
বলা যেতে পারে যুদ্ধ হল , কিন্তু সেটা হল সেয়ানে সেয়ানে। দুমদাম কয়েকশ মিসাইল হানা,কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি আর কয়েকশ মানুষের মৃত্যু হল বটে, ইরানের শাসন বদলের ফাঁকা আওয়াজ আর পাল্টা হুমকি হল, কিন্তু আসলে দুপক্ষই টনটনে জ্ঞান নিয়ে ভাঁড়ে মা ভবানিকে অক্ষত রাখতে সংযম পালন করে গেল।ইজরায়েল একবারের জন্যও ইরানের মূল তেলের খনি এলাকায় বোমা মারে নি, কারণ জানে তাতে বিশ্বে তেলের টানাটানি পড়লে নিজের গাটের কড়ি দিয়ে তার বর্ধিত দাম চুকাতে হবে। অন্যদিকে অনেক হুমকি দিয়েও ইরান হারমুজ প্রণালী বন্ধ করে নি, তাতে তার নিজেরও তেল রপ্তানি বন্ধ করে নিজের পায়ে নিজেকেই কুড়ুল মারতে হয়। এই হিসেবের ফলে বিশ্বে তেল সরবরাহ অক্ষুণ্ন ছিল। সব মিলিয়ে কানের পাশ থেকে তির চলে গেল । বিশ্ব অর্থনীতি হাফ ছেড়ে স্বাভাবিক হল।
একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় গত কয়েকমাস ধরেই বিশ্ব অর্থনীতি ভুগছে নানা অনিশ্চয়তায়। তার উপর ইরানের সঙ্গে ইজরায়েলের এই যুদ্ধ গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ রাজনৈতিক সমীকরণে শঙ্কার কালো মেঘ জমিয়েছিল। যুদ্ধ আর দুদিন বাড়লেই ইরান বন্ধ করতে বসেছিল তার হারমুজ পয়েন্ট, যেখান থেকে বিশ্বের তেল সরবরাহের ১২ শতাংশ চলাচল করে, আর সেই পদক্ষেপ ইরান নিলে সব থেকে আঘাত আসতো বিশ্ব বাজারে তেলের দামে।ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে এমনিতেই তেলের দাম বেড়ে ছিল, ইরান ইজরায়েল যুদ্ধে সেটাই একদিনে বেড়ে হয়েছিল ৭৫ মার্কিন ডলার, এই দর বাড়ছিল।এমনটা চলতে থাকতো যদি আরও কিছুদিন যুদ্ধ চলতো। ট্রাম্পের ঘোষণায় যুদ্ধবিরতির ফলে তেলের আন্তর্জাতিক দাম কিছুটা স্থির, ফলে হাফ ছেড়ে বাঁচল প্রায় সব দেশ। রক্ষা পেল সাধারণ মানুষ ফের দাম বৃদ্ধির কোপ থেকে।
১৩ ই জুন। ইরানের উপর আছড়ে পড়ল ইসরাইলের ক্ষেপণাস্ত্র আর সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিতে শুরু হলো দামামা। রাতারাতি এক রাতের মধ্যে ৭% দাম বেড়ে গেল অপরিশোধিত তেলের। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল ইনডেক্স লাফিয়ে ব্যারেল পিছু ৮০ মার্কিন ডলার হয়ে গেল! তারপর থেকে শুধুই আশঙ্কা।একাধারে বাড়তে পারে তেল আর সোনার দাম।কারণ ইতিমধ্যে সমস্ত দেশে শেয়ার বাজারে ধাক্কা লেগেছে। মার্কিন ডলারের দাম নিচের দিকে।যুদ্ধ শুরুর আগেই ট্রাম্পের শুল্ক হুমকিতে মার্কিন ডলারের উপর ব্যাপক চাপ পড়েছিল।এই যুদ্ধে তার প্রভাব যে আরও নেতিবাচক হবে বলাই বাহুল্য।ইতিমধ্যে ঋণের বাজারে মার্কিন বন্ডের দামও কমছে।তাই আর বেশি ঝুঁকি নয়।ইজরায়েলের বহুদিনের আবদার,তাছাড়া পরমাণু কর্মসূচি প্রশ্নে ইরানকে একটু সবক বোঝাতে হবে ,তাই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত না করেই তিনটি পরমাণু কেন্দ্রে বাংকার বাস্টার দিয়ে আক্রমণ করেই একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে জোর করেই ইজরায়েলকে নিরস্ত্র করলেন ট্রাম্প, নইলে , ইরানের হুমকি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে ব্যাপক চাপ পড়বে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির উপর,যার জন্য চড়া মাশুল শেষে গুনতে হবে আমেরিকাকেও। তাছাড়া ট্রাম্প এটাও বুঝেছেন যে সাকুল্যে ইরান আক্রমণ বা ইরানের নেতৃত্ব বদলালেও তাতে দীর্ঘমেয়াদে লাভ নেই।