তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
বিজন ঘরে

                                 

                                    

দুগগামণির কেবল বাঘমামা আছে। বাঘমামা একটা লোমওঠা  পুতুল বাঘ। এরা দু’জন ছাড়া কেউ নেই পরস্পরের। দুগগামণি, বাঘমামাকে কোলে নিয়ে হারানো মাকে খোঁজে। এদিকে, আর এক মা -- হাজার কাজের মাঝে মেয়ের সঙ্গে বসে দেখে ছোট্ট মেয়ে দুগগামণি একলা একলা ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুর্গাপুজোর মণ্ডপে, সে ক্ষুদ্র করতলখানি বিছিয়ে কেবল, ঘুম যায় । তার আগে সে ছিল অনাথ আশ্রমে। দুগগামণি টেলিভিশনের পর্দায় থাকে। মেয়ে খুঁজে বের করেছে।

সাত বছুরে মেয়ের মা, ভোর থেকে ছোটে -–কাজ করে -- ক্লান্তি  কাটাতে কফি খায় –-  দুপুরে মেয়ের সঙ্গে মিনিট দশেক দুগগামণিকে দেখে তার মনে পড়ে যায়, অনেকদিন আগের এক শিশুর কথা। দুগগামণির সঙ্গে তার একটিই মিল – একাকীত্ব। যে শিশুটির কথা মনে পড়ে, এ একা একা বই পড়ে – গান শুনে – ভাত খেয়ে  বড় হতেও একা একা সব করে। সিনেমা – কফি এই সব পার করে, বছর সাতেক আগে,  তার একখানি একরত্তি বন্ধু হয়েছে। সেও বড় হয়ে যাবে। মায়ের পাখার আড়াল থেকে বেরিয়ে নিজেই ডানা মেলে নির্মাণ করে নেবে আপন জগত। মা তাই কাজ খুঁজে নেয়। কাজ করে যায়। তার বন্ধু নেই – এ কথা শ্ত্রুতেও বলতে পারবে না। কিন্তু তারা পরিযায়ী পাখিদের মতো আসে। আবার কখন যে যায়! এই মা’টির ছেয়েও অনেক বেশি  একা লোক ঘোরে চারদিকে। ফেসবুকে নানা লেখা পড়ে, লোকে ইনবক্স করে, ‘ বড্ড একা লাগে , দিদি’। এদিকে সে লোকের হাজার ফলোয়ার – কমেন্টে ভিড় উপচে আসে। আসলে কী , আজকাল আমরা ‘ছবি’র জীবন যাপন করি। হাসিমুখের সেলফির পেছনে থাকে কাজল-লিপস্টিকবিহীন মেয়েটার ঘরের আঁধার আমরা দেখতে পাই না । চাইও না। ভার্চ্যুয়াল রিলেসনের দায় কম। আত্মিক সম্পর্ককে তো দিয়ে হয়ও কিছু! পেয়ে অভ্যস্ত জীবন আমাদের। দিতে শেখা হয়নি। তাই মেট্রো স্টেশনে- বহুতলে – নদীতে – সিলিং ফ্যানে স্বহত্যাকৃত মৃতদেহ দেখে, আমরা লিখি ‘রিপ’। রেস্ট ইন পিস লেখার সময়টুকু বাঁচিয়ে আমরা ফেসবুক করে যাই। রিল বানাই। একলা মানুষ কী-ই না করে! ছোলা ভিজিয়ে- আলুসেদ্ধ করে- বেসুরে গান গেয়ে  ভিডিও করে। কমেন্টে নিজেকে হাসির খোরাক বানায়। ওদিকে,গোপনে মরে থাকেন প্রতিবেশি বৃদ্ধ। পচা গন্ধ বেরলে, পুলিশে খবর যায়। সপরিবারে আত্মহত্যা করে অসহায় একা লোকজন। বিপদে পাশে পায় না পরিজনের হাত। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাখো বন্ধু যার – সে সুইসাইড নোট লিখে শেষ হয়ে যায়, স্রেফ একমাত্র প্রেমিকা/প্রেমিক ছেড়ে গেছে বলে। তার যে দুঃখ বলার দোস্ত নেই  - নেই বিশ্বস্ত কাঁধ, যেখানে মাথা রাখা যায় – নেই চোখের জল মুছিয়ে দেওয়ার আন্তরিক হাত – নেই কোনও মুখোমুখি বসার মুখ। ফলে কী করে সে এই পাহাড়প্রমাণ বিষাদ নিয়ে? কী করে কমায় বোঝা? ছোটবেলা থেকে তাকে শেখানো হয়েছে – টিফিন ‘শেয়ার’ না করতে। প্র্যাকটিস বুক শেয়ার না করতে। সে জানে – সে কেবল পাবে। হাত বাড়ানোর অভ্যাস নেই আজকাল কারো।

মা’টি, মেয়েকে পড়া থেকে তুলে, বন্ধুর বাড়ি নিয়ে যায়। খেলতে পাঠায়। নাচের ইস্কুলে যেতে বলে, বন্ধু পাবে বলে। দু’জনেই দুজনের বন্ধুদেরও বন্ধু হতে শেখে। তারপর, মেয়ে হইহই করে ফিরে আসে ইস্কুল থেকে। বিজন দুপুরে, ‘দুগগামণি ও বাঘমামা’ দেখতে দেখতে, একলা শিশুকে পথে-ঘাটে ঘুরতে দেখে মা যে কাঁদবেই মেয়ে বুঝে ফেলে। চোখ মুছিয়ে বলে, “দুগগামণি এবার মাকে পেয়ে যাবে দেখো, ও তো মায়ের কাছেই এসেছে কিন্তু জানে না এটাই ওর মা, আজ বিকেলে কফি খেয়ে এসো’, তারপর এক মুহূর্ত ভেবে শর্ত দেয়, ‘আমাকেও নিতে পারো কিন্তু কোরিয়ান বান খাওয়াতে হবে’। মা তাকে বলে না, তার ছেলেবেলা কেন ভ’রে ছিল একলা বিষন্ন সব দিনে। বিগত দিনের একাকীত্ব মুছে দেওয়া বন্ধুরা এসেছিল বলে, এখন সে জানে, আছে – কেউ আছে। থাকেও। কেবল খুঁজে নিয়ে দেওয়ার হাতখানি মেলে রাখতে হবে।


Scroll to Top