তালিকা
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
আধুনিক বাঙালির ফেভারিট লোকেশন
তিনি আছেন হাসি-কান্না- হীরা-পান্নায়

                            

'শেষের কবিতা'র শেষ কবিতাটা কী বল দেখি! শিলং -এর পাইন বন ঘেরা পথে হাঁটতে হাঁটতে প্রশ্ন করেছিলেন এক বিজ্ঞজন। কিশোরী উত্তর দিতে পারেনি। অথচ অমিত-লাবণ্যর পা ছুঁয়ে পড়ে থাকা এই পথে হাঁটার জন্য সে-ই তো ব্যাকুল হয়েছিল। রিলবং-এর ব্রুকসাইড বাংলোয় ১৯১৯ সালের অক্টোবরে তিন সপ্তাহ কাটিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। দেবদারু গাছের সারি, পাইনের ছায়াপথ, পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি ঝর্ণা আর এখানকার নির্জনতা এত মুগ্ধ করেছিল কবিকে যে কয়েক বছর পর 'শেষের কবিতা' উপন্যাস লেখার সময় পটভূমি করলেন একেই। অমিতর কথার খেলা এই প্রকৃতির রঙ মেখে বসন্তের বাতাস বইয়েছিল লাবণ্যর মনে। সেই মুহূর্তে কিশোরীর মনে হয়েছিল, তবে কি রবীন্দ্রনাথকে যতটা ভাবে, ততটা ভালোবাসে না সে? কিন্তু তা তো সম্ভব নয়। ঐ একজনই তো আছেন হাসি-কান্না- হীরা-পান্নায়। আরও বড়ো হয়ে সে বুঝল, জীবনে যাকে জড়িয়ে নেয় মানুষ, তাকে মনে পড়ে না অহরহ। সেই প্রাণসখা মিশে থাকেন অস্তিত্বের গভীরে, রোজকার অভ্যেসের আড়ালে। রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখেছেন, 'তোমায় কি গিয়েছিনু ভুলে/তুমি যে নিয়েছ বাসা জীবনের মূলে/ তাই ভুল/ অন্যমনে চলি পথে, ভুলি নে কি ফুল, ভুলি নে কি তারা/ তবুও তাহারা/ প্রাণের নিঃশ্বাস বায়ু করে সুমধুর/ভুলের শূন্যতা মাঝে ভরি দেয় সুর।'

মাঝবয়স পেরিয়ে শিলাইদহ, শান্তিনিকেতন তো বটেই, লন্ডনের শহরতলীতেও রবীন্দ্রনাথের খোঁজ। টিউব স্টেশন হ্যাম্পস্টেড থেকে বেরিয়ে গুগল ম্যাপ দেখে পৌঁছে যাওয়া তাঁর বিলেত বাসায়। ১৯১২ সালে পুত্র রথীন্দ্রনাথ আর পুত্রবধূ প্রতিমাকে নিয়ে যেখানে কিছুদিন ছিলেন কবি। লন্ডন টিউবে ' গীতাঞ্জলি'র পাণ্ডুলিপি হারানো, পরে ফিরে পাওয়া, বন্ধু উইলিয়াম রঠেনস্টাইনের মাধ্যমে সুইডিশ অ্যাকাডেমিতে সেটি জমা পড়া, এই সব ঐতিহাসিক ঘটনার পটভূমি এই আপাত সাধারণ দোতলা বাড়িটি। পরের বছর শান্তিনিকেতনে এক জ্যোৎস্না রাতে কবির হাতে পৌঁছল টেলিগ্রাম, সাহিত্যে নোবেল জয়ী রবীন্দ্রনাথ। এশিয়া মহাদেশের প্রথম নোবেল প্রাপ্তি।

লন্ডনের মেঘলা আকাশ থেকে ঝরে পড়া টিপটিপ বৃষ্টি যেন তাঁর আশীর্বাদ। হ্যাম্পস্টেডের নিরালা বনপথ ধরে ফিরছি আর নিজের মনে উচ্চারণ করছি, 'তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান;/গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।/ হে বন্ধু, বিদায়।' 'শেষের কবিতা' র শেষ কবিতার শেষ দুটি লাইন। আসলে অমিতকে লেখা লাবণ্যর শেষ চিঠি।


Scroll to Top