তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
মানুষের অধিকার

দুটো ঘটনার কথা বলি। একটি বিখ্যাত পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেলেও একই নামে এবং পরিচয়ে আর একটি পত্রিকা চালু হতে পারে কিনা, এই বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিল সামাজিক মাধ্যমে। ধরা যাক ‘ক’ বাবু একজন প্রতিষ্ঠিত বর্ষীয়ান সাহিত্যিক; পত্রিকা বিষয়ে তিনি যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। তাঁর কথা উদ্ধৃত করে একজন লিখলেন যে ‘ক’ বাবু এই কাজকে সমর্থন করেন না। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য হল ‘ওঁর বয়স হয়েছে, ওঁকে নিয়ে আর কথা বাড়াব না’ এবং সেই কথার সমর্থনে পর পর মন্তব্য আসতে লাগল। অর্থাৎ আপনার বয়স যদি সত্তরের ওপর হয়, তাহলে আপনি যতই সক্রিয় থাকুন, ক্ষেত্রবিশেষে আপনি আসলে ‘দুধ-ভাত’। মুখে যতই বলা হোক যে বয়স একটা সংখ্যামাত্র, বাস্তবে একজন মানুষের বয়স হওয়া মানে যেন শুধু স্বচ্ছতাকেই হারিয়ে ফেলা, যতই তিনি সচল, সক্ষম থাকুন, তাঁর প্রাজ্ঞতা, অভিজ্ঞতা, জীবনবোধ এবং মতামত সবকিছু যেন শুধু বয়সের কারণেই অর্থহীন হয়ে যায়।

এর কিছুদিন আগের কথা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে উঠে প্রবীণ নাগরিকের ফাঁকা আসনে বসেছিল মেয়েটি। কিছুক্ষণ পরে এক বয়স্ক মানুষ উঠে সামনে এসে দাঁড়ালেন কিন্তু মেয়েটি আসন ছাড়তে রাজী নয়। সে নাকি এতক্ষণ খেয়াল করেনি ওটা প্রবীণদের আসন, এখন আসন ছাড়লে তাকে দঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই যেতে হবে অনেকদূর। বাসে অন্যান্য যাত্রীদের এমনকি কন্ডাক্টরের কথাও উপেক্ষা করে মেয়েটি বসেই রইল, তর্ক করতে লাগল; প্রবীণ মানুষটি দাঁড়িয়েই থাকলেন। কিছুক্ষণ পরে একটি অল্পবয়সী ছেলে উঠে তাঁকে বসতে অনুরোধ করল, তাতে তিনি আরোই সঙ্কুচিত হয়ে পড়লেন। মেয়েটিকে দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, যদি ওর বাবা বা জ্যেঠুকে এইরকম বাসে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে যেতে হয়, ওর কেমন লাগবে ! কি জানি হয়তো তাঁদের জন্যও মেয়েটি সেভাবে কিছু ভাবে না।

আজ মানবাধিকার দিবসের দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো মনে করতে ইচ্ছে হল। কারণ যে যে উপলক্ষে আমাদের মানবাধিকারের কথা মনে পড়ে এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলো তার মধ্যে পড়ে না। কিন্তু মানবাধিকার তো আসলে আইন মাত্র নয়, আমরা কি পারি আর কি পারি না, সেই বিষয়ে একটা সচেতনতা। বয়স এক অনিবার্য সত্য, কোনো অপরাধ নয়। প্রতিটি প্রবীণ মানুষের অধিকার আছে তাঁর মতন করে জীবনকে উপভোগ করা। ঠিক যেমন গায়ের রঙ, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, জাতি বা ধর্মের ভিত্তিতে কাউকে সামাজিক ভাবে বঞ্চিত করা যায় না, তেমনি বয়সের কারণে একজন মানুষকে প্রাপ্য সম্মান, সুবিধা বা জীবনের উপভোগ থেকে সরিয়ে রাখাও তাঁর মানবাধিকারকে লঙ্ঘন করে। শুধু অল্পবয়সীরই নয় অনেক মধ্যবয়সীরাও এই কথা ভুলে যান। দ্রুত বদলে যাওয়া সামাজিক পটভূমিতে, সন্তানদের দূরে থাকা প্রবীণেরা স্বাভাবিক কারণেই ক্রমশঃ একা ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। যাঁরা সন্তানদের সঙ্গে থাকেন এমনকি অতটা অথর্বও নন, তাঁরাও খাওয়াদাওয়া, সাজপোশাক, চলাফেরায় নানারকম পরাধীনতার মধ্যে দিন কাটাতে বাধ হন, যা তাঁদের মানবাধিকারের পরিপন্থী, এই কথাটা আজকে নিজেকে ও অন্যদের মনে করিয়ে দিতে ইচ্ছে হল।

কিন্তু মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব যে সরকারের এই বিষয়ে তাঁরা কতটা সচেতন ? আপনি যদি সরকারী কোনো দপ্তরে আপনার প্রাপ্য অর্থ বা পদোন্নতি বা স্থানান্তর (ট্রান্সফার) এর জন্য আবেদন করে থাকেন তাহলে আপনিই সবচেয়ে ভালো জানবেন শুধুমাত্র উপেক্ষা দিয়ে কি মাত্রায় নিষ্ঠুরতা দেখানো যেতে পারে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর আপনি অপেক্ষা করে থাকবেন আপনার প্রাপ্যের জন্য, চিঠির পর চিঠি, ইমেল, সব হারিয়ে যবে সরকারী দপ্তরের নীরবতার গর্ভে , উত্তর আসবে না, প্রাপ্য তো আসবেই না। এমনই একটি লড়াইয়ের কথা আমি জানি। একটি উচ্চশিক্ষিতা মেয়ে তার গবেষণার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে কিছু অর্থসাহায্যের প্রতিশ্রুতি (একে প্রজেক্ট বলে) পেয়েছিল, যার মধ্যে তার মাসিক বেতনও ধরা ছিল। সময়সীমা শেষ হয়ে বছরের পর বছর ঘুরে গেছে, শেষে সরকার বলেছে গবেষণার কাজের জন্য টাকা যা খরচ হয়েছে, মিটিয়ে দে্বে, কিন্তু শেষ ছ’মাসের মাইনে দেবে না। ভাবতে পারছেন ? সরকার একটি কর্মহীন মেয়েকে ছ’মাস বিনা মাইনেয় কাজ করতে বলছে ! তাও আগে বলেনি, কাজ করিয়ে নিয়ে বলছে মাইনে দেব না। এই মানবীর অধিকারও কি মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে ! তাহলে মৌলিক অধিকারের শুরু কোথায় ? শীতের আমেজ, বিয়েবাড়ি, হস্তশিল্প মেলা, আসন্ন নববর্ষ, এইসবের পাশাপাশি আজকের দিনে অধিকার ও দায়িত্ব নিয়েও কিছু কথা হোক।


Scroll to Top