তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
চলো যাই অরুণাচলে


চারপাশ দিয়ে আলো ঠিকরে পড়ছে।
গান, টুকরো টুকরো কথা আর লজেন্স ছোঁড়াছুঁড়ির।
চোখ দিয়ে তীর মারছে কেউ।
বিদ্ধ না হয়ে পিছলে যাচ্ছে কেউ।
বাইরে বিপদ, মৃত্যুর মতো খাদ, গাছের গুঁড়িতে বরফ। এবং
বড় বড় শহরে তখন ছলনার পারদ উঠছে, নামছে।
ভেতরে পৌঁছোয় না এসব।
গাড়ির মধ্যে স্ফূর্তি নিজেই মশগুল হয়ে আছে।
তাওয়াং ছাড়িয়ে আমরা যাচ্ছি বমডিলার দিকে।
অল্প কিছুদিনের জন্য, চমক কিনেছি আমরা

এই কবিতা লেখার আগেই আমরা ঘুরে এসেছি অরুণাচল।যখনই যারা অরুণাচল গেছে,বলেছে স্বর্গীয় দৃশ্য। কিন্তু এটা বলেই দাঁড়ি না দিয়ে করে যোগ করেছে,তবে পথঘাট যা খারাপ,কোমর আর আস্ত থাকবে না! ব্যস, আমিও ঘাবড়ে গিয়ে ভেবেছি, এসব জায়গায় যাওয়া-টাওয়া আমার চায়ের কাপ হাতে ছবি দেওয়ার ক্ষেত্র নয়।

আমার কিছু বন্ধু আছে যারা ক্লাস ওয়ান থেকে আমার কাঁদুনেবেলার সঙ্গী, তারপর কালের নিয়মে হারিয়ে গেল। আবার ফিরে এল। আমি এদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যাই। আমার খেপাটেপনাকে এরা অনন্ত প্রশ্রয় দিয়ে থাকে।এই বন্ধুদের সঙ্গে এদের লাইফ পার্টনাররা থাকে এবং তারাও বরাত জোরে আমাদের খুব বন্ধু হয়ে গেছে। যাক গে, এত শিবের গীত না গিয়ে এবার সরাসরি ধান ভাঙায় মন দিই গে। কিংশুক আলতোভাবে কথা তুললো একদিন। একবার অরুণাচল গেলে হয় না।!আমি সভয়ে পিছিয়ে এলাম। ওরা বলল কোলে কোলে (আমার মত হেভি ওয়েটকে) নিয়ে যাব তোকে।এসব প্ল্যানিংয়ে আমি মাথা গলাই না। আমি আহ্লাদির মতো যথাসময়ে গিয়ে এদের ধন্য করি মাত্র। প্রথমে শুনেছিলাম আকাশ পথে যাওয়া হবে। আমার প্লেনে ফোবিয়া হয়। দাঁত মুখ চিপে যাতায়াত করি।তাই ভয় পেয়েছিলাম খানিক। পরে শুনলাম সরাইঘাট এক্সপ্রেস!যাক,জয় মা কামাখ্যা! আরো একটা ভয়ের প্রসঙ্গ ছিল। তা হল এবারের এই ভ্রমণ কন্ডাক্টেড ট্যুর। ওরে বাবা! সঙ্গে কারা থাকবে! তাদের সঙ্গে টিউনিং মিলবে তো! আমি লুচি খেতে চাইলে তারা যদি কড়করে টোস্ট খেতে চায়, আমি নিসর্গ দেখে লাফালাফি করলে তারা যদি ভাবে এ বুড়ির হলটা কি! আবছা মনে আছে কন্যাকে নিয়ে কুন্ডু স্পেশালে নেপাল গেছিলাম। সে ভ্রমণ সুখকর ছিল। আমার তখন কম বয়স, তাই কিছু ভ্রমরও ওড়াউড়ি করেছিল।এখন তো ক্ষণে

