তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
নজরুল ইসলাম : এক অনন্য প্রতিভা

          

              

                    

নজরুল ইসলাম ! বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির এই এক অনন্য স্রষ্টা যিনি আমার কাছে প্রশ্নের পর প্রশ্ন, বিস্ময়ের পর বিস্ময় নিয়ে উপস্থিত থাকেন।  না, রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে আমাদের যে বিস্ময় তা একটু অন্যরকম।  রবীন্দ্রনাথের উদ্ভব-পটভূমিকা সে বিস্ময়ের কিছুটা ব্যাখ্যা হয়ত দেয়।  কিন্তু  পৃথিবীর যে কোনো সংস্কৃতির ইতিহাসে স্রষ্টা নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) একটি অভাবিত ও অব্যাখ্যাত ব্যতিক্রম বলেই গণ্য হবেন।  কত বিচিত্রভাবে যে তিনি ব্যতিক্রমী, তার পুরো হিসেব বোধ হয় আমরা করে উঠতে পারব না কখনও।  প্রথমত, বাংলা সাহিত্যে (এবং সংগীতে) তাঁর আবির্ভাব এক বিস্ফোরণের মতো, একেবারে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ও পরিণত রূপে।  দ্বিধাহীন স্পর্ধায়, অয়মহম্ভো বা জুলিয়াস সিজারের মতো এলাম দেখলাম জয় করলাম’ বলে তাঁর আবির্ভাব। 

এই আবির্ভাব তো বাইশ-তেইশ বছরের এক তরুণের।  কিন্তু তার মধ্যেও যে বিস্ময়ের উপাদানগুলি ছিল তা তাঁর সম্বন্ধে কিছুটা জানার পর তৈরি হল।  এই সদ্য-যুবক জন্মেছিলেন দরিদ্র ইমাম ফকির আহমেদ আর খাদেজা খাদুনের সন্তান হিসেবে, নাগরিক শিক্ষাদীক্ষা-সংস্কৃতির আলোক সে ঘরে বেশি প্রবেশ করেনি।  তার উপর, তাঁকে কখনও আসানসোলে রুটির দোকানে কাজ করতে হয়েছে, তারপরে পরের আশ্রয়ে লেখাপড়ায় ফিরতে হয়েছে।  তা সত্ত্বেও স্কুলের শেষ পরীক্ষা তিনি দেননি, তার আগেই ব্রিটিশ রাজের সৈন্যদলে ভর্তি হয়ে, করাচি পর্যন্ত গেছেন,  প্রথম মহাযুদ্ধের শেষে হাবিলদারের মর্যাদায় ফিরে এসেছেন।  প্রশ্ন হল, তাঁর কবিতার তেজ, ক্রোধ ও উদ্দাম বলবীর্যের উপাদানের কথা না হয় ছেড়ে দিলাম--তা তাঁর সমাজতত্ত্বে-মনস্তত্ত্বেই হযতো লুকোনো ছিল,  ইসলামি ধর্মজ্ঞান ও পুরাণকথাও না হয় পারিবারিক সূত্রেই পেয়েছেন,  কিন্তু তার বাইরের বিপুল অধিকার !  হিন্দুপুরাণ ও সংস্কৃতভাষা, গ্রিক পুরাণ ? আরব-পারস্যের সাহিত্যিক আর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ?  বাংলা ভাষা আর ছন্দের উপর এই আশ্চর্য দখল ? আর ছন্দও শুধু বাংলা ছন্দ নয়, সংস্কৃত ছন্দ, আরবি ছন্দ।  কখন শিখলেন তিনি এত সব ? সিয়ারশোলের স্কুলে, ময়মনসিংহের ত্রিশালে, মসজিদের মুয়াজ্জিনের সংক্ষিপ্ত জীবিকায়, না কি কাকা ফজলে করিমের লেটোর দলে লেটোর জন্য নাটক লিখতে গিয়ে ? 

তারপরে তাঁর গান !  যে তিন হাজারের বেশি গান তিনি তৈরি করলেন, তাতে তাঁর আবেগের বহুধা বৈচিত্র্য ছাড়াও আছে দেশবিদেশের সুরের আমন্ত্রণ, সেই সঙ্গে ভারতীয় রাগরাগিণীর উপর বিপুল দখল !  শোনা যায় ষোলোটি নতুন রাগরাগিণী তিনি নিজে সৃষ্টি করেছেন।  এই শিক্ষা আর প্রেরণা তাঁর কখন কোথায় আয়ত্ত হল ? এই অত্যাশ্চর্য স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টিপ্রতিভাই বা তাঁর কোন উৎস থেকে লব্ধ হল ?  এত সব প্রশ্নের কোনো উত্তর তাঁর জীবনীকাররা খুঁজে পান কি ?

