
হিরোশিমা থেকে ফিরে লিখেছেন শ্রীমন্ত মিত্র
ফুকুওকা থেকে হিরোশিমা, এক শোকার্ত শহরে আমাকে নিয়ে এল শিনকানসেন। ৬ আগস্ট হিরোশিমা দিবস। তার কদিন আগে হোটেল থেকে ট্রামে চড়ে হিরোশিমা শান্তি স্মৃতি উদ্যানে পৌঁছলাম। অপ্রস্তুত ছিলাম, কতখানি ভয় ও শোক আমাকে গ্রাস করবে। আমি ইতিহাস দেখতে এসেছিলাম, কিন্তু ১৯৪৫ সালের পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের ৮০ বছর পরেও মানবতার ওপর চরম আঘাতের ক্ষতের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অসহায় মনে হল।
ওটা নদীর তীরে হিরোশিমা শান্তি স্মৃতি উদ্যান আপাতদৃষ্টিতে এক শান্ত সুন্দর জায়গা, তার ভয়াবহ অতীতে যেন কিছুটা সময়ের প্রলেপ। একসময় এটি ছিল এক প্রাণবন্ত শহরের কেন্দ্র, যা ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট পারমাণবিক বোমায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এখন ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে, পারমাণবিক আতঙ্কের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। নদীর ওপারে এটম বম্ব ডোম দাঁড়িয়ে আছে এক ধ্বংসস্তূপের মতো—তার ভাঙা দেওয়াল ভয় ছড়ায়, যেন চিৎকার করে বলছে, 'আর কখনও যেন এমন না হয়।' পর্যটক হিসেবে আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ালাম, ধ্বংসের নির্মম ছবির সামনে। ফলক পড়লাম, ' নিহতদের আত্মারা শান্তিতে থাকুক, আমরা এই ভয়ঙ্কর কাজ আর করব না।' এখানে ১,২০,০০০-এর বেশি নাম খোদাই করা, প্রতিটি জীবন যা এক মুহূর্তে নিভে গেছিল। তাদের হারানোর দীর্ঘশ্বাস যেন এখানকার বাতাসে মিশে আছে। কাছেই শান্তি অগ্নিশিখা অনির্বাণ, পারমাণবিক অস্ত্র বিলুপ্তির শপথে। কিন্তু সেই অঙ্গীকার কি আদৌ মানতে চায় আজকের যুদ্ধবাজ দেশগুলো?
শিশুদের স্মারক শান্তি স্মৃতিস্তম্ভ আমার ভেতরটাকে যেন ছিন্নভিন্ন করে দিল। সাদাকো সাসাকি, পারমাণবিক বিকীরণে লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত একটি মেয়ে হাজার কাগজের সারস তৈরি করেছিল। তার দ্বারা অনুপ্রাণিত, এটি বিশ্বের নানা দেশের শিশুদের পাঠানো রঙিন সারসে মোড়া। আমি কেঁদে ফেললাম—এই সারসগুলো, অসহনীয় যন্ত্রণার প্রতীক। শান্তি ঘণ্টা বাজালাম, সব পর্যটকই বাজান। তার শোকার্ত শব্দ যেন আমার আতঙ্ককে প্রতিধ্বনিত করল। একটি শব্দ যেন ক্ষতবিক্ষত এক শহরের কান্না। উদ্যানের চেরি ফুল আর পাশ দিয়ে বয়ে চলা শান্ত নদী সেই যন্ত্রণাকে আরও গভীর করল। প্রকৃতি নিজেই হারানো জীবনের জন্য কাঁদে।
৬ আগস্ট আসে যায়। কিন্তু আজকের এই হানাহানির পৃথিবীতে এবার একটু অন্যভাবে ভাবতে হবে। হিরোশিমার দিকে তাকিয়ে শপথ নিতে হবে, এমন ভয়াবহতার মুখোমুখি আমরা কিছুতেই দাঁড় করাব না আগামী প্রজন্মকে।