তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
প্রকৃতির রোষ ও মানুষের দোষ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ তো দুরবস্থার সবে শুরু, এখনই না থামলে পরবর্তীকালে অবস্থা আরও খারাপ হবে...   বন কেটে বানানো হয়েছে রাস্তা, পাহাড় কেটে বানানো হয়েছে সড়ক যোগাযোগের টানেল, প্রগতির নামে রোধ করা হয়েছে নদীর গতি, বদলে দেওয়া হয়েছে তার গতিপথ। এই হল উত্তরবঙ্গের ‘উন্নয়ন’-এর ছবি। এই তো একদা  সুন্দর উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকার ফিলহাল অবস্থা। এরপরেও সেখানে বিপর্যয় না এলে ‘বিপর্যয়’ কথাটাকেই অভিধান থেকে বাদ দেওয়া উচিত ! কেউ বলবেন, তাহলে কি উন্নয়ন হবে না ? এর স্পষ্ট জবাব হল, পরিবেশ ধ্বংস করে এবং মানুষের বিপন্নতা বাড়িয়ে এমন ‘উন্নয়ন’ না হওয়াই ভালো। কারণ, তাতে লাভের চাইতে ক্ষতি বেশি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ তো দুরবস্থার সবে শুরু, এখনই না থামলে পরবর্তীকালে অবস্থা আরও খারাপ হবে। তিস্তা নদীর ওপর একের পর এক বাঁধ বিপর্যয় আরও বাড়াচ্ছে বলেই বহু বিশেষজ্ঞের অভিমত। তাঁদের মতে, উন্নয়নের যজ্ঞে অটল, অনড় সরকার পরিবেশের ওপর এর কী প্রভাব পড়ছে তা বুঝতে নারাজ। বহু লোকের কাছে উন্নয়ন মানে মানুষ নয়, শুধুই ইট, কাঠ, পাথরের এক কিম্ভূত নির্মাণ। উত্তরবঙ্গে সেটাই ঘটছে। মনুষ্যসৃষ্ট এবং প্রাকৃতিক দুরকম কারণের যুগলবন্দিতেই উত্তরবঙ্গে বিপর্যয়  বেড়েছে বলে বহু বিশেষজ্ঞের অভিমত। এমনিতেই এলাকাটি ভূমিকম্প এবং ধ্বসপ্রবণ। তার ওপর এলাকার নদীগুলি বন্যাপ্রবণ, তা ভূমিধ্বসের সম্ভাবনা আরও বাড়িয়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে নদীর গতি স্বাভাবিক কারণেই দ্রুত, তার ওপর নদীর বুকে পলি জমে তার গতি বদলে যায়, বাড়ে বন্যার ঝুঁকি। অন্যদিকে পাহাড়ি অঞ্চলে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা, বাড়ি এবং অন্যান্য নির্মাণকার্যের ফলে মাটি আলগা হয়ে যায় এবং ভূমিধ্বসের বিপদ বাড়ে। এবারের বিপর্যয়েও এমনটাই ঘটেছে বলে খোঁজখবর রাখা মানুষজন বলছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে এখানে যথেচ্ছভাবে তৈরি হয়েছে হোটেল, হোম স্টে এবং ঘরবাড়ি। নির্বিচারে চলেছে গাছ কাটা। ফলে মাটি ধরে রাখার পরিস্থিতি নেই বললেই চলে – তাই নামছে ধ্বস, ঘটছে প্রাণহানি। এখানে মাটির চরিত্র অ্যালুভিয়ান বা ঝুরঝুরে, তাই গাছই মাটি ধরে রাখতে পারে। এই মাটি ২৪ ঘন্টায় ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি সহ্য করতে পারে না। এর পাশাপাশি ঠিক সময়ে পলি অপসারণের ব্যবস্থা না থাকায় বন্যার সম্ভাবনা যে আরও বেড়েছে তা বুঝতে কোনো বিশেষজ্ঞের দরকার হয় না। একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায় প্রকৃতির পাশাপাশি মনুষ্যসৃষ্ট কারণেও পাহাড়ে বিপর্যয়ের ব্যাপকতা বাড়ছে। বহু পরিবেশ বিশেষজ্ঞের মতে, পুরনো বৃক্ষ নিধনের সমস্যা সামাল দিতে বহু জায়গায় জাপানিজ পাইন লাগানো হয়েছে যাতে লাভের চেয়ে ক্ষতি হয়েছে বেশি। কারণ এগুলি জল টানে বেশি, পরিণতিতে বাড়ে ভূমিধ্বস। যেখানে সেখানে নির্মাণ, বিশেষ করে নদীর ধারে অবৈধ হোটেল, ঘরবাড়ি, বন বিনাশের প্রবণতার ফলে ভূমিধ্বস এবং বন্যার সম্ভাবনা যে বেড়েছে তা পরিস্কার। এর পরিণতিতেই বিপর্যয় গ্রাসে পড়ছে মানুষ। পাহাড়ের ঢালে এবং নদীর আশেপাশে ঘরবাড়ি বানানো শুধু প্রাকৃতিক ভারসাম্যই নষ্ট করেনি, জায়গাটাকে মানুষের পক্ষে বিপজ্জনক করে তুলেছে। অথচ এই অপরিকল্পিত ও বিপজ্জনক উন্নয়ন বন্ধ করার জন্য বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ এবং প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ। কিন্তু অর্থের নেশা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা তা উপেক্ষা করেছে। একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে, পাহাড়ের মনুষ্যসৃষ্ট সংকট মিলেছে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সঙ্গে। তা হয়ে উঠেছে পরস্পরের পরিপূরক। বহু পরিবেশবিদ জানিয়েছেন, স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনা না করেই বহু এলাকাতে পাহাড়ি ঝোরাগুলির গতি রুদ্ধ হয়েছে অপরিকল্পিত নির্মাণের কারণে। এতে যে বিরাট একটা বিপদ আসতে পারে সেই সতর্কতাটুকুও মানা হয়নি ! এতে সংকট আরও বেড়েছে। ভুটান থেকে প্রায় ৭২টি নদী এবং শাখানদী উত্তরবঙ্গে ঢুকছে। স্বাভাবিকভাবে উজান বেয়ে একটা বিশাল জলপ্রবাহ উত্তরবঙ্গে ঢুকছে। এই স্রোত একটু বাধা পেলেই বন্যার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বহু পরিবেশবিদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সম্প্রতি উত্তরবঙ্গে বৃষ্টি বেড়েছে, তার সঙ্গে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা যুক্ত হওয়ার ফলে অবস্থা আয়ত্তের বাইরে চলে গিয়েছে। নদীগুলি আর জল ধরে রাখতে পারেনি। অতিবৃষ্টি এবং একের পর এক ধ্বস, পাহাড়কে একেবারে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। প্রকৃতির রোষ এবং মানুষের দোষের যুগলবন্দি পাহাড়ের পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।

Scroll to Top