   তাঁর গানের বিপুল পৃথিবী ছেড়ে যদি শুধু সাহিত্যে নজর রাখি তারও কি বৈচিত্র্য বিস্ময়কর নয়?  কবিতা, ছোটোগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, ছোটোদের কবিতা ও নাটক, মুক্ত গদ্য, সাংবাদিকতা, সম্পাদনা, অনুবাদ--কতদিকেই না ছড়িয়েছে তাঁর বিপুল উদ্যোগ, সঞ্চয়ে অপচয়ে কী তার বিস্তার !   অন্য সব প্রসঙ্গ বর্জন করে তাঁকে কেবল ‘বিদ্রোহী কবি’ বলে মার্কা মেরে দেওয়া হয় এজন্য বুদ্ধিজীবী সমালোচকেরা রাগ করেন, কিন্তু ওভাবে বিদ্রোহের কথা আর কি কেউ বলেছেন ?  ওই রকম পবিত্র ক্রোধ নিয়ে কি কেউ বলতে পেরেছেন, ‘প্রার্থনা করো, যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, যেন লেখা হয় আমার রক্তলেখায় তাদের

সর্বনাশ !’ নিঃস্ব, দরিদ্র, পীড়িত, দুর্বল আর পদানত নারীদের জন্য এমন জ্বলন্ত ক্রোধ কি কেউ প্রকাশ করেছে ?  এমন করে আর কারও কবিতা ও গান কি দু-দুটো দেশের মুক্তিসংগ্রামে প্রেরণা জুগিয়েছে--ভারত আর বাংলাদেশের ?

  তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকেও যেন এক সময় তিনি দারুণ অবহেলায় ফেলে-ছড়িয়ে নির্মাণ করেছেন। ১৯২১-এ কুমিল্লায় নার্গিসের সঙ্গে বিবাহের পরেই তাঁর প্রায় পলায়ন, তারপরে ওই কুমিল্লারই প্রায় বালিকা প্রমীলা সেনের প্রণয়ে তাঁর গৃহবন্ধন, রাজনীতির নানাভাগে ঝাঁপিয়ে পড়া, কবিতায় রাজদ্রোহের জন্য কারাবাস, রাজনীতি আর ধর্ম--দুয়ের গোঁড়ামির বিরুদ্ধেই তাঁর বিদ্রোহ, আবার সংগীতে দুই ধর্মেরই মহতের বন্দনা, এবং কবিতা থেকে আস্তে আস্তে গানের বিপুল উৎপাদনে বন্দি হওয়া, এবং শেষে, ১৯৪৩ সালে, মাত্র ৪৩ বৎসর বয়সে হঠাৎ বজ্রাঘাতের মতো সেই শারীরিক-মানসিক জড়তায় আক্রান্ত হওয়া--এই ট্রাজেডির কি কোনো প্রতিদৃষ্টান্ত আছে ?  এটি সারা পৃথিবীর সংস্কৃতি-জগতের হাহাকার করে ওঠার মতো একটি ঘটনা।  ওই প্রায়-নিশ্চেতন নজরুলের কাছে তিনি কোন দেশের নাগরিক হলেন এই বিবাদের সংবাদ পৌঁছোল না, কোন দেশের ‘জাতীয় কবি’ হলেন তারও কোনো অর্থ দাঁড়াল না।  কিংবা যদি তাঁর সমস্ত শক্তি আর উজ্জীবন নিয়ে বেঁচে থাকতেন তা হলে বাংলা বা পৃথিবীর সাহিত্য ও সংগীত সংস্কৃতিকে তিনি আর কতভাবে সমৃদ্ধ করতে পারতেন, সেই জল্পনাও নিরর্থক হয়ে দাঁড়াল।

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে একটি মানপত্রে শরৎচন্দ্র এক সময় লিখেছিলেন, ‘তোমার প্রতি চাহিয়া আমাদের বিস্ময়ের সীমা নাই।’ নজরুল সম্বন্ধেও এই একই কথা আমাদের বারবার লিখতে ইচ্ছা করে।


Scroll to Top