ইরান থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে তেল আসে ,তার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই তেল বিশ্ববাজারে আসা বন্ধ করে দিয়েছে প্রায়। এরপর নতুন করে ওই তেল আন্তর্জাতিক খোলাবাজারে বিক্রি হলেও ব্রেণ্ট ক্রুড ওয়েলের ইনডেক্সে খুব বেশি তারতম্য হবে না। যুদ্ধ বাড়লে রাশিয়ার তেল সে জায়গা নেবে, তাতে পুতিনের লাভ, যেটা মোটেই চান না ট্রাম্প।তার চাইতে যুদ্ধ বন্ধ রাখা ভালো। ইরানের তেল সবচেয়ে বেশি নেয় চীন, ভারতের মতো কিছু দেশ। কিন্তু এসবের থেকে অনেক বড় গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হচ্ছে হারমুজ প্রণালী'র স্বাভাবিকতা, যার উপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ। এর উপর নির্ভর করছে বিশ্বতেলের বাণিজ্য, এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইরান সেখানে আঘাত করবে ফলে এক ধাক্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ কমে যেতে পারে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ যা কার্যত ভয়ংকর অবস্থা সৃষ্টি করবে। এটা বুঝেই কোথায় থামতে হবে। তাই গণ্ডি কেটে ইসরাইলকে নিরস্ত্র করে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেন ট্রাম্প।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে তেমন প্রভাব পড়লো না , কারণ তেলের দাম বাড়লো না। বস্তুত ইসরাইল আক্রমণ করবার আগের দিন যে অপরিশোধিত তেলের যে দাম ছিল তার থেকেও বিশ্ব বাজারে কম দাম এখন। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের এই অবস্থা এখন কেন ? কারণ যখন যুদ্ধ বেধে ছিল তখন প্রতিটি দেশের তেলের ভান্ডারে ছিল যথেষ্ট মজুত। আর বিশ্ব বাজারে দুমাস পর কোন দাম হবে( যার ভিত্তিতে তেলের ফিউচার কন্ট্রাক্ট প্রাইস ওঠানামা করে ) সেই দর নতুন করে বাড়ার আগেই যুদ্ধ থেমে গেল। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধের পর কিংবা হামাসের সঙ্গে ইসরাইলের লড়াইয়ের পর তেলের দামে যে পরিবর্তন ঘটেছিল, ইরান - ইজরায়েল যুদ্ধে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হবে ভেবেও শেষ পর্যন্ত তা থমকে গেল। বিশ্ব বুঝে গেল,যুদ্ধ যাই হোক, ইরানের তেলের ভান্ডারে কোনো আঘাত আসছে না,আর তেলের সরবরাহে টান পড়বে না।১২ দিন যুদ্ধ চলাকালীন ইরান যুদ্ধের খরচ তুলতে ৪৫ শতাংশ তেল রপ্তানি বাড়িয়ে দিয়েছিল। ইরানের তেল নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা তাই বিশ্বতেলের বাজারে পড়ে নি। স্ট্যান্ডার্ড এন্ড পুওর গ্লোবালের অপরিশোধিত তেল বাজারের গবেষণা শাখার প্রধান জিম বুরখার্ড জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে আশঙ্কায় তেলের দাম তখন বাড়ে যখন প্রকৃতই সরবরাহে টান পড়ে।ইরানের ওপর আক্রমণ হলেও তেল সরবরাহ কমে নি, বরং বেড়েছিল, তাই যুদ্ধের আগে যে দাম ছিল, যুদ্ধের পর তার নিচে নেমে গেছে এবং আরও কিছুদিন বলা যেতে পারে, ফের তেমন কিছু না ঘটলে অপরিশোধিত তেলের দাম বিশ্ব বাজারে কমই থাকবে।
একদিকে ইরান ইজরায়েল যুদ্ধবিরতি ( বন্ধই বলা যেতে পারে! ) ও তেলের দাম নিয়ে অনিশ্চয়তা কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের সব দেশের শেয়ার বাজারে স্বাভাবিক ছন্দ দেখা যাচ্ছে।ডলার আগের মতোই শক্তি পাচ্ছে।বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ঝেড়ে ফেলে নিজের গতিতে এগোতে চাইছে।তবে পরিস্থিতি অনুকূল,সে কথা বলা যাবে না। বিশ্ব অর্থনীতি এখন বাণিজ্য-সম্পর্কিত প্রতিকূলতার মুখোমুখি। বিভিন্ন দেশ নিয়ে ট্রাম্পের শুল্ক - অচলাবস্থা চলছেই। এটি না কাটা পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতি তার ছন্দ খুঁজে পাবে না।
লেখক : রাজনৈতিক অর্থনীতির বিশ্লেষক