ সবকিছু নিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন, তুলে এনেছিলেন নায়কের ভিতরকার মানুষটিকে।
উত্তম ছিলেন অভিনেতা, গায়ক, প্রযোজক সবই—কিন্তু এই সব কিছুর আগে তিনি ছিলেন মানুষের হৃদয়ের আপনজন। তাঁর হাসি, তাঁর চাহনি, তাঁর কণ্ঠ—সব কিছু আজও বাঙালির স্মৃতিতে জীবন্ত।
১৯৮০ সালের জুলাই মাসের সেই দিনটিতে মহানায়ক চলে গেলেও তাঁর আলো কিন্তু নিভে যায়নি। কারণ উত্তম কুমার তো শুধু একজন মানুষ ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন পুরো একটা প্রজন্মের স্বপ্ন, একটা সাংস্কৃতিক বোধের প্রতীক।
তাই আজও তিনি আছেন—সিনেমার পর্দায়,
আমাদের স্মৃতিতে বিধৃত একেকটি সংলাপে, সেই থেকে এই প্রজন্মের বাঙালির হৃদয়ে।
তিনি চিরকালই আমাদের মহানায়ক। ছিলেন, আছেন এবং অবশ্যই থাকবেন। তাঁর শতবর্ষ মানে তাই স্বাধীনতা উত্তর বাঙালির স্বপ্নের শতবর্ষ। আমাদের, অর্থাৎ এই আমবাঙালির ‘হয়ে ওঠা’-র শতবর্ষ।