
বহুকাল পর এনকাউন্টার ইস্যুতে বিতর্কের মেঘ ঘনালো পশ্চিমবঙ্গের আকাশে। জুলাই থেকে অক্টোবর, চারমাসের মধ্যে তিন তিনটি পুলিশি এনকাউন্টারের ঘটনা, শেষ দুটি আবার চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে। ষাটের দশকের শেষ থেকে সত্তরের মাঝামাঝি পর্যন্ত নকশাল দমনে রাষ্ট্রের এই কৌশল দেখেছে বাংলা। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর যৌথ অভিযানে সেই সময়ে নিহত হন বহু রাজনৈতিক কর্মী। বহু নকশাল তরুণকে রাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে কিংবা ভুয়ো এনকাউন্টারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ভোরের আলো ফোটার আগে বন্দীকে প্রিজন ভ্যানে করে ময়দানে নিয়ে গিয়ে বলা হত, ছেড়ে দিলাম, দৌড়ে পালা। দৌড়নোর সময় পিছন থেকে গুলি করা হত। পুলিশের রিপোর্টে লেখা হয়, পালানোর চেষ্টা করায় গুলি করা হয়েছে। একটা ঘটনা সেই সময় বেশ আলোড়ন ফেলেছিল। ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার বেলেঘাটায় ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র অশোক বসুসহ চার যুবককে গভীর রাতে ধরে এনে দেওয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। সত্তরের দশকের পর দীর্ঘকাল এই রাজ্যের সঙ্গে এনকাউন্টার শব্দটির কোনও সম্পর্ক ছিল না। বামফ্রন্ট আমলে জঙ্গলমহলে মাওবাদী দমনে যে কটা এনকাউন্টার হয়, তা সাময়িক বিতর্ক সৃষ্টি করলেও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সম্ভবত মাওবাদীদের সঙ্গে সমাজের তথাকথিত মূলস্রোতের বিচ্ছিন্নতার কারণে মানুষ বিশেষ মনে রাখেনি অপারেশন লালগড়। তৃণমূলের জমানায় ২০১১ সালের নভেম্বরে পশ্চিম মেদিনীপুরের বুড়িশোল জঙ্গলে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে এক রুদ্ধশ্বাস এনকাউন্টারে নিহত হন মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য তথা চালিকাশক্তি কিষেনজি। সেটাও বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই দেখেছে রাজ্যবাসী।
লক্ষ্য করার বিষয়, পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে অরাজনৈতিক অপরাধে অভিযুক্ত বা আসামীর এনকাউন্টারে নিহত হওয়ার ঘটনা একেবারেই বিরল। আর সেজন্যই বিজেপি সরকার আসার পর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। প্রথম ঘটনা বারুইপুরে এবছর জুলাই মাসে। এক নাবালিকাকে গণধর্ষণ ও খুনের প্রধান অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য পুলিশ নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে যায়। পুলিশের দাবি, সেই সময় অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায়, যার ফলে তার মৃত্যু হয়। দ্বিতীয় ঘটনা গাইঘাটা এনকাউন্টার। ২৬ অক্টোবর গভীর রাতে এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের মূল অভিযুক্ত প্রহ্লাদ দাসকে নিয়ে পুলিশ ক্রাইম সিন পুনর্নির্মাণে যায়। অভিযোগ ওঠে, সেখানে প্রহ্লাদ আচমকা এক পুলিশ অফিসারের রিভলভার ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালায় এবং পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। পুলিশের পাল্টা গুলিতে সে নিহত হয়। তৃতীয় ঘটনা মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ানে, ২৭ অক্টোবর। বিজেপি কর্মী সুজিত মণ্ডল খুনের মামলার অন্যতম প্রধান আসামি সামাউল শেখকে পুলিশ নিয়ে গেছিল সমশেরগঞ্জের পুরাতন ডাকবাংলো এলাকায় ক্রাইম সিন পুনর্নির্মাণের জন্য। পুলিশের দাবি, সেখানেও অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে তিন রাউন্ড গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালালে তার মৃত্যু হয়। লক্ষণীয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই এনকাউন্টারের প্যাটার্ন এক। পুলিশকে আক্রমণ ও আত্মরক্ষার্থে পুলিশের গুলি। কিন্তু যে প্রশ্নগুলোর উত্তর নেই তা হল -এক, সব ক্ষেত্রেই জখম নয়, মৃত্যু হচ্ছে। দুই, দাগী নয় এমন অপরাধীরা কীভাবে সাহস করে পুলিশকে আক্রমণ করছে বা রিভলবার ছিনিয়ে নিচ্ছে। তিন, জীবনে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার না করা লোক কীভাবে তা চালিয়ে দিচ্ছে। চার, সুপ্রিম কোর্ট এনকাউন্টারের তদন্ত বাধ্যতামূলক করা সত্বেও সেই তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসছে না কেন।

স্বাভাবিকভাবেই বিরোধীরা আর মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ধারাবাহিক 'বিচারবহির্ভূত হত্যার' বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। মানুষ বলছে, পশ্চিমবঙ্গ কি তবে যোগী আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশে পরিণত হল, যেখানে পুলিশি এনকাউন্টার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা? উত্তর প্রদেশ পুলিশের রিপোর্ট বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২৬, এই সময়ে ১৭ হাজার ৪৩টি এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অনেকগুলোই ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময়ে পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে পালানোর কারণে ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। যোগী আদিত্যনাথের মতই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও অপরাধ, বিশেষ করে নারী নির্যাতনের ঘটনায় জিরো টলারেন্স নীতির কথা বলেন। সেই সঙ্গে তিনি ক্ষমতায় এসেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন, 'আমরা সরকারে এলে ধর্ষকদের কোর্টে পাঠাব না। সকালে জমা করব, বিকালে খরচ করব।' সেই জমা-খরচের হিসেব মেলাতেই কি পুলিশ এমন 'ট্রিগার হ্যাপি' হয়ে উঠেছে? এপ্রশ্নও তুলছেন অনেকে।

সাম্প্রতিক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআরের সহ-সভাপতি রঞ্জিত শূর লিখেছেন, 'এনকাউন্টারের গল্প সাজানোর জন্যই কি রাত ১২টায় হাত খোলা রেখে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? বন্দি পালানোর চেষ্টা করলে তার পায়ে বা কোমরের নিচে গুলি করার কথা, তাহলে হত্যা করার জন্য গুলি কেন করা হল? পুলিশের রিভলবার কীভাবে ছিনতাই হল? এত সোজা?
পুরো পরিস্থিতির প্রাথমিক পর্যালোচনায় আমরা মনে করি, পুলিশ এনকাউন্টারের গল্প সাজিয়েছে। আসলে এনকাউন্টারের নামে ভূয়ো সঙ্ঘর্ষে হত্যা করা হয়েছে - ঠিক যেভাবে বারুইপুরে করা হয়েছিল।'
মমতা তৃণমূলের সাংসদ সৌগত রায় বলেন, 'এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও সরকারের উচিত এই বিষয়ে তদন্ত করা ও স্পষ্টভাবে সত্যিটা জনসমক্ষে তুলে ধরা।'
এনকাউন্টারের প্রশংসায় অবশ্য বিবৃতি দিয়েছেন শাসকদলের নেতা মন্ত্রীরা। দিলীপ ঘোষ বলেন, 'আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে, খুনি পালাচ্ছিল, এনকাউন্টার হয়েছে। বিচারের আওয়াতায় আনতে হবে, আইনের উপরে কেউ নয়। কিন্তু কেউ আইন অমান্য করলে তার সঙ্গে এমনই হবে। পুলিশের উপর মানুষের আস্থা হারিয়ে গেছে, সেই আস্থা ফেরাতে এমন কাজ পুলিশকে করতে হবে।'

অনেকসময় দেখা যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, তাঁদের আত্মীয়- বন্ধু বা প্রতিবেশীরা এই ধরনের এনকাউন্টারে সন্তোষ প্রকাশ করছেন। সেটা স্বাভাবিক। বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতার পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক 'শাস্তি' তাঁদের হয়তো কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। শাসকদলও মনে করছে, এভাবে জনগণের আস্থা অর্জন জরুরী। কিন্তু একথা তো মানতেই হবে যে এই পদ্ধতি ভ্রান্ত, অন্যায়, অসাংবিধানিক। আইনি পথে অভিযুক্তের বিচার হবে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাজা হবে। এই নিয়মের বাইরে যা কিছু ঘটে তা আসলে ব্যতিক্রম। আইনের ফাঁক গলে ব্যতিক্রমকে নিয়ম বানানো যায় না। এনকাউন্টার নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের কড়া নির্দেশে রয়েছে, আত্মরক্ষার অজুহাত দেখালেই পুলিশ এনকাউন্টারে সম্পূর্ণ আইনি সুরক্ষা পেয়ে যায় না। পরিস্থিতি অনুযায়ী বলপ্রয়োগ কতটা জরুরি ছিল তা প্রমাণ করতে হয়।