
বৈশাখ মানেই এথনিক! গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের পাতায় ইংরেজি বদলে হঠাৎ যেন বাংলায় মুখ তোলে নতুন বছর! ট্রাইস্টেটের বঙ্গবাসীদের হোয়াট্স অ্যাপ গ্রুপের আলোচনায় তখন ম্যানহ্যাটন থেকে আলাস্কার ‘হ্যান্ডস অফ', ‘ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ার মার্কেটের ব্ল্যাক মানডে’ ভুলে অক্ষর প্রিন্টের মলমল! মনের দোলাচলে বাটিক, নাকি সেই আদি অকৃত্রিম ঢাকাই! ফ্রিলের গ্লাসহাতা ব্লাউজ নাকি ট্রেন্ডি বেলুন স্লিভড! এ বছর কোন স্টাইল ইন !
বৈশাখের নব কিরণশিখা শুধু বাংলার মানুষ আর বাংলার প্রকৃতিকেই নয়, নবরূপে রাঙিয়ে তোলে দূর পরবাসে বাস করা এই বাঙালিদের হৃদকোণও। তাই আজকাল বিভুঁইয়ের মাটিতেও বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা, আচার- অনুষ্ঠান আর বিশাল বর্ণাঢ্য বৈশাখী মেলার আয়োজন করে মহাসমারোহে ‘পয়লা বোশেখ’ পালন হয় । শুধু আমেরিকা কেন, পুরো বিশ্ব জুড়ে শত ব্যস্ততার মধ্যেও নতুন বছরকে বরণ করতে বাঙালি মেতে ওঠে এক অপূর্ব নিখাদ বাঙালিয়ানায়।
নিউ জার্সির পাড়ায় পাড়ায় এখন বাঙালি ক্লাবের ছড়াছড়ি । তাই এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়ে মে পর্যন্ত গড়াবে প্রত্যেক উইকএন্ডের বিভিন্ন ক্লাবের নিজস্ব স্টাইলে বর্ষবরণ উদযাপন। ক্লাবে ক্লাবে তখন লিনেন,বেগমপুরী,পিওর কটন ফেব্রিকে রং বেরং - এর আঁচলের ওড়াউড়ি! ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের স্টাইলে ড্রেপিং, সঙ্গে কন্টেম্পোরারি স্বেচ্ছাচারীর ব্রোচ, নোজ পিন!
হাতে বাঁকুড়ার শঙ্খবণিকদের তৈরি নকশাদার শাঁখা। দেশ থেকে আনা স্পেশাল কালেকশন! এতদিনে সবাইকে দেখানোর সুযোগ এসেছে! বাঁধাগতের একঘেয়েমিতে একটুকরো কালবৈশাখী আনন্দঝড়।
অ্যাক্রেলিকের আল্পনা আঁকা ব্রাউনপেপার আর নিউ ইয়র্কের বুকে একটুকরো বাংলাদেশ জ্যাকসন হাইটস থেকে কেনা ছোটো ছোটো কুলো, হাতপাখায় সেজে হলগুলো তখন নতুন বৈশাখের আহ্বানে উৎসবের উন্মুক্ত আঙিনা। অ্যান্টিক কালেকশনের ঝুড়ি থেকে পেতলের পানবাটা, এমনকী পিলসুজ মেটাল ক্লিনারে সেজেগুজে চকচকে হয়ে গেটের পাশে দাঁড়িয়ে!
গাঁদাফুলের মালা, গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো স্টেজে কিংবা উন্মুক্ত প্রান্তরে বেজে চলে বাংলা ব্যান্ডের গানে মুক্তছন্দের কোরিওগ্রাফি ।
বৈশাখের হঠাৎ বৃষ্টির মতো কোথাও রিমঝিম ঝরেছে ফুলকারি পাঞ্জাবিতে কচিকাঁচাদের বাংলায় কাব্যধারা বা রঙিন ছোট্ট বেনারসীতে সঙ্গীতের মার্গে নিতিনৃত্যের চলাচল। প্রবাসী দিগন্তের শূন্য ক্যানভাসেও কিন্তু তখন সেই একই মেঘের ওড়াউড়ি!
শুধু নস্ট্যালজিয়া নয়, সত্যি সত্যি সেই বর্ষবরণের আমেজটাকে এই প্রবাসেও যেন ফিরিয়ে আনা !
এত বারুদ,এত ধ্বংস,এত অহং, এত হিসেবি রাজনীতি, একঘেয়ে ঘরকন্নার মাঝেও নতুন প্রজন্মকে শিকড় ছোঁয়ানোর আশায় ছোট্ট একটা বাংলার প্রতিচ্ছবি আঁকার চেষ্টা।
সেই ইচ্ছেতেই আমাদের ঘরের রবীন্দ্রকোণ,বাইরের মুক্তাঙ্গন, একাকী অথবা বৃন্দে মেতে ওঠে নতুন বর্ষকে আমন্ত্রণ জানাতে। নিউ ইয়র্ক থেকে নিউ অর্লিন্স,হাডসন থেকে মিসিসিপি, কেপ মে থেকে ক্যালিফর্নিয়া, অ্যামেরিকান অ্যাকসেন্ট নিয়েও বাচ্চারা তোতাপাখির মত আওড়ে চলে ছড়া-কবিতা। মা খোঁপায় গোঁজে ডোকরার খোঁপা বিলাস, মেয়ে চুলে বাঁধে সাদা জুঁইয়ের ফলস গজরা।
গিটার হাতে ছেলে এথনিক পাঞ্জাবির সাথে ডেনিম, বাবা ইনস্ট্যান্ট ধুতি আর এক্সক্লুসিভ পাঞ্জাবিতে ক্যারাওকির গানের ভেলায়, নাচের ছন্দে কিংবা আবৃত্তির দোলায় মেতে ওঠে একসঙ্গে…
একসুরে গায় বর্ষবরণের গান…