
একশো বছর হল তাঁর, গুরু দত্তের। মাত্রই আটটি হয়তো ছবি, কিন্তু সেই ছোট্ট সীমানার মধ্যেই, সেই পাঁচের দশকে, স্বাধীনতা-উত্তর ভারতীয় ছায়াছবিতে সিনেমা তাঁর আঙুলে কবিতার মায়ারঙে রঙিন হয়ে উঠেছিল। সিনেমা যদি নিছক গল্প বলার মাধ্যম না হয়ে শিল্পীর আত্মারই এক অন্তর্গত মায়াদর্পণ হয়ে ওঠে, প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল একমাত্র তখনই জন্ম হতে পারে একজন গুরু দত্তের।
তিনি নিছক পরিচালক ছিলেন না, বরং ছিলেন সেই কবি, যাঁর কবিতার কলম ছিল আলো-ছায়ায় গড়া ছায়াছবির বিষণ্ণ মায়াআলোয় ভেজা । তাঁর প্রতিটি ফ্রেম আসলে সেইসব দীর্ঘশ্বাস, যা সেলুলয়েডের ফিতেয় চিরকালের জন্য খোদাই রয়ে যাবে বলেই নির্মিত। । গুরু দত্ত তো আসলে সেই শিল্পী, যে মানুষটা খ্যাতির আলোয় দাঁড়িয়েও নিজের ভেতরের অন্ধকারের উপাসনাই করে গেছেন আজীবন।
নিজস্ব ভাবনার দুনিয়াটাই তাঁর ক্ষেত্রে ছিল এক অদ্ভুত মায়ার জগৎ, যেখানে সাফল্য মানেই একলা নিঃসঙ্গতা। আর প্রেম ? সে তো কাগজের ফুলের মতো সুন্দর, কিন্তু একই সঙ্গে প্রাণহীন। আর তাঁর চরিত্ররা—সে 'পিয়াসা'-র কবি চরিত্র বিজয়ই হোক বা 'কাগজ কে ফুল'-এর সুরেশ—আসলে কেউই কাল্পনিক নয়, বরং তারা সবাই গুরু দত্তের নিজের আত্মারই ছায়ায় গড়া ছবির পর ছবি, যারা একব নিঃসঙ্গ অনুভূতিহীন পৃথিবীতে নিজেদের শিল্পের মূল্য খুঁজে বেড়ায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই পৃথিবী শিল্পীর প্রতিভাকে সম্মান জানাতে পারে কেবল তার মৃত্যুর পর। তাঁর সিনেমাগুলো তাই জীবনের জয়গান গায় না, বরং শিল্পের জন্য উৎসর্গীকৃত এক জীবনের অমোঘ পরাজয়ের মহাকাব্য রচনা করে যায় কেবল, ফ্রেমের পর ফ্রেমে। তিনি আলো দিয়ে যে ছবি আঁকতেন, আর ছায়া দিয়ে সেই ছবিকে দিতেন ছায়া সমুদ্রের গভীরতা।
গুরু দত্তের জীবন ছিল তাঁর চলচ্চিত্রের মতোই এক করুণ চিত্রনাট্য, যেখানে শেষ অঙ্কে আলো নিভে যায়। খ্যাতির শিখরে থেকেও তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ, ভালোবাসার কাঙাল। তাঁর অকালমৃত্যু শিল্পের জন্য এক শহীদের আত্মাহুতি। কিন্তু শিল্পী মরে গেলেও তাঁর শিল্প বেঁচে থাকে। গুরু দত্ত এক পরাজিত বিজয়ী। জীবনে যা কিছু চেয়েছিলেন, তার অনেক কিছুই হয়তো পাননি, কিন্তু তিনি এমন কিছু সৃষ্টি করে গেছেন যা তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে।