
যুদ্ধ। দু অক্ষরের ছোট্ট শব্দটা আমাদের জীবনের সঙ্গে কিভাবে জড়িয়ে আছে সে কথা ভাবলে অবাকই হতে হয়। না, আমি মানুষের রোজকার জীবনযুদ্ধের কথা বলছি না, একেবারে সরাসরি রাজায় রাজায় যুদ্ধের কথাই বলছি। আমাদের দুই মহাকাব্যের ক্লাইম্যাক্সে দুই যুদ্ধ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা কথায় কথায় ‘কুরুক্ষেত্র’ বাধাই, ‘রামরাবণের যুদ্ধ’ বেধে যায় দুই বন্ধুর মধ্যে। নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় (৬ জুলাই ২০০৩) জানা যাচ্ছে গত ৩৪০০ বছরের ইতিহাসে মানুষ যুদ্ধহীন ছিল মাত্র ২৬৮ বছর (~৮%)। তাহলে যুদ্ধও কি মানুষের একটি মৌলিক প্রবণতা ? না হলে দুটি দেশ বছরের পর বছর যুদ্ধ করে যাওয়ার মতো মানুষ পায় কোথায় !
এই মুহুর্তে দুপ্রান্তে দুটি যুদ্ধ চলছে তিনবছরের বেশি সময় ধরে। আমরা নিরাপদ দুরত্বে বসে গাজায় ধ্বংসলীলা দেখতে দেখতে শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলি। কিন্তু আমরা সত্যিই কতটা নিরাপদ দূরত্বে আছি সে কথাও বোধহয় ভাবার দরকার আছে। একটা যুদ্ধ মানে কী কী ধ্বংস হয় মনে করা যাক। অজস্র প্রাণ তো যায়ই, ধ্বংস হয়ে যায় হাজার হাজার বছরের ইতিহাস। মানুষের বহু বছরের শ্রমে গড়ে ওঠা স্থাপত্য, শিল্পকর্ম আর জ্ঞানভাণ্ডার (লাইব্রেরি) ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু তার পাশাপাশি আরো কিছু ধংস হয়, যার মূল্য কিন্তু আপাত যুদ্ধহীন দেশের মানুষকেও চুকিয়ে যেতে হয়। সেই কথাই একটু বলার চেষ্টা করি।
এই বিশ্বায়িত বিশ্বে আপনার একলা চলার অধিকার নেই। আপনি হয় আমার দলে না হয় ওদের দলে। তাই যুদ্ধ মানে আসলে কেউ তার বাইরে নয়। বিশ্বের বড়ো বড়ো শক্তিগুলো হয় ‘ক’ নামক দেশকে যারা সরাসরি সমর্থন করছে নাহয় ‘খ’ নামক দেশকে। এখন কোন শক্তির সঙ্গে আপনার দেশের বন্ধুত্ব আছে, সেই বিচারে যুদ্ধ বৃত্তের বাইরে বসেও আপনি কারুর না কারুর সঙ্গে পরোক্ষে জুড়েই যাচ্ছেন, শত্রুর বন্ধু বা বন্ধুর শত্রু হয়ে যাচ্ছেন। ফলে আপনার বন্ধুদেশ কাকে সমর্থন করছে, দেশের আমদানি-রপ্তানি থেকে আপনার ছেলের পড়তে যাওয়া সবই সেই আলোয় দেখে নেওয়া হবে। এই ক’দিন আগে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধটা হতে হতে হল না বলে যাঁদের আক্ষেপের সীমা পরিসীমা নেই তাঁরা কি জানেন পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য ওই দেশ থেকে আমদানি করা হয় এমন জিনিসের দাম কতটা বেড়ে গেছে ? কারণ, সেই জিনিসগুলো ঘুরপথে দ্বিগুণ শুল্ক দিয়ে আমদানি করতে হচ্ছে। জানেন না। আমরা কেউই এইসব মাথায় রাখি না, যতক্ষণ না আমার ঘরে বোমাটি পড়ছে বা আমার ছেলেটিকে যুদ্ধে যেতে হচ্ছে।
কিন্তু সাধারণ মানুষ যাঁরা যুদ্ধ করেন না, যুদ্ধকে সমর্থনও করেন না, তাঁরাও অনেক সময়ই স্রেফ হাতের পুতুল হয়ে রয়ে যান। যুদ্ধের কোপ তাঁদের ঘাড়েই পড়ে, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে অন্যত্রও। কারণ যুদ্ধ মনে অজস্র শরণার্থী। লক্ষ লক্ষ মানুষের সব হারিয়ে গরিব হয়ে পড়া। নিজের দেশ, ভিটে, মাটি, সারাজীবনে অর্জিত খড়কূটো ফেলে একবস্ত্রে সীমানা পেরিয়ে অন্যদেশে ঢুকে পড়া। তারাও যদি অস্বীকার করে, তাহলে স্রেফ লাল টুকটুকে জামা আর নীল প্যান্ট পরে বালিতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা আয়লান কুর্দি। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের উদ্বাস্তুদের দুর্দশার কথা, মায়নামার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কথা যাঁদের স্মরণে আছে তাঁরা বুঝবেন শরণার্থী হয়ে পড়া মানুষ যেমন নিজের মানুষের আধিকার হারিয়ে ফেলেন, তেমনি যে দেশে আশ্রয় নিতে চান সেই দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা আর অর্থনীতিও বিঘ্নিত হয়।
এর পরেও কথা আছে। আমাদের মাথার ওপর অদৃশ্য ছাতার মতো যে বায়ুমণ্ডল সে আমাদের যাবতীয় পাপের হিসেব রাখে। যে মাটি, যে জলধারা, যে সমুদ্র আমাদের জুড়ে রাখে, ঘিরে রাখে তারা যেমন আমাদের সকলের সম্পত্তি, তেমনি আপনি যুদ্ধে থাকুন না থাকুন, যুদ্ধের পাপ আপনার সেই সম্পত্তিকে কিন্তু ধ্বংস করছে, হয়তো আপনার অজ্ঞাতে, অজান্তে। মনে করুন শুধু বাজি পোড়ালে আর ফসলের গোড়া পোড়ালে বায়ুমণ্ডলে যে দূষণ ঘটে তার জন্য নভেম্বরের শুরুতে কিছুদিন দিল্লি প্রায় অন্ধকার হয়ে থাকে। সেখানে এই নিরন্তর গোলাগুলি, বোমা, বিস্ফোরণ, বাতাসে মিশে যাওয়া বিষাক্ত গ্যাস আর মাইক্রোকণিকা সেসব কিন্তু শুধু ওই দেশের বাতাসে জমে থাকবে না। রাসায়নিক যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে জলে মিশে যাওয়া রোগ জীবাণু যে কাল আপনার জলেও পৌঁছে যাবে না, তার কোনো স্থিরতা নেই। যুদ্ধ গোটা পৃথিবীর পরিবেশকে একটু একটু করে ধ্বংস করছে, সেটা ভুলে থাকাও একটা পাপ !