
ভোটের বাজারে অ্যান্টি ইনকাম্বেন্সি কথাটা যত শোনা যায়, প্রো ইনকাম্বেন্সি কথাটা যত শোনা যায় না। বিহারের জনগণ জারা হটকে এই প্রো ইনকাম্বেন্সির পক্ষেই দাঁড়ালেন। সিলভার জুবিলির দিকে এগিয়ে দিলেন নীতীশ সরকারকে। শুধু তাই নয়, বেজায় খুশি হলেন মোদিজী। নীতীশ কুমারের জেডিইউকে একেবারে পকেটে পোরার যে ছক কষছিলেন, সেটাও সফল হল। এবারের ভোটে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিজেপি। ১০১ টি আসনে লড়ে ৯০ টিতে জেতা কি মুখের কথা! সুতরাং এবার ইচ্ছেমত নাচানো যাবে নীতীশ সরকারকে। গতবার একটুর জন্য সরকার গড়তে না পারলেও যার মুকুটে ছিল এই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পালক, সেই আরজেডি এবার খুবই খারাপ ফল করেছে। মুখ থুবড়ে পড়েছে মহাগঠবন্ধন। ৩৬ -এর তরুণ তেজস্বীকে ভরসা না করে ৭৪-এর বৃদ্ধ নীতীশকে ভরসা করেছেন বিহারের মানুষ। আর ত্রিমুখী লড়াইয়ে ময়দান কাঁপানোর হুঙ্কার দিয়েছিলেন যে প্রশান্ত কিশোর, তাঁর জনসুরাজ পার্টির কথা না বলাই ভাল। খাতাই খুলতে পারেনি তারা।

ভোটের আগে পরে বেশ কিছুটা সময় বিহারের নানা প্রান্তে ঘুরে টের পেয়েছিলাম নীতীশ হাওয়া। তবে এত আসন পাবে এনডিএ, ধারণা করতে পারিনি। নির্বাচনী আচরণবিধি লাগু হওয়ার ঠিক আগে মহিলাদের অ্যাকাউন্টে দশ হাজার টাকা করে জমা পড়াটা ছিল মাস্টারস্ট্রোক। মনে পড়ল, পাটনায় লালুপ্রসাদ যাদবের বাড়ির সামনে অপেক্ষা করার সময় পাশে পার্ক করে রাখা এক মিডিয়া হাউসের গাড়ির চালক বলছিলেন, 'আমার ফ্যামিলিতে ৭০ হাজার ঢুকেছে।' ভেবে দেখুন, একটা নিম্নবিত্ত পরিবারে আচমকা আকাশ থেকে পড়ার মত নয় কি এই টাকা? সেই জায়গায় ইন্ডিয়া জোটের প্রতিশ্রুতি, ক্ষমতায় এলে মাসিক আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়া হবে মহিলাদের। কিন্তু প্রবাদ বলে, ঝোপে থাকা দশটা মুরগির থেকে হাতের একটা ভাল। এছাড়া পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য এনডিএর প্রতিশ্রুতি, 'আর যেতে হবে না বিহারের বাইরে। এই যে ছট পুজোর ছুটিতে এসেছ বাড়িতে, সবাইকে নিয়ে ভোট দাও। আমরা ঘর ঘর নোকরির ব্যবস্থা করছি।'
সত্যি কতটা উন্নয়ন হয়েছে বিহারে গত কুড়ি বছরে? হাইওয়ে থেকে গ্রামের ভেতরে ঢুকলে ভাঙাচোরা রাস্তা, মোকামা-রাজগীরের মত ছোট শহরের খারাপ পরিষেবা, অল্পখ্যাত স্টেশনগুলোর অকথ্য হাল দেখলে ডবল ইঞ্জিন সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে ঘোর সন্দেহ জাগবে। তাহলে বিহারের মানুষ কিসের ভরসায় এমন ঢেলে ভোট দিলেন এনডিএকে? সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, 'জঙ্গলরাজ'-এর আতঙ্ক ফিরিয়ে আনতে চান না তাঁরা। লালুপ্রসাদের আমলের অরাজকতার স্মৃতি এখনও রয়ে গেছে মাঝবয়সীদের মনে। আর কমবয়সী যারা দেখেনি সেই সময়, তারা গল্প শুনেছে বড়দের কাছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা 'জলাঞ্জলি' যাওয়ার ভয়ে তারা তেজস্বী যাদবের উপর বাজি রাখতে নারাজ। আমাকে সরাসরি প্রশ্ন করলেন ভাগলপুরের প্রবাসী বাঙালিদের 'দাদা' বিলাস বাগচী, 'এই যে আপনি ঘুরে ঘুরে ভোটের খবর করছেন, আগেকার বিহার হলে সাহস করতেন?'
এবার বিহার বিধানসভা নির্বাচনকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিল সব দল। নরেন্দ্র মোদি থেকে অমিত শাহ, রাহুল গান্ধী থেকে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী - হেভিওয়েট নেতারা ঘনঘন উড়ে এসেছেন প্রচারে, নীতীশ কুমার আর তেজস্বী যাদব চরকির মত পাক দিয়েছেন গোটা রাজ্য। তবু বিজেপির দিকে পাল্লা এমনই ভারি হল যে মহাগঠবন্ধনকে লজ্জায় পড়তে হল। কংগ্রেস নিজেও ডুবল, ইন্ডিয়া জোটকেও ডোবাল। হরিয়ানায় ভোট চুরির 'হাইড্রোজেন বম্ব' ফাটিয়েও সুবিধা করতে পারলেন না রাহুল।বিহারের জনগণ প্রমাণ করলেন, তাঁরা বদল চান না। চান স্থিতাবস্থা।