তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
গুরুত্বপূর্ণ হিউম্যান ডকুমেন্টেশান

হোমবাউন্ড :  পরিচালক: নীরজ ঘেওয়ান। অভিনয় : ঈশান খাট্টার, বিশাল জেঠওয়া, জাহ্নবী কপুর। ধর্ম প্রোডাকশনস

বার্ডস আই ভিউতে দেখা যাচ্ছে প্রশস্ত হাইওয়ে খাঁ খাঁ করছে, তার মাঝখানে নিথর হয়ে যাওয়া এক যুবকের মাথা কোলে তুলে নিয়ে আরেক যুবক বসে আছে। এই দৃশ্য শীততাপ নিয়ন্ত্রিত সিনেমাহল থেকে বেরিয়ে আসার অনেকদিন পরেও আপনার মনে থেকে যাবে। ২০২০ সালে যখন মারণ ভাইরাস করোনা পৃথিবীকে অস্থির করে তুলেছিল সেই সময় দেশ জুড়ে ঘোষণা হয় লকডাউন। তখন হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরার করুণ ছবি আমরা সবাই দেখেছি। তেমনই একটি ছবি ছিল মধ্যপ্রদেশের  হাইওয়েতে এক বন্ধুর নিথর দেহ কোলে নিয়ে বসে আছে আরেক বন্ধু। আর এই ছবির দুই বন্ধুর গল্প নিয়ে একটি প্রতিবেদন লেখেন সাংবাদিক বাশারাত পীর। নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ‘Taking Amrit Home’ শীর্ষক প্রতিবেদন অবলম্বনেই  উত্তর ভারতের পটভূমিতে  নীরজ ঘেওয়ান নির্মাণ করেছেন  অতুলনীয় চলচ্চিত্র উপাখ্যান, মহামারির ভয়াবহতাকে অতিক্রম করে যার আবেদন সুগভীর ও সর্বজনীন। নিঃসন্দেহে এই ছবি এই সময়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিউম্যান ডকুমেন্টেশান।

  কবি সিজার এ ক্রুজ বলেছিলেন, ‘Art should comfort the disturbed and disturb the comfortable.’ নীরজের ‘হোমবাউন্ড’ যথার্থ ভাবে যেন  সেই কাজটিই করেছে।  বন্ধুত্বের আখ্যানকে আশ্রয় করে পরিচালক সুনিপুণ ভাবে আমাদের দেশের ধর্মীয় গোঁড়ামি, জাতপাতের ইতরামি, সমাজের প্রান্তিক মানুষের অসহায়তা এবং মহামারির ভয়াবহতাকে তুলে ধরেছেন অত্যন্ত সূক্ষ্ম অথচ মর্মস্পর্শী আবেদনের মাধ্যমে।

 শোয়েব (ঈশান খাট্টার) আর চন্দন ( বিশাল জেঠয়া) নামে ছোটোবেলার দুই বন্ধু  তাদের পরিবারকে দারিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে চায়। আর সেই জন্য তাদের লক্ষ্য পুলিশে কনস্টেবলের চাকরি পাওয়া। তারা মনে করে মুসলিম বা দলিত হওয়ার জন্য যে সামাজিক অবমাননা সারা জীবন সহ্য করে এসেছে, পুলিশে চাকরি পেলে  সেই অবমাননার হাত থেকেও  মুক্তি পাওয়া যাবে। সমাজ তাদেরকেও মর্যাদার চোখে দেখবে। কিন্তু তারা দেখে সেখানে তাদের মতো লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ে সেই চাকরির জন্য ছুটছে, প্রতিটি পদের জন্য ৭১৬ জন দাবিদার। পরীক্ষা হয়ে গেলেও কবে তার ফলাফল বেরোবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

সিনেমায় বার বার শোয়েবের  মুসলিম পরিচয় কিংবা চন্দনের দলিত পরিচয় মানুষ পরিচয়ের চেয়ে বড়ো হয়ে ওঠা আমাদের সামাজিক পরিস্থিতির বাস্তব চিত্রকে তুলে ধরে । যার জন্য চন্দন নিজের পুরো নাম বলতে সংকোচ বোধ করে অথবা কলেজের ফর্মে নিজের জাত জেনারেল বলে উল্লেখ করে । একই ভাবে আমরা অফিসে শোয়েবকে ইসলামোফোবিক বসের কাছে বার বার হেনস্থা হতে দেখি । এই ঘটনাগুলি আমাদের দেশে সাধারণ মুসলিমরা যে ধর্মীয় গোঁড়ামির শিকার হচ্ছেন অতিরঞ্জিত না করেই তার একটা চিত্রকে তুলে ধরেছে । আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য যেখানে উঁচু জাতের লোকজন স্কুল শিক্ষককে জানায় যে তাদের ছেলেমেয়েরা চন্দনের মায়ের হাতে তৈরি খাবার খাবে না। এই দৃশ্য প্রতিনিয়ত আমরা খবরে যে ঘটনা দেখি তা আরেকবার স্মরণ করিয়ে দেয় । দলিত হওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টের  বিচারপতিকে যখন জুতো ছুঁড়ে মারা হয় আমাদের দেশে, তখন ‘হোমবাউন্ড’ যেন সমকালীন হিসেবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে ।