ক্ষণে আমার মুড সুইং করে। খিটখিটে হয়ে গেছি বেশ। ইত্যাদি ইত্যাদি । সে যাকগে...।অক্টোবরে কুড়ি তারিখ। বিকেলবেলা ট্রেন ছাড়বে। হাওড়া স্টেশন পৌঁছে গেলাম। লুচি, আলুমরিচ মাগুর মাছের ঝোল খেয়ে বড় হওয়া আমার সবসময় এয়ারপোর্ট কেমন যেন এলিয়েন লাগে। তুলনায় স্টেশনগুলোতে অনেক বেশি গমগমে প্রাচুর্য আছে। কার লোহার বার্থ নেই‌,কে ওপরে উঠতে পারবে না এসব ঝক্কি কিংশুক ম্যাজিকের মতো সামলে নিল।তার দায় দায়িত্ব অনেক!চারজন মহিলা সঙ্গে একজনের কন্যা এবং সে একা পুরুষ। যেটা শুনলাম আমরা ৬ জন বাদে আরও দুটি দম্পতি ভ্রমণে যাচ্ছে। একটু উদ্বিগ্ন হলাম। যদিও দিন যত গড়াবে,জানতে পারবো এই দম্পতিদয়ের মতো ভালো মানুষ খুব বেশি নেই। ট্রেন ছাড়লো। তার আগে বড় ঘড়ির নিচে শক্তি ট্রাভেলসের ম্যানেজার কি সব ব্যাগ-ট্যাগ হাতে ঝুলিয়ে দিল আমাদের। বিকেলের আলো মেলানোর আগেই এল স্ন্যাক্স। কেক ঝালমুড়ি চা। রাত বাড়ছে। টুকটাক গল্প। ডিনারে রুটি চিকেন আলুপটল ভেজ চপ চাটনী ও সন্দেশ। রাতে এত এলাহি খাওয়া দেওয়া অভ্যেস নেই মোটে। তবে ভ্রমণে নিয়ম নাস্তি, এই আর কি! কুয়াশা কুয়াশা ভোর। এনজিপি পার হয়ে গেছি। আলিপুরদুয়ার কুচবিহার... কেমন পিকচার পোস্টকার্ডের মতো জায়গা সব।কাচে নাক ঠেকিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলাম এলিফ্যান্ট করিডোর নজরে আসে কিনা। মানে দু একটা হাতি টাতি।

এবার আসাম। মস্ত বড় ব্রহ্মপুত্র ঝমঝম করতে করতে পার হলাম ।এবার গুয়াহাটি।বেশ হোটেল। নাম,সানগেতসর ।দেখলাম কামাখ্যা মায়ের মন্দির। সেদিনই।কারণ, পরদিন তো আবার সকাল -সকাল ঝোলাঝুলি তুলে রওনা হওয়া অরুণাচলের পথে। নীলাচল পাহাড়ের একদম ওপরে মন্দির। কিন্তু গর্ভগৃহের নাগাল পাবো কিনা জানিনা।থিকথিক করছে পুণ্যার্থী। তাই দূর থেকে মাকে দেখে,মার সিঁদুরের টিপ পরে পেন্নাম ঠুকেই চলে আসতে হলো। একটা কথা আগেভাগেই বলে নি, কন্ডাক্টেড ট্যুরে আমাদের দেখাশোনার জন্য ছিলেন তিনজন। ট্যুর ম্যানেজার চন্দন। আলপিন থেকে এলিফ্যান্ট সবকিছু ঘরে পৌঁছে দেয়ার জন্য তৈরি ,কালিপদ।আর এক আশ্চর্য রাঁধুনী যার নাম কার্তিক। আমাদের সন্দেহ হতো এরা রাতে ঘুমোয় না। জেগে থেকে চারবেলার অতি সুস্বাদু খাওয়াদাওয়া, মোচার ঘন্ট থেকে শুরু করে সিঙ্গারা, ফিস ফ্রাই পর্যন্ত তৈরি করছে। আমরা ভাবতাম এরা তিনজনই মানুষ নয়, দৈত্য। না চাইতে সবকিছু মুখের সামনে তুলে ধরছে। কে কে মঙ্গলবার নিরামিষ খায়, কার ডিমে এলার্জি, একবার শুনে নিয়েছে শুধু। তারপর ফেরার দিন পর্যন্ত ব্যবস্থার কোন নড়চড় ঘটেনি, প্রথম দিনের পর থেকে আমার পাতে কাঁচা লঙ্কা দিতে ভুল হয়নি কোনো।

যেতে যেতে যেতে যেতে জিয়া ভরলি নদীর সঙ্গে দেখা। এমন কবিতার মতো নাম দিয়েছিল কে জানতে ইচ্ছে করে। সঙ্গী যে মহিলা ও তাঁর স্বামী যাচ্ছেন,কখন যেন বলেছিলাম পান খেতে ভালোবাসি,খাওয়ার পর এখন টুক করে এসে পান দিয়ে গেলেন। জীবন যে কতকিছু তার বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে রাখে! পরদিন সকালে ভালুকপং । কী মজার নাম। এখানে এক রাত থাকবো। যেমন পাহাড়ি শহর হয়,রঙিন জামাকাপড়ে মোড়া মানুষজন,একটু আলো,একটু কুয়াশা। এরপর যাব দিরাং। সত্যি,স্বর্গীয় সৌন্দর্য! নদী, পাহাড়, ফুল ফুটে আছে। বেরিয়ে একটা অর্কিড রিসার্চ সেন্টারে কত রকমের অর্কিড দেখে আমরা তো দিশাহারা।ঘুরে বেড়ালাম। ছবি তুললাম।তারপর আবার নদীর সঙ্গে দেখা। কামিং নদী। পথে অজানা সব জলপ্রপাত।হোটেলে ঢুকেই আমরা ছুটলাম দিরাং মনাস্ট্রি দেখতে। পরিবেশ একদম অন্যরকম। ঝকঝকে তকতকে ।শান্ত। বুদ্ধ মূর্তি।তিব্বতি চিত্রকলা দেওয়ালে।অস্থির মন আপনিই নিভে আসবে।পরদিন সকাল আটটায় বেরিয়ে পড়া জবরদস্ত জলখাবার পেটে পুরে। আমার পেটরোগা বান্ধবীরা খেয়ে খেয়ে কাতর আর আমার মত ফুডি তো খেয়ে খেয়ে আরো ফুলে উঠছে। আমরা এগোচ্ছি।মেঘের পরে মেঘ জমেছে।

সেলা পাস। ১৩৭০০ ফুট উঁচুতে নিঃশ্বাস নিচ্ছি। আর এই প্রথম বরফ কুচির আস্বাদ নিলাম। আমার মনে শুধু নয় শরীরেও ।কারণ চোখে চশমার ফাঁক দিয়েই বরফ কুচি ঢুকে গেছে। আমি রোমাঞ্চিত এমন অভিজ্ঞতা আর কি জীবনে হবে!আমরা এগোচ্ছি ।মেঘের পর মেঘ জমেছে। আরে, বিশাল বিশাল ঝুলন্ত লোম ওয়ালা গরু। তার মানে চমরি গাই। এত চমকেছি যে কি বলব! ছোটবেলায় বাবা অ্যাডভেঞ্চারের গল্প বলতো।আমি আর বাবা চমরি গাইয়ের আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আহ্! এর মধ্যে প্রকৃতি ডাক দিল। গাড়ির আড়ালে বরফ পড়ছে এমন অবস্থায় বান্ধবীরা ঘিরে দাঁড়ালো। নিরুপায়। ফিরছি। অপার সৌন্দর্য। রংবেরঙের পাহাড়।যেখানে সেখানে কুচোকুচো ঝরনা।অবশেষে জং ফলস। একটা দেখার মত জলপ্রপাত। হাঁটু বাদ সাধছে।তাই একদম নিচে যেখানে জলপ্রপাত ঝরে পড়ছে অতদূর না গিয়ে উপর থেকেই দেখে সাধ মেটালাম। তারপর হোটেলে ফিরে গরম জলে গার্গল করতে বাধ্য হয়ে,লেপ আর কম্বলের তলায় শয্যা নিলাম।

ও! লিখতে ভুলেছি সেলাপাসের মতো জায়গায় অল্প বয়সী একটা ছেলে আর একটা মেয়ের সঙ্গে আলাপ হলো।ওরা বাইকে চেপে কৃষ্ণনগর থেকে এসেছে। ভাবা যায়!!পরদিন আকাশ ঝকঝকে! কিছুটা বিশ্রাম। কিছুটা তাওয়াং মনাস্ট্রি যাওয়া। এর মাঝে ভুরিভোজ গুলোর কথা আর লিখছি না।খাচ্ছি আর বিস্মিত হচ্ছি। তাওয়াং মনাস্ট্রিতেও উঠতে নামতে বেশ কষ্ট। কিন্তু কষ্টে যে মেওয়া ফলে সেটা অরুণাচলে এসে টের পাচ্ছি ক্রমশ।তারপর ওয়ার মেমোরিয়ালে গেলাম।চীনের যুদ্ধের সময় যেসব সৈনিক শহীদ হয়েছিলেন তাদের স্মরণে এই শ্রদ্ধার্ঘ্য।পরদিন প্রথমে গেলাম সাঙ্গেস্টার লেক।এখানে মাধুরী দীক্ষিত কী যেন সিনেমার শ্যুটিং করেছিল। তাই পাবলিক মাধুরী লেক নামেই চেনে বেশি।কী কুয়াশা কী রহস্য-ঘেরা এই হ্রদ । মেঘ আনাগোনা করছে।তার মধ্যে প্রবল বৃষ্টি শুরু হল।উচ্চতা বড় কম নয়। তাই অলরেডি একটু আধটু নিঃশ্বাসের কষ্ট হচ্ছে। গাড়িতে উঠে কর্পূর শুঁকলাম।কেমন ম্যাজিকের মতন কাজ দিল।শ্বাসকষ্ট কর্পূরের মতই উবে গেল যেন।এরপর বুমলা পাস। বৃষ্টি। বরফ। হেঁটে হেঁটে ভারত ও চীনের বর্ডারে যেতে হবে। উচ্চতা ১৫ হাজার ফুট, তাপমাত্রা -2 ডিগ্রি।

আমি পিছিয়ে পড়তেই আমাদের ম্যানেজার চন্দন এগিয়ে এসে হাত ধরল, আপনি ঠিক যেতে পারবেন দিদি। আমার সঙ্গে সঙ্গে চলুন।সে এক অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতা।তাকিয়ে দেখছি দূরের পাহাড় চোখের নিমেষে বরফে ঢেকে গেল। তো দু-একটা চৈনিক সৈন্য চোখে পড়ছে, যারা বর্ডারে পাহারা দিচ্ছে।আমাদের এত এনার্জি এমন অপরিসীম উৎসাহ এল কোথা থেকে কে জানে? লেংচে লেংচে হাঁফাতে হাঁফাতে আমি সকলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলছি, জয় হিন্দ। পরদিন বমডিলা যেতে হবে।যাওয়ার পথে যশোবন্ত গড় পার হচ্ছি, শুনলাম এই নামের বীর সেনাটি একাই এখানে শতিনেক শত্রুসেনার মোকাবিলা করে শেষে আত্মঘাতী হয়েছিলেন। আমাদের কিছুটা নিচে নেমে আবার ওপরে ওঠা।বমডিলা মেঘে মেঘে গড়া একটা শহর।ছোট্ট। দুপা হাঁটতেই পথ ফুরিয়ে যায়। আমাদের ম্যানেজার সখেদে বলল, আপনাদের জন্য মনাস্ট্রির গেস্ট হাউস ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলাম।পেলাম না। মেঘের মধ্যে জেগে ওঠা মনাস্ট্রি। আহা! থাকলে না জানি কত রহস্যময় লাগত সবকিছু।পরদিন গেলাম মনাস্ট্রিতে।এই মেঘ এসে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের, আবার একটু পরেই নীল আকাশ।

পরদিন ফেরা, রোজ ওরা গাড়িতে উঠলেই আমাদের লজেন্সের পুঁটুলি দিত। তার মধ্যে এক টুকরো আমসত্ত্ব থাকতো।ফেরার পথে মন অবসন্ন হয়।আর তাই গুয়াহাটিতে পৌঁছে একরাত যে হোটেলে থাকার ব্যবস্থা,সেখানে গ্র্যান্ড ফিস্ট।মাটন বিরিয়ানি আর চিকেন চাঁপ। ফাটাফাটি রান্না। মন বলে যতক্ষণ না সরাইঘাট এক্সপ্রেস হাওড়া স্টেশন পৌঁছোচ্ছে, তোমার বেড়ানো কিন্তু ফুরোয়নি জেনে রাখো...


Scroll to Top