  দুই যুবকের গল্পের মাঝে স্বল্প পরিসরে পরিচালক নারী চরিত্রগুলিকেও সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন । যার মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য চন্দনের বান্ধবী সুধা ভারতী ( জাহ্নভী কাপুর)। যে নিজেও দলিত পরিবারের সন্তান, কিন্তু বাবা রেলে চাকরি করায়, অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্ন। সামাজিক লাঞ্ছনা তবু তাকেও সহ‍্য করতে হয়। সে চন্দনকে উৎসাহিত করে কনস্টেবলের  চাকরির পিছনে না দৌড়ে আরও পড়াশোনা করতে, যাতে প্রকৃত পক্ষে সমাজে স্বীকৃতি লাভ করতে পারে। চন্দনদের দিদির চরিত্রটিও বেশ আকর্ষণীয়, যে চন্দনকে মনে করিয়ে দেয় ছেলে বলেই এই চরম অভাবের সংসারেও সে পড়াশোনা বা নিজের ইচ্ছে মতো জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে । যে বিলাসিতার সুযোগ তার দিদিকে সমাজ ও পরিবার দেয়নি । পরিচালক আমাদের আরেকবার ভারতীয় সমাজে মেয়েদের অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন । অন্য একটি শক্তিশালী নারী চরিত্র আমরা পাই চন্দনের মাকে। শালিনী বাত্স এই চরিত্রে প্রশংসার দাবি রাখেন। চন্দন আর সুধার অপূর্ণ প্রেমের গল্পটিও সুনির্মিত। সুধার চরিত্রে জাহ্নভীকে যথাযথ লেগেছে ।

 নানা ঘাত-প্রতিঘাত এর মধ্যে দিয়ে জীবন দুই বন্ধুকে নিয়ে আসে  গুজরাতের সুরাটে। এক কাপড় কারখানায় শ্রমিকের  কাজ করতে বাধ্য হয় তারা । তারপর নেমে আসে করোনা মহামারির সেই ভয়াবহ অধ্যায় । দেশ জুড়ে ঘোষণা হয় অভিশপ্ত লকডাউন । খবরের কাগজের শিরোনাম থেকে কখন তাদের গল্প যেন আমাদের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে । লক্ষ লক্ষ অসহায় মানুষ, ঘরে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে , যাদের মধ্যে শোয়েব আর চন্দনও ছিল। তারাও আপ্রাণ চেষ্টা করছে ঘরে ফেরার । ছবির শুরুতে আমরা দেখি খেলার মাঠে জয়ের আনন্দে এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে পিঠে তুলে নিয়ে দৌড়চ্ছে। শেষে দেখি এক বন্ধু তার আরেক বন্ধুকে পিঠে নিয়ে মরিয়া হয়ে দৌড়চ্ছে তার জীবন বাঁচানোর জন্য । এভাবেই রূপকের মধ্য দিয়ে ‘হোমবাউন্ড’ হয়ে উঠেছে এক অসামান্য বন্ধুত্বের গল্প, মানবতার গল্প এবং অবশ্যই সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির চিত্রমালা ।

শোয়েবের চরিত্রে ঈশান খাট্টার অভূতপূর্ব । তাকে যোগ্য সঙ্গত করেছেন বিশাল জেঠওয়া। এই ছবির মূল সম্পদ নীরজ ঘেওয়ান, শ্রীধর দুবে, বরুণ গ্রোভার ও সুমিত রায়ের  লেখা টান টান চিত্রনাট্য। ছবির সিনেমাটোগ্রাফি ছবিকে সমৃদ্ধ করেছে এবং ভারতীয় সামাজিক ব্যবস্থার ভগ্ন রূপকে আরও প্রকট করে তুলেছে ।  ছবির সবচয়ে ইতিবাচক বিষয়, এই ছবি আপনার সামনে কোনো এজেন্ডা তুলে ধরে না দ, কিছু প্রশ্ন রেখে যায় ---এই রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক অস্থিরতার সময়ে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা অত্যন্ত জরুরি ।


Scroll